• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

বেওয়ারিশ কুকুরে বাংলাদেশে বাড়ছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক বিস্তারের শঙ্কা

প্রধান প্রতিবেদক:
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

 

বেওয়ারিশ কুকুরে বাংলাদেশে বাড়ছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক বিস্তারের শঙ্কা। বিগত ২০২২ সাল থেকেই দেশে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া থমকে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও। ফলে দিন দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়েই চলেছে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। আর ওসব কুকুরের মাধ্যমে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আক্রান্ত হচ্ছে। কুকুর-বিড়ালে আক্রান্ত হয়ে টিকা নিতে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১২শ’ থেকে ১৪শ’ মানুষ ভিড় করছে। বর্তমানে দেশে কী পরিমাণ বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। ফলে ঘরে-বাইরে প্রাণঘাতী জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়ছে। তাছাড়া দেশে এখন কুকুর-বিড়াল পালনের হার বাড়লেও কোনো নীতিমালা নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।-খবর তোলপাড়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে জলাতঙ্ক আক্রান্তের হার ও মৃত্যু বৃদ্ধি নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী বিগত ২০১৫ সালে দেশে জলাতঙ্কে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ সালে ৫৭ জন, ২০১৯ সালে ৫৭ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ৪০ জন, ২০২২ সালে ৪৫ জন, ২০২৩ সালে ৪৭ জন, ২০২৪ সালে ৫৬ জন এবং ২০২৫ সালে একই রোগে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত কতজনের মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। যদিও সমপ্রতি কুকুরের কামড়ে গাইবান্ধায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরো কয়েকজন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

সূত্র জানায়, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসে। চাপ সামলাতে হিমশিম হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের খেতে হচ্ছে। জলাতঙ্ক মূলত প্রাণঘাতী। তাতে আক্রান্ত হলে মৃত্যু নিশ্চিত। সেজন্যই সবচেয়ে ভালো হলো মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয় ওই চেষ্টা করা। যদি কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দেয় তাহলে যতো তাড়াতাড়ি টিকা দেয়া যায়, ততোই ভালো। তাও না পারলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। জলাতঙ্ক টিকা-প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। এটি প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমিত হয়। সাধারণত লালার মাধ্যমে কামড় বা আঁচড়ের দ্বারা মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ছড়ায়। একবার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ব্যথা এবং ক্ষতস্থানে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত খোঁচা বা জ্বালাপোড়ার মতো সাধারণ লক্ষণ। ভাইরাসটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের প্রদাহ বৃদ্ধি পায়। মানুষের ক্লিনিক্যাল জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তবে খুব কমই নিরাময় করা যায়। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুরই মানুষের দেহে জলাতঙ্ক ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দায়ী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জলাতঙ্কপ্রবণ ৯টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।

সূত্র আরো জানায়, কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ, কুকুরের কামড় প্রতিরোধ এবং সংস্পর্শে আসার পর সর্বজনীন টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য কার্যকর টিকা রয়েছে। সন্দেহভাজন জলাতঙ্ক আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতস্থান অবিলম্বে পরিষ্কার করা এবং টিকা গ্রহণ করলে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। কুকুরের টিকা প্রদানের হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখলে কুকুরের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু দেশে ২০২২ সালের পর থেকে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেয়ার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিগত ২০১০ সাল থেকে দেশে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো।

এদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন জানান, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেই। সরকার দিলে সিটি কর্পোরেশন কার্যক্রম চালায়। কারণ ওই ভ্যাকসিন সরকারই সরবরাহ করে। ২০২২ সালে শেষ বার সাপ্লাই দেয়া হয়। তারপর সরকার আর ভ্যাকসিন কেনেনি। এখন আবার কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেনার পর সিটি কর্পোরেশনকে দিলে কার্যক্রম শুরু করা হবে। কাছাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা, পেশেন্ট ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রমও নেই।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে কুকুর নিধন করা যাবে না। কারণ এ নিয়ে২০১২ সালে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সেজন্য আগে যেমন টিকা দেয়া হতো, তা আবার চালু করা জরুরি। তাছাড়া কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা, কমিউনিটি ওনারশিপ দেয়া এ রকম কিছু করা লাগবে। না হলে শুধু ভ্যাকসিন দিয়ে কুলানো যাবে না। অ্যানিমেল কন্ট্রোল করতে হবে। টিকাও দিতে হবে। একটা রেগুলেশনের মধ্যে আনতে হবে। বাইরের কিছু দেশে যেমন ট্যাক্সেশন আছে, তাও করা যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, বেওয়ারিশ প্রাণীর সংখ্যা কমানো এবং দায়িত্বশীল পোষাপ্রাণী পালন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে লাইসেন্স, নিবন্ধন ও বার্ষিক ট্যাক্স ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোথাও তার নাম ‘পেট ট্যাক্স’, কোথাও ‘ডগ লাইসেন্স’, আবার কোথাও ‘পেট রেজিস্ট্রেশন ফি’।

এ প্রসঙ্গে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪শ মানুষ সংক্রকামক ব্যাধি হাসপাতারে আসছে। তবে এখন টিকার সংকট নেই। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে জলাতঙ্কে ৬ জন মারা গেছে। বর্তমানে এক শিশু চিকিৎসাধীন। যদি কুকুর-বিড়ালের কামড়ের পর ছিলে-ফেটে-কেটে যায়, রক্ত বের হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে খারজাতীয় সাবান দিয়ে চলমান পানিতে আধাঘণ্টা ধরে ঘষে ঘষে স্থানটি ধুয়ে ফেলতে হবে। ধুয়ে সেখানে কোনো সেলাই দেয়া যাবে না। দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে টিকা দিতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে, মুখ-ঘাড়-মাথার যতো কাছে কামড় বা আঁচড় লাগবে, ততো তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন দিতে হবে। কারণ খুব তাড়াতাড়ি ওই জীবাণু ছড়িয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় কামড়ে বা আঁচড়ে বেশি গুরুতর জখম হলে ভ্যাকসিন দিলেও জলাতঙ্ক হয়ে যায়। জলাতঙ্ক হয়ে গেলে ওটা সারানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত।

এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষ শাখার প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে একটি পাইলট প্রকল্প পাস হয়েছে তবে এখনো পিডি নিয়োগ হয়নি। পিডি নিয়োগ হলেই হয়তো জুলাই থেকে কার্যক্রম শুরু হবে। তিন বছরের ওই পাইলট প্রকল্প রাজধানীতে চলবে। তারপর সারা দেশে সমপ্রসারণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেয়া এবং পুরুষ কুকুরদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর