।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
কাশফুল মূলত ঘাস জাতীয় একধরনের বহু বর্ষজীবী উদ্ভিদ। কাশের বৈজ্ঞানিক নাম: Saccharum spontaneum. ইংরেজি নাম: Kans grass. ধান. গম, কাউন, ইক্ষু, বাঁশ, কাশফুল ইত্যাদি Poacea গোত্রের অন্তর্গত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ হলো বাঁশ। কাশফুল বা কাশ উচ্চতায় সাধারনত ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে তাই এটি সবচেয়ে বড় ঘাসের মর্যাদা পায় নি। তাই বলে রুপে গুনে কাঁশফুল কোন অংশে কম নয়। কাশের আদি নিবাস ইউরোপের রোমানিয়ায়। এ উদ্ভিদটি অতিথি হিসেবে আসলেও আমাদের পরিবেশ আর প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিবিড় বন্ধন যোগ করায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।
কুড়িগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬ টি নদ-নদী আর নদীর বুকে রয়েছে ৪২০ টিরও অধিক চর। বর্ষাকালে এই নদীগুলোর পানি প্রবাহ এতটাই বেড়ে যায় যে বন্যা, নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নদীপাড় আর চরে বসবসাকারী অসহায় দরিদ্র মানুষ। কোন কোন পরিবারকে একই বছরে ২/৩ বার বাড়ির ঠিকানা পরিবর্তন করতে হয়, চোখের সামনে ভেসে যায় সদ্য কবর দেয়া সাদা কাপড়ে মোড়ানো প্রিয়জনের লাশ, ভেঙ্গে যায় ফসলের জমি, ভেসে যায় গবাদি পশু। পানি বন্দী মানুষগুলোর থাকে না খাবার। অনেক সময় পাটপাতা ঘরের চালে স্থাপিত চুলায় সিদ্ধ করে খায়। এগুলো হলো নদী পাড়ের মানুষ আর চরবাসীর করুণ দু:খের কাহিনী এবং নদীর অভিশপ্ত জীবনের বর্ণনা । তবে নদীগুলোর আশীর্বাদও কম নয়। নদীর পনিতে সোনার ফসল ফলে, তাজা মাছ, প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা গরু বা মহিষের ফ্রেশ দুধ, চরের উৎপাদিত বিশুদ্ধ সব্জি শুধুমাত্র চরবাসী মানুষের অর্থনীতির লাইফ লাইন নয় সেসাথে মূল ভূখন্ডের অধিবাসীদের উল্লেখিত নির্ভেজাল খাদ্যের যোগান দেয়।
দীর্ঘদিনের অবহেলিত জনপদ কুড়িগ্রাম এখন পর্যটনের নতুন সম্ভাবনায় জেগে উঠছে। নদী অববাহিকা তথা চরের যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের মূল ভূখন্ডের তুলনায় দূর্বল হলেও চরাঞ্চল বছরের বিশেষ সময়ে বিশেষ করে এ সময় রুপবতী,গুণবতী,মনোহারি,লাবণ্যময়ী, নয়নাভিরাম এবং মোহনীয় দৃশ্য ধারণ করে যা শত শত পর্যটককে আকর্ষণ করে। পর্যটনে পিছিয়ে পড়া অবহেলিত জনপদ কুড়িগ্রাম জেলার নদী অববাহিকায় শরতের আকাশে নীল মেঘের ভেলা, তার নিচে মাঠজুড়ে সাদা কাশফুলের সমারোহে তৈরি করে অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকা এলাকার এই কাশবন এখন পর্যটকদের টানছে প্রবলভাবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই আসছেন ছবি তুলতে, ঘুরে বেড়াতে কিংবা প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে। স্থানীয়রা বলছেন, আগে এ দৃশ্যকে সাধারণ মনে হলেও এখন এর অর্থ বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো দেখেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছে। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটেছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য উদ্যোগ নিলে এই কাশফুল নির্ভর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। অবহেলিত অঞ্চলগুলোতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, একইসাথে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশকেও বিশ্বদরবারে তুলে ধরা সম্ভব হবে। দোকানপাট, খাবারের হোটেল থেকে শুরু করে স্থানীয় পরিবহনেও বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা দু’টোই রয়েছে। কাশফুল প্রকৃতির দানে ভূমিষ্ট এক সুন্দরী কন্যা। এটি জন্মাতে কৃষক বা কৃষির কোন উপকরণের প্রয়োজন নেই। নদী অববাহিকার মানুষ প্রাকৃতিক দূর্যোগে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয় তেমনি প্রকৃতিই আবার আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে দান করেছে এই কাশফুল। যা স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট একটি বাড়তি আয়ের উৎস।
কাশফুলের রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব। এটি সরাসরি কৃষি, পশুপালন, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে। উত্তরাঞ্চলের দু’টি জেলা কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট মিলে যে কাশফুল উৎপন্ন হয় তার বাজার মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার)। প্রতিটি কাশফুলের আটির ওজন ২ কজি হলে এক হেক্টর পতিত জমিতে চার হাজার কেজি কাশফুল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বান্ডিল কাশফুলের মূল্য ২০ টাকা হলে এক হেক্টর জমিতে চল্লিশ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। কুড়িগ্রাম – লালমনিরহাট জেলার ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদী অববাহিকায় প্রাকৃতিকভাবে দশ হাজার হেক্টর জমিতে কাশফুল উৎপাদিত হয়। দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা বিশেষ করে রাজশাহি, কুষ্টিয়া ,বরগুনা, মেহেরপুর, খুলনা এবং চুয়াডাঙ্গা প্রভৃতি জেলা থেকে কাশফুল কেনার জন্য লোকজন আসে। কাশফুল ঘরের চালের ছাউনিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও ফসলের বেড়া, পানের বরজ ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।