
প্রনব কুমার সত্যব্রত:
রংপুর অঞ্চলের সামাজিক ও ঐতিহাসিক আন্দোলনের ধারায় রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজের জাগরণে যে ক’জন মনীষীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রায় পঞ্চানন বর্মা—যিনি ইতিহাসে ‘ঠাকুর পঞ্চানন’ নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর জীবন ও কর্ম ছিল সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক প্রতিবাদ এবং আত্মমর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মে রংপুরে রায় পঞ্চানন বর্মার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষত্রিয় সমিতি। এই সংগঠন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজের সম্মান, শিক্ষা ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এর বহু আগেই, ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারে অবস্থানকালে তিনি তৎকালীন শাসনব্যবস্থার রোষানলে পড়েন। মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুরের দরবারে দেওয়ান কালিকাদাস দত্তের বিদ্বেষী মনোভাব এবং রাজবংশী ক্ষত্রিয় আন্দোলনকে রাজশক্তির বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে দেখার প্রবণতার কারণে পঞ্চানন বর্মা কোচবিহার ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি বিতাড়িত হননি, বরং সময়ের নির্মম বাস্তবতায় রংপুরে আশ্রয় নিতে হয়।
১৯০১ সালের এপ্রিল মাস থেকে তিনি রংপুর জর্জ কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমান রংপুরের পায়রাচত্বরের পূর্বদিকে অবস্থিত করুনাময়ী হোটেলে তিনি বসবাস করতেন। রংপুর জর্জ কোর্টেই একদিন ঘটে যায় এক অপমানজনক ঘটনা—ভুলবশত বার অ্যাসোসিয়েশন রুম থেকে এক ব্রাহ্মণ উকিলের গাউন পরে শুনানি শেষে ফিরে এলে মিত্র পদবীর এক ব্রাহ্মণ তাঁকে ‘অস্পৃশ্য’ বলে গালি দেন। তখন রায় পঞ্চানন দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দেন—
“I have used a toga, used by Rajbanshi.”
এই প্রতিবাদ ছিল তাঁর আত্মমর্যাদাবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রংপুর জেলা স্কুলের পেছনে অবস্থিত ক্ষত্রিয় ছাত্রাবাসেও সামাজিক বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট ছিল। সেখানে একদিন এক ক্ষত্রিয় ছাত্র রান্না হয়েছে কি না জানতে চাইলে ব্রাহ্মণ ছাত্রদের দ্বারা অপমানিত হয়। এই ঘটনার বিচার চাইতে ছাত্ররা পঞ্চানন বর্মার শরণাপন্ন হলে তিনি উপলব্ধি করেন—সংগঠিত শক্তি ছাড়া সম্মান রক্ষা সম্ভব নয়।
এই উপলব্ধি থেকেই ক্ষত্রিয় সমিতির জন্ম। রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয় করে তিনি ক্ষত্রিয় সমিতির প্রথম কার্যালয় ও ছাত্রাবাস নির্মাণ করেন। তখন ক্ষত্রিয় সমাজ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের কাছে হেয় প্রতিপন্ন ছিল।
পরবর্তীকালে রংপুর ধর্মসভা এলাকায় নাট্যমন্দিরে তিনি ৩০০ ব্রাহ্মণকে নিয়ে ধর্মসভা আহ্বান করেন। সেই সভায় ক্ষত্রিয়দের উপনয়ন ও পৈতে ধারণের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। ১৩১৯ বঙ্গাব্দের ২৭শে মাঘ দেবীগঞ্জের করতোয়া নদীর তীরে লক্ষ মানুষের সমাবেশে ঐতিহাসিক উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে একটি পাকা আমের অলৌকিক ঘটনাকে মানুষ আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে এবং প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে।
এরপর থেকে রাজবংশী ক্ষত্রিয় হিন্দুরা ‘সিংহ’, ‘রায়’, ‘বর্মণ’, ‘বর্মা’ ইত্যাদি পদবি গ্রহণ করে আত্মপরিচয়ে গৌরব ফিরে পায়।
মনীষী রায় পঞ্চানন বর্মার জন্ম ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই ফেব্রুয়ারি, সোমবার; মৃত্যু ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ই সেপ্টেম্বর, সোমবার। পিতা শ্রী খোসাল চন্দ্র সরকার, মাতা চম্পলা দেবী। জন্মস্থান—খালিসামারী গ্রাম, শীতলকুচি, কোচবিহার।
তিনি ছিলেন এক যুগপুরুষ—যিনি লাঞ্ছিত সমাজকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন।
তথ্যসূত্র: শ্রী নৃপেন্দ্রনাথ রায়(সিনিয়র সহ-সভাপতি, রংপুর ক্ষত্রিয় সমিতি)
প্রধান সম্পাদক- দিপালী রানী রায়
খামারবাড়ী, ফার্মগেট ঢাকা-১২১৫ ও ট্রাফিক মোড়, রাজারহাট-৫৬১০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল - ০১৭৭৩৩৭৪৩৬২, ০১৩০৩০৩৩৩৭১, নিউজ ইমেইল- dailytolpernews@gmail.com, বিজ্ঞাপন- prohaladsaikot@gmail.com