
-দেবেশ চন্দ্র সান্যাল
উনিশ শ’ একাত্তর সাল।২৫ মার্চ ’৭১ রাত সাড়ে এগারটার পর পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁনের
অনুমোদন μমে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক বাহিনী প্রধান লে. জে. টিক্কা খাঁনের নেতৃত্বে “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু
হলো। সেই সময়ের বাঙালিদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেল। পাকিস্তানি
হানাদারদের অতর্কিত আμমনের কারণে বাঙালি সৈনিক, ই.পি.আর, পুলিশ ও অন্যান্যরা যার যার অবস্থান থেকে
শুরু করলো সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৬ মার্চ’৭১ থেকে শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমি তখন রতন কান্দি নি¤œ
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ২৫ মার্চ’৭১ কাল রাত থেকে শুরু হলো পাকস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতা।
পাকিস্তানি হানাদারেরা বিশে^র জঘন্যতম এই নৃশংসতার নাম দিল “অপারেশন সার্চলাইট”। ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর
চালালো বিনা বিচারে জ¦ালাও, পোড়াও, নির্যাতন, হত্যা ও অন্যান্য মানবতা বিরোধী কাজ। ২৫ মার্চ’৭১ এর পর
আস্তে আস্তে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা সারা দেশের অধিকাংশ জায়গায় ক্যাম্প করলো। ১৯৭০ সালের জাতীয়
পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে হেরে যাওয়া জামায়াতে ইসলাম, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য ইসলামী
রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ নেতা কর্মীরা পাকিস্তানের পক্ষ নিল। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের সহযোগিতার জন্য
পীচ কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও অন্যান্য বাহিনী গড়ে তুললো। এ দেশের অধিকাংশ বিহারী
অধিবাসিরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পক্ষ নিল।পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা কিছু বিহারী যুবকদের পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু ,
আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাকামী নেতা কর্মীদের শায়েস্তা করে আন্দোলন থামাতে হবে বলে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং দিয়ে
মিলেশিয়া হিসেবে নিয়োগ করে এদেশে নিয়ে এসে ছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা দেশে ধর পাকড় করতো।
পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় সারা দেশ ব্যাপী জ¦ালাও,পোড়াও, হত্যা, গন হত্যা,
নির্যাতন, ধর্ষণ, জোর করে ধর্মান্তর করণ ও চাঁদা বাজি সহ বিভিন্ন মানবতা বিরোধী কাজ করতে থাকলো। ৭
মার্চ’৭১ এর পর থেকে পাকিস্তানি বিহারী সৈন্যরা তাদের সাথে চাকরি করা বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে
থাকলো। কিছু বাঙালি সৈন্য অস্ত্র নিয়ে অথবা খালি হাতে পালিয়ে এলেন। হানাদারেরা তাদেরই সাথী কিছু বাঙালি
সৈনিক কে হত্যা করে ছিল। পীচ কিমিটির লোক, রাজাকারেরা ও স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকিস্তানি সৈন্যদের
আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী ও হিন্দুদের বাড়িঘর চিনিয়ে দিত। রাজাকারেরা পাকিস্তানি সৈন্যদের রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে
গ্রামে যেতো। তারা চিনিয়ে দিত কোন বাড়ির লোক মুক্তিযুদ্ধে গেছে। তারা পাকি হানাদারদের তথ্যদিত, বাড়িঘর
লুটতরাজ, আগুন দিত ও চাদাঁ বাজি করতো। তাদের এই নিষ্ঠুরতা দেখে জাতি স্বম্ভিত হয়ে পড়লো। প্রতিদিন
পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতার কথা জানতাম বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী মানুষদের কাছ থেকে। পাকিস্তানিদের ভয়ে তখন
