__ফারুক আহম্মেদ জীবন
ভারতের পশ্চিম বঙ্গ কলকাতার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের ঝাঁকড়া চুলের ভাসা ভাসা ডাগর চোখের দুখু মিয়া নামের আমি সেই দুঃখী ছেলেটির কথা বলছি। যে ছোট্ট কাল থেকেই ছিল অতি চঞ্চল। ছিল অতি প্রখর
তীক্ষ্ণ বুদ্ধি জ্ঞান সম্পূর্ণ।অতিশয় দুরন্তপনা মনার। বলিষ্ঠ আর সুঠাম দেহের অধিকারী। তরতাজা সজীব প্রাণ উচ্ছ্বাস। শত দুঃখেও যার মুখ অবয়ব
থাকতো সদায় হাস্যউজ্জ্বল।
হ্যা, আমি বলছি বিংশশতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী কবির কথা। যে আমাদের সকলের প্রাণের কবি।
আমাদের অতি প্রিয় ঝাঁকড়া চুলের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কথা। যে ছিল প্রেম বিরহের কবি। প্রতিবাদী দ্রোহের কবি। সাম্য আর মৈত্রীর কবি।যে কবি এক মুসলিম পরিবারে
জন্ম নিয়েও। মুসলমান ধর্মীয় শিক্ষা দীক্ষায় বেড়ে উঠলেও। যে মনুষ্য মানবিক আর সাম্য চেতনায়। সব জাত কুলের সাদৃশ্যের বৈরীতা দূর করতে। দূর করতে মানুষে মানুষের সামপ্রদায়িকতার সকল কোন্দল। মানুষের মনে অসাম্প্রদায়িকতার বীচ
রোপন করতে। একই মানুষ হয়ে মানুষে মানুষের ধর্ম জাতের কুলের তফাতে হিংসাত্মক মনোভাবে গালাগালি দেওয়া টাকে গলাগলিতে পরিণত করতে। সকল মানবকে দাঁড় করাতে এক কাতারে গেয়েছেন সদায় সাম্যবাদের জয়ের গান।
যে কবি জন্ম নিয়েছিল ইংরেজি ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ২৪শে মে। বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যোষ্ঠ, পিতা ফকির আহমেদ, আর মাতা জাহেদা খাতুনের কোল আলো করে গ্রাম্য এক জরাজীর্ণ কুঠিরে। যার বাল্য শৈশব, আর কৈশোরের জীবন কেটেছে প্রতিটাদিন প্রতিটাক্ষন তুমুল ঝড়ঝাপটা আর নিদারুণ দুঃখ কষ্টের মধ্যে কঠিন বাস্তবতার কাঁটায় ভরা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে।
যে বয়সে সব শিশুরা পড়ালেখা, ছবি আঁকা, আর তার সমবয়সী পাড়ার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সকাল হতে সারাদিনভর নানান রকম খেলাধুলা হাসি আনন্দের মাঝে হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত থাকে।
ঠিক সেই বয়সেই যে ছেলেটি মক্তবের গণ্ডীটা পেরুনোর আগেই পিতাকে হারিয়ে মাত্র আট বছর বয়সে নিত্যদিন জীবনের সাথে সংগ্রাম করে পৃথিবীর পথ চলেছে। যার জীবনী দেখলে দেখা যায় নানাবিধ জটিল কঠিন বাঁধা বিপত্তির পটভূমিতে ঘেরা। অসমঞ্জস্য পূর্ণ নানান বৈচিত্র্যময়ে ঘেরা। সংগ্রামময়ী কঠিন এক রণাঙ্গনী জীবন।
তবু সে থেমে থাকেনি। ঐটুকু বয়সে সে পিতাকে
হারিয়ে অনাথ হয়ে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে যে মক্তবে সে পড়াশোনা করেছে সেই একই মক্তবেই সে শিক্ষকতা করেছে । আবার তার মহল্লার মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেছে। তার পিতার জায়গায় নিজে মাজারের খাদেমের কাজ
করেছে। কখনো চা, রুটির দোকানে রুটি বানিয়ে
জীবন-জীবিকা জোগাড় করেছে। এতো দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়েও জীবন রণাঙ্গনের হার না মানা
যুদ্ধে সে পরাজয় স্বীকার করেনি। তারই মাঝে সে
তার জীবনের লক্ষ্যে সর্বদা অটুট থেকেছে। রুটির দোকানে সারাদিন সে কঠিন পরিশ্রম করেও রাত
জেগে সে নানান রকম বই পড়েছে। বহু কবিতা ছড়া রচনা করেছেন।
কখনো বা- জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কর্ম ছেড়ে
আবারো স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে বিদ্যা অর্জন করার জন্য। কিন্তু বারবার তাকে অভাব আর দারিদ্রতার সংঘাতে পড়ে হোঁচট খেতে হয়েছে।
আবার তাকে স্কুল থেকে ফিরে আসতে হয়েছে পড়ালেখা বন্ধ করে। অভাব-অনটন আর টানাপোড়েনের সংসারের জন্য জীবন-জীবিকার খোঁজে আবার ছুটতে হয়েছে তাকে কর্ম স্থলে। সে কখনো কাজ নিয়েছে তার চাচার সাথে গ্রাম্য লেটো গানের দলে। সেখানেও সে থেমে থাকেনি। কাজের ফাঁকে সে রচনা করেছে নানান রকম নাটক, গল্প, ছড়া, কবিতা। সেখান থেকেও সে চলে এসেছে আবারো জ্ঞান অর্জনের নেশায় স্কুলে শিক্ষকদের সাহচর্য পেতে। এভাবে কেটেছে তার শৈশব কৈশোর জীবন।