গ্রামীণ অঞ্চলে কাশফুল শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি গরীব ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সস্তা জ্বালানির উৎস।গরু, ছাগল ও মহিষের খাদ্য হিসেবে কাশফুল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে যখন সবুজ ঘাসের সংকট হয়, তখন কাশফুলের ঘাস পশুপালনে সহায়ক হয়। কাশফুলের কান্ড দিয়ে ঝাড়ু, দড়ি, টুপি,ব্যাগ,মাদুর ও বিভিন্ন প্রকার গ্রামীণ হস্তশিল্প তৈরি করা যায়, যা অনেকের জীবিকার অংশ। এসকল হস্তশিল্পের দেশ ও বিদেশে বেশ চাহিদা রয়েছে।আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, কাশের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যেমন—পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়।কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এ ছাড়া শরীরে ব্যথানাশক ফোড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যবহৃত হয়।
কাগজ তৈরীতেও কাঁশফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।কাশফুলের গড় আঁশের দৈর্ঘ্য ১.৪ মিমি এবং প্রস্থ ১৫.৪ মিউ মাইক্রন । এছাড়াও এতে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রবাদি যা কাশফুলকে কাগজ তৈরীর পাল্প উৎপাদনের জন্য উৎকৃষ্ট সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রয়েছে ৬৯.২% হলোসেলুলোজ, ২২.৪% ক্লাসন লিগনিন, ৬.৭৬% ছাই সামগ্রী এবং ৩২.৩% এন/১০ ক্ষারীয় দ্রাব্যতা, যা কাগজ তৈরির দৃষ্টিকোণ থেকে উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও আধুনিক ব্লিচিং সিকোয়েন্স ব্যবহার করে, কাঁশফুলের পাল্পের জন্য ৮৫% বেশি উজ্জ্বলতা অর্জন করা সম্ভব যা কাগজের মানকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে।আমাদের দেশে কাগজ শিল্পের পাল্প উৎপাদনে অতি প্রয়োজনীয় বাঁশ এবং সুন্দর বনের বিভিন্ন মূল্যবান বৃক্ষ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দেশের দরিদ্রতা প্রবণ উত্তরাঞ্চলের এ জেলা গুলোতে যেহেতু কাঁশফুল অধিক পরিমাণে জন্মে থাকে তাই এখানে কাগজ তৈরীর পাল্প উৎপাদনের জন্য শিল্প কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে অথবা এখান থেকে সড়ক বা নৌ পথে কাশফুল পরিবহণ করে দেশের কাগজ শিল্পকে সমৃদ্ধ করা যাবে।
নদীর চর, বাঁধ ও তীর রক্ষায় কাশফুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, ফলে ভাঙন কম হয়। ভূমি রক্ষার মাধ্যমে কৃষিজমি ও বসতভিটা সুরক্ষিত হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে বড় উপকার বয়ে আনে। কাশফুলে মৌমাছি প্রচুর আসে। ফলে মধু উৎপাদনে এটি ভূমিকা রাখে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য মূল্যবান। কাশফুল ও এর শিকড় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় জ্বর, পিত্তজনিত রোগ, মূত্র সংক্রান্ত সমস্যা ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ বাজারে এর চাহিদা আছে । সংক্ষেপে, কাশফুল শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং পশুপালন, জ্বালানি, বাসস্থান, শিল্প, ভূমি রক্ষা, মধু উৎপাদন ও পর্যটনসহ গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাশফুল নিয়ে রচিত।কাশকাশফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও নির্মলেন্দু গুণের মতো কবিদের কবিতায় বর্ণনা পাওয়া যায়, যা মূলত শরৎকালের সৌন্দর্যের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'কুশজাতক' প্রাচীন কাহিনীর ভিত্তিতে 'শাপমোচন' নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন। অন্যান্য লেখক ও কবিরাও তাদের লেখায় কাশফুলের অপরূপ রূপ এবং প্রকৃতিতে এর প্রভাব ফুটিয়ে তুলেছেন।কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে কাশফুল এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। নির্মলেন্দু গুণের কাশফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা করেছেন, যা গ্রাম্য পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে। শামসুর রাহমান তাঁর কবিতাতেও শরৎকালের প্রকৃতিতে কাশফুলের উপস্থিতি এবং এর কাব্যিক বর্ণনা পাওয়া যায়। কাশবনের কন্যা' শামসুদ্দীন আবুল কালাম রচিত একটি উপন্যাস। এটি ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, হাসি-কান্না ও স্বপ্নকে উপজীব্য করে লেখা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের জন্য এক সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সম্পদ কাশফুল । সঠিক পরিকল্পনা ও বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কাশফুল থেকে তৈরি হতে পারে কাগজ, দড়ি, ছাউনি, জ্বালানি, এমনকি পর্যটনেরও নতুন দিগন্ত। শিল্প প্রতিষ্ঠানের শূন্যতায় পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে কাশফুল এনে দিতে পারে কর্মসংস্থান, আয় এবং উন্নয়নের নতুন সুযোগ। তাই কাশফুলকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে কুড়িগ্রামের স্বনির্ভরতার ভিত্তি, যা তাদের এগিয়ে নেবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সোপানে।
লেখক: অধ্যক্ষ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।
প্রধান সম্পাদক- দিপালী রানী রায়
খামারবাড়ী, ফার্মগেট ঢাকা-১২১৫ ও ট্রাফিক মোড়, রাজারহাট-৫৬১০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল - ০১৭৭৩৩৭৪৩৬২, ০১৩০৩০৩৩৩৭১, নিউজ ইমেইল- dailytolpernews@gmail.com, বিজ্ঞাপন- prohaladsaikot@gmail.com