স্কুল কলেজ সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা সহ অন্যান্য শহরে চাকরি করা আমাদের এলাকার
অধিকাংশ চাকুরী জীবী জীবন বাঁচাতে বাড়িতে বাড়িতে এসে অবস্থান নিলেন। তাঁদের কাছ থেকে ও অন্যান্যের
কাছ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস ভয়াবহতার কথা জানতে পারলাম। ২৪ এপ্রিল’৭১ পাকিস্তানি সৈন্যরা
বাঘাবাড়ি ঘাটের দক্ষিণ পাড়ে এলো। তখন বাঘাবাড়ি ঘাটের হুড়াসাগর নদীতে ব্রীজ ছিল না। সরকারী ফেরি ছিল।
ফেরিতে বাস ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন পাড়া পাড় করতো। এই হুড়া সাগর নদীতে খেয়াঘাট ছিল। তখন
প্রতিবছর খেয়া ঘাট ডাক হতো। খেয়া ঘাটের নৌকায় সাধারণ মানুষ জন পাড়া পাড় হতো। পাকিস্তানি সৈন্যরা
বাঘাবাড়ি ঘাটের দক্ষিণ পাড়ে এসেই দুইটি শক্তি শালী শেল ছাড়লো। শেল দুইটির বিকট শব্দে এলাকায়
আতংকের সৃষ্টি হলো। শেলের দুইটি গুলির একটি পড়লো ডায়া নামক গ্রামে। আর একটি শেল পড়লো নরিনা
নামক গ্রামে। বাঘাবাড়ি ঘাটের উত্তর পাড়ে বাঙালি সৈনিক, ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্যরা পাকিস্তানি
সৈনিকদের প্রতিরোধ করার জন্য বাংকার করে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। পাকিস্তানি সৈনিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে
জয়যুক্ত হওয়া যাবেনা বিবেচনায় উইথড্রো হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন স্থানে চলে গেলেন। ২৫
এপ্রিল’৭১ পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের জেলার উল্লাপাড়া থানার চড়িয়া নামক গ্রামে গন হত্যা করলো। এই গণ
হত্যার শিকার ১২৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। ০৮ মে সাঁথিয়া থানার করঞ্জা ও ১৪ মে ফরিদপুর থানার ডেমড়া
ও সাঁথিয়া থানার রূপসী,বাউসগাড়ী গণ হত্যা হলো। করঞ্জায় স্বাধীনতা বিরোধীদের সহযোগিতায়। পাকিস্তানি
সৈন্যরা মেগা ঠাকুর পরিবারের ৩ জন সহ ৮ জনকে নৃশংস ভাবে হত্যা করলো। ডেমড়া, রূপসী ও বাউসগাড়ী
গণহত্যায় আমাদের দাদু প্রবোধ কুমার মজুমদার (মোনা মজুমদার) ও লালু চμবর্ত্তী সহ সাত শতাধিক হিন্দু
মুসলমান নরনারীকে হত্যা করলো। উল্লাপাড়া থানার কান সোনা ঘোষ পাড়া গন হত্যা হলো। দেশের ভয়াবহ
অবস্থা। পাকিস্তানি সৈন্যরা এক এক রাতে এক এক গ্রাম ঘিরে রেখে ভোর থেকে গন হত্যা চালায়। এদেশীয়
স্বাধীনতা বিরোধী সহযোগীদের দিয়ে লুটতরাজ চালায়। বাড়িঘর ও দোকানে অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়। ২৫
মার্চ কাল রাতের অপারেশন সার্চ লাইট এর পর থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী ও হিন্দুরা
অনেকে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাঙালি সৈন্য, ই.পি.আর পুলিশ, আনসার ও অন্যান্যরা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালায়।
বাঙালি সৈনিক, ই.পি.আর, আনসার ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত বাহিনীর সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় এদেশের অধিকাংশ
কৃষক, শ্রমিক,ছাত্র ও অন্যান্য নারী-পুরুষ। পেশাদার প্রশিক্ষন প্রাপ্ত আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্যদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালিদের কুলিয়ে উঠা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রশিক্ষন, অস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগিতার জন্য বাঙালি
সৈন্য ও অন্যান্যরা ভারতে আশ্রয় নেয়। আমাদের গ্রামে করতোয়া নদী পাড় হয়ে আসতে হবে। নৌপথ ছাড়া গ্রামে
পাকিস্তানি সৈন্যরা আসতে পারবেনা। আমাদের গ্রামের মুসলমানেরা খুব ভালো। আমাদের গ্রামের সর্বজনাব ডা.
মো: জয়নুল আবেদিন সরকার (জতু ডাক্তার), ভাইস প্রিন্সিপাল মো: নুরুল হক সরকার, কেমিষ্ট মো: নজরুল
ইসলাম সরকার, ডা.মো: খলিলুর রহমান ,মো: আব্দুল সরকার, মৌলভী মোহাম্মদ হোসাইন, মো: শাহ আলম
মাষ্টার, মো: আব্দুল মজিদ সরকার, মো: আবুল কালাম, মো: আকবর আলী মোল্লা, মো: ইউনুস মাষ্টার,মো:
আকবর আলী প্রামানিক সহ গ্রামের নেতৃস্থানীয় মুসলমান গণ মুসলমান যুবক ও সম্ভাব্য অন্যান্যদের ডেকে
বললেনÑ “সারা দেশের ভয়াবহ অবস্থার কথা আপনারা সবাই জানেন। সারা দেশের যেখানে যাই হোক সবাই
দেখবেন আমাদের গ্রামের হিন্দুদের যেন কোন প্রকার ক্ষতি না হয়। হিন্দুরা আমাদের আমানত...। আমরা
আমাদের গ্রামের হিন্দুদের রক্ষার জন্য সর্বাত্মক সতর্ক থাকবো”। আমাদের গ্রামের একজন মানুষও পীচ কমিটির
সদস্য, রাজাকার ও স্বাধীনতা বিরোধী হয় নাই। সব মুসলমানেরা হিন্দুদের বিভিন্ন নিরাপত্তা দিয়ে ছিলেন। আদি
কাল থেকে হিন্দু- মুসলমানেরা এ গ্রামে মিলে মিশে বসবাস করে থাকেন। বিভিন্ন প্রতিকুলতা উপস্থিত হলে
মুসলমান গন হিন্দুদের বিভিন্ন ভাবে নিরপত্তা দিয়ে থাকেন। আমাদের গ্রাম টি বিশে^র মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির
একটি অনন্য গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে গ্রামের অধিকাংশ হিন্দুরা পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ে তাঁদের স্বর্ণালঙ্কার ও
অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী প্রতিবেশী মুসলমানদের বাড়িতে রেখে এসে ছিলেন। বাংলাদেশের বিজয় দিবসের পর
প্রতিবেশী মুসলমানেরা তাঁদের কাছে জিম্মা রাখা সকল স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী অক্ষত অবস্থায় বুঝে
দিয়ে ছিলেন। ডেমড়া গণহত্যার পর থেকে আমরা দিন রাত গ্রাম পাহাড়া শুরু করলাম। প্রতিবেশী মুসলমান
যুবকেরা আমাদের সহযোগিতার জন্য সাথে থাকলেন। বড়দের নির্দেশে সর্ব মো: আব্দুল মজিদ সরকার, আবুল
কালাম সরকার, গোলাম মাহবুব নান্নু, মো: আব্দুস ছাত্তার প্রামানিক, মো: আনাইমোল্লা, মো: ইমান আলী, মো:
নজরুল ইসলাম, মো: লাল মিয়া. মো: শামসুল হক ও অন্যান্যরা রাত দিন পালা করে করে আমাদের সাথে থেকে
পাহাড়া দিল। আমাদের পরিবার কয়েক দিন রাতে প্রতিবেশী মুসলমানদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ঘুমাতাম।
আমাদের গ্রামের মুসলমানেরা এত ভালো যে,তাঁরা আমাদের জন্য ঘর ও বিছানা ছেড়ে দিয়ে নিজেরা বারান্দায়
ঘুমাতেন। আমরা কয়েক দিন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আমাদের গ্রাম অপেক্ষা আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাচড়া
গ্রামের আমাদের পিতৃদেবের শিষ্য মাখনলাল সিংহের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকলাম। একাকী মনে মনে মুক্তিযুদ্ধে
অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। মানুষের বাড়িতে আর কত দিন থাকা যায়। আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে আবার গ্রামের
বাড়িতে ফিরে এলাম। আমাদের গ্রামের আমরা ও অন্যান্য যুবকেরা নিজেদের উদ্যোগে রাত দিন পালা করে করে
গ্রাম পাহাড়া দিতে থাকলাম। আর মুক্তিযুদ্ধের যাওয়ার পথ খুঁজতে থাকলাম। শ্রাবণ মাসের প্রথম দিক। দিনটি ছিল
৬ শ্রাবণ ১৩৭৮ ও ২৩ শে জুলাই’৭১ শুμবার। বর্ষাকাল। রাত ৮ টার দিকে দেখি আমাদের বাড়ির অদূরে
পালেদের বিলে একটি ছই ওয়ালা নৌকা। নৌকা দেখে এগিয়ে গেলাম। বাচড়া গ্রামের আমার পরিচিত মো: আব্দুল
ওহাব কে দেখতে পেলাম। জিজ্ঞাস করলাম। কী হবে? ওহাব বললো এম পি এ. জনাব মো: আব্দুর রহমান স্যার
এলাকার ইচ্ছুকদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এর জন্য ভারত নিয়ে যাচ্ছেন। আমি বললাম তাহলে আমিও যাবো। আমি
চলে এলাম বাড়িতে। গোপনে আমার জামা কাপড় গোছালাম তারপর আমার পড়ার খাতার একটি পৃষ্ঠা ছিড়ে মাকে
উদ্দেশ্য করে একটি চিরকুট লিখলাম। চিরকুট টি ছিলÑ“মা, প্রনাম নিও, বাবাকে আমার প্রনাম দিও। বড়
দাদা, মেজদাদা ও বৌদিকে প্রনাম দিও। ছোট ভাই বোনকে ¯েœহাশিষ দিও। আমি মুক্তিযুদ্ধে গেলাম।
তোমাদেরকে বলে গেলে যেতে দিতে না জন্য না বলে চলে গেলাম। অপরাধ ক্ষমা করিও। আশীর্বাদ করিও। আমি
যেন বিজয়ী হয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসতে পারি। ইতি- তোমার ছেলে দেবেশ।” দিন টি ছিল আমাদের
গ্রামের হাটবার। পিতৃদেব হাট থেকে ভালো মাছ এনেছেন, মাতৃদেবী রান্না করছেন। আর কিছু ক্ষণ পরেই
আমাদের সবাইকে খেতে ডাকবেন। আমি বাড়ির কাউকে না বলে গোপনে নৌকায় গিয়ে বসলাম। রাত ৮-৩০ মি:
এর দিকে শাহজাদপুরের রাজ্জাক ও এরশাদ ভাই সহ কয়েক জনকে সাথে নিয়ে একটা নৌকায় এম.পি.এ জনাব
মো: আব্দুর রহমান স্যার এলেন। এম.পি.এ স্যার কে দেখে আমি দেখা করার জন্য এগিয়ে গেলাম। সামনে দাড়িয়ে
আদাব দিলাম। আমাকে দেখে স্যার বললেনÑ দেবেশ, তুমি কেন?এত ছোট মানুষকে তো মুক্তিযুদ্ধে নিবেনা।
আমি অনুরোধ করলাম। এম.পি.এ স্যার বললেন-ঠিক আছে চলো। তারপর রতন কান্দি পালেদের বিলের ঘাট
থেকে রাত ৯-০০ টার দিকে আমাদের নৌকা ছাড়লো। মানসিক ভাবে ভগবানকে প্রনাম করলাম। শুরু হলো এক
কিশোরের জীবন পন যুদ্ধে যাওয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাড়িতে এসে জানতে পারলাম। আমার
কারণে আমার বড় দাদা ও ছোট ভাই নৌকা ডুবিতে মরতে নিয়ে ছিল। আমি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা
হওয়ার আধা ঘন্টা পরই মাতৃদেবী আমাকে খেতে ডেকে ছিলেন। আমাকে না পেয়ে খোঁজা খুজি করে
জানতে পেরে ছিলেন পালেদের বিলের ঘাট থেকে এক নৌকা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিয়ের জন্য ভারতে রওয়া
হয়েছে। বিছানার উপর মাতৃদেবীকে লেখা চিরকুটি পেয়ে মাতৃদেবী নিশ্চিত হয়ে ছিলেন। মাতৃদেবী আমার
জন্য কান্নাকাটি শুরু করেছিলেন। তখন আমার বড় দাদা ও ছোটভাই গ্রামের জালাল কাকা সহ কয়েক জন
কে একটা নৌকা নিয়ে আমাকে ফিরিয়ে আনতে শাহজাদপুরে এম.পি.এ সাহেবের বাড়িতে গিয়ে ছিলেন।
ওখানে আমাকে পান নাই। ফিরে আসার সময় শাহজাদপুর করতোয়া নদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। আমার
ভাই ছোট হওয়ায় সবাই তাকে ধরে বাঁচাতে যায়। তখন আমার ছোট ভাই শমেন বলে - “আমি সাঁতার
জানি, আমার বড় দাদা সাঁতার জানেনা। আমার বড় দাদাকে বাঁচান।” সবাই নৌকাটি উলটিয়ে সাঁতরিয়ে
আমার বড় দাদা ও ছোট ভাই কে বাঁচিয়ে ছিল। আমরা সুজানগর সাত বাড়িয়া হয়ে পদ্মা নদী পাড় হয়ে
কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার চিলমারি ইউনিