
সংবাদদাতা, পঞ্চগড়:
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার কপি আদান-প্রদানকে কেন্দ্র করে রমরমা বাণিজ্য গড়ে উঠছে। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের আউটসোর্সিং ও রাজস্ব খাতে চাকরিরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। এতে যেমন সরকারি রাজস্ব গায়েব হয়ে যাচ্ছে তেমনি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
সম্প্রতি এই বিষয়ে অভিযোগ উঠলে অনুসন্ধানে নামে প্রতিবেদক। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ায় সবাই সতর্ক হয়ে গেলেও ২৫ আগস্ট একজন নারীর সন্ধান মেলে। যিনি নীলফামারী জেলার বাসিন্দা হয়েও নিজে উপজেলা নির্বাচন অফিসে উপস্থিত না হয়ে, কোন প্রকার আবেদন না করে এবং ব্যাংক চালান কপি ছাড়াই জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার কপি পান নির্বাচন অফিসের সীলমোহরসহ।
অভিযোগ রয়েছে শুধু দেবীগঞ্জ উপজেলা নয় বরং অন্য উপজেলার যে কেউ চাইলে এই সার্ভার কপি পেতে পারেন এক নিমিষেই। শুধু বাড়তি অর্থের প্রয়োজন এবং প্রয়োজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া।
ওই নারীকে সহযোগিতা করেন সাব রেজিস্ট্রি অফিসের এক দলিল লেখকের সহকারী রাকিব নামে এক ব্যক্তি। সার্ভার কপিতে রাকিবের মোবাইল নাম্বার থাকায় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়।
তবে শুধু রাকিব নন, রাকিবের মতো সাব রেজিস্ট্রি অফিসের অনেকেই এই ভাবে যে কারো এনআইডি কার্ডের সার্ভার কপি পান নিমিষেই।
সেলিনা বেগমের সার্ভার কপি হাতে আসার পর ২৬ আগস্ট প্রতিবেদক সরেজমিন ওই অফিসে গেলে আবেদন ও সার্ভার কপির বিপরীতে যে ২৩০ টাকা চালান জমা দিতে হয় সেটির কোন কপি দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালান জমা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন কর্মচারীদের মধ্যে দুইজন।
পরবর্তীতে সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) ঘটনার দিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়ে। এতে ২৫ আগস্ট বিকাল ৫টা ৪২ থেকে ৫টা ৪৭ মিনিটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করা হয়। উল্লেখিত সময়ে অফিসের স্ক্যানিং এন্ড ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স অপারেটর মোস্তফা কামাল ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মুকুল ইসলামকে একসাথে দেখা যায়। মোস্তফা কামালকে প্রথমে ফোনে কারো সাথে কথা বলার সময় কাগজে কিছু একটা লিখে নিতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তখন সেলিনা বেগমের এনআইডি নাম্বার বলা হয়। পরে মুকুল ইসলাম কম্পিউটার টেবিল থেকে উঠে গেলে মোস্তফা বসেন সেখানে। এরপর সার্ভার কপি প্রিন্ট দিয়ে অফিসের সীলমোহর ব্যবহার করতে দেখা যায় তাকে। এই সময় ওই দুইজন ছাড়া সার্ভার কপি নেওয়ার জন্য কাউকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় নি। সার্ভার কপি প্রিন্ট দেওয়া শেষে মোস্তফাকে সেই কপি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
এই বিষয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, আপনারা এই বিষয়টি নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন কেন। কিছু জানার থাকলে অফিসে এসে জেনে নিবেন।
এইদিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৫ তারিখের সার্ভার কপির ব্যাংক চালান জমা দেওয়া হয় ২৮ তারিখ। চালানটিতে জমাদানকারী হিসেবে মুকুল ইসলামের স্বাক্ষর দেখা যায়। শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে এবং মোস্তফার অনিয়মকে নিয়মে ফেরানোর চেষ্টা করেন মুকুল। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে ব্যাংক চালান জমা দিয়ে আবেদনের পর সার্ভার কপি সংগ্রহ করতে হয়।
এই বিষয়ে মুকুল ইসলাম বলেন, অডিটের ঝামেলা এড়াতে আমি চালান জমা দেই। চালান জমা দিলে যে এত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আগে বুঝিনি।
নির্বাচন অফিসের একটি সূত্র নিশ্চিত করে গত রবিবার (৩১ আগস্ট) ভিন্ন উপজেলার অন্তত ১০ জন ব্যক্তি এনআইডি সার্ভার কপির জন্য নির্বাচন অফিসে এলেও নির্বাচন কর্মকর্তা তাদের ফেরত পাঠান। এই সংখ্যা থেকে সার্ভার কপিকে ঘিরে রমরমা বাণিজ্যের বিষয়টি আরেকবার সামনে আসে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রোস্তম আলী বলেন, প্রথম দিন অভিযোগ আসার পর আবেদন ও শুধু দেবীগঞ্জ উপজেলার ভোটারদের এনআইডি সার্ভার কপি প্রদানে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এখন থেকে প্রতিটি আবেদন আমি নিজেই যাচাই করে সার্ভার কপি প্রদান করব।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, এই ধরণের একটি তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। আর সাম্প্রতিক বিষয়টি নিয়ে আমি অফিসে কথা বলে দেখব। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি আরো ইফেক্টিভ হয়।
রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দুলাল তালুকদার বলেন, আউটসোর্সিং এ নিয়োগকৃতদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই আমাদের। তাদের নিয়ন্ত্রণ কর্তা হলো যারা নিয়োগ দিয়েছেন তারা। এরপর বিষয়টি লিখিত ভাবে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, প্রায় দেড় মাস আগে মোস্তফার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন থেকে তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিরা আসলেও এখন পর্যন্ত সেই কমিটি কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। নির্বাচন কমিশনের এমন ধীর গতির কারণে মোস্তফাদের দৌরাত্ম বাড়ছে।
প্রধান সম্পাদক- দিপালী রানী রায়
খামারবাড়ী, ফার্মগেট ঢাকা-১২১৫ ও ট্রাফিক মোড়, রাজারহাট-৫৬১০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল - ০১৭৭৩৩৭৪৩৬২, ০১৩০৩০৩৩৩৭১, নিউজ ইমেইল- dailytolpernews@gmail.com, বিজ্ঞাপন- prohaladsaikot@gmail.com