একসময় যৌবনের শুরুতে সে উপার্জনের লক্ষ্যে ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যোগ দিয়েছে সেসময়কারের ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। পুরো আড়াইটি বছর কেটেছে তার সে সৈনিক জীবন। চাকুরীতে থেকেও দুখু তার জীবনের স্বপ্ন থেকে একবিন্দু সরে আসেনি। কাজের মাঝে চালিয়ে গেছে তার শৈল্পিক সাহিত্য কর্ম সাধনা।
একসময় সে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্য ৪৯ রেজিমেন্ট স্থগিত হয়ে গেলে। কবি সেখান থেকে বাড়ি ফিরে
আসে। আর তখন থেকে সে তার কর্ম হিসেবে সাংবাদিক পেশাকে বেছে নেয়। সেই সঙ্গে চালিয়ে যায় তার সাহিত্য কর্ম। একেরপর এক প্রকাশ হতে থাকে সেসময় ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় তার রচিত লেখা সমূহ। চারদিকে ছড়াতে থাকে তার নাম, যশ, খ্যাতি।
কবি নজরুল প্রেমের পূজারী হলেও তার মাঝে লুকিয়ে ছিল সৈহ্য বীর্যে তেজে ভরা দামাচাপা স্ফুলিঙ্গের মত এক দ্রোহী আত্মা। আর তাইতো সে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীরদের অন্যায়,জুলুম অবিচার, অনাচার শোষণ দেখে বিপ্লবী হয়ে ওঠে।
প্রতিবাদের মশালের মত অগ্নিকুণ্ডের বারুদ হয়ে সব অপরাধকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করতে স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠে। লিখতে থাকে শীতল রক্ত গরম করা বিদ্রোহী লেখা। কবির যে লেখা ব্রিটিশ ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর মনে ভয়ানক ভীতি সৃষ্টি করে। কাঁপন ধরে তাদের পাপে ভরা মসনদে। কবি নজরে পড়ে যায় তখন ব্রিটিশ ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর।
তখন কবিকে নজরদারিতে রাখতে থাকে তারা।একসময় তাকে রাজদ্রোহীতার অপরাধে বন্দী করে জেলে আটকে রাখে। তবু জেলখানার সেই চারদেয়ালে বন্দী রেখেও কবির কলম এতটুকু
থামাতে পারেনি। দিগুণ শক্তি হয়ে গর্জে উঠেছে। আমি বলছি আমাদের সেই প্রাণের কবি, ভালোবাসার কবি সকল বাক হীন পরাধীন মানুষের স্বাধীনতা ফিরানো কবি, বাঙালীদের মুক্তির কবি, বেপরোয়া, একরোখা আর তেজস্বী ঝাঁকড়া চুলের সেই দুখু মিয়া নামের ছেলেটির কথা। যে আমাদের আদর্শ, আমাদের উদ্দীপনা আর অনুপ্রেরণার উৎস। যার সাতাত্তর বছর জীবনে অসুস্থ হওয়ার আগের চুয়াল্লিশ বছরের সুস্থ জীবনে মাত্র বাইশ তেইশ বছরে রচনা করেছে অতুল সাহিত্য ভাণ্ডার।যে ছিল ছোটদের থেকে শুরু করে বড় নারী পুরুষ সকলের কবি। যার অবদান শ্যামা সংগীত, নাত, হামদ্, নাটক, গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ,ছড়া, কবিতা, গান, সাহিত্যের প্রতিটি শাখায়। যে ছিল বহু প্রতিভার অধিকারী। একাধারে যে কবি ছিল একজন ভালো অভিনেতা
গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, নাট্যকার, সাংবাদিক।
সাহিত্যের প্রতিটা ক্ষেত্রে সবখানে ছিল যার সমান বিচরণ। যে কবির অবদান, যার ঋণ আমরা কেউ কোনদিন শোধ করতে পারবো না।
কবি নজরুল নিষ্পেষিত জনতার হয়ে আজীবন
সংগ্রাম করেছে। বঞ্চিতের অধিকার ফিরাতে লড়েছে বন্ধুর মতো পাশে থেকে। কবি নজরুল
বিশ্বের সহস্র কোটি ঘুমন্ত বিবেক জাগিয়ে তুলেছে
তার বিদ্রোহী লেখনীর মধ্য দিয়ে। কবি নজরুল তাইতো জাগ্রত চেতনার এক নাম। অমর অক্ষয় ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক কালজয়ী নাম। প্রিয় কবি নজরুল তুমি ছিলে, তুমি আজো আছ। তুমি চিরদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে এভাবে বহমান রবে আমাদের মাঝে। তোমার যতো না সৃষ্টি দোঁলন চাঁপা, সঞ্চিতা, বিষের বাঁশি, সর্বহারা, বাঁধনহারা, ধুমকেতু, অগ্নিবীণা, বিদ্রোহীর মতো নানান রকম কালজয়ী লেখনীর মধ্য দিয়ে।
-নারাংগালী ঝিকরগাছা যশোর ।
প্রধান সম্পাদক- দিপালী রানী রায়
খামারবাড়ী, ফার্মগেট ঢাকা-১২১৫ ও ট্রাফিক মোড়, রাজারহাট-৫৬১০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল - ০১৭৭৩৩৭৪৩৬২, ০১৩০৩০৩৩৩৭১, নিউজ ইমেইল- dailytolpernews@gmail.com, বিজ্ঞাপন- prohaladsaikot@gmail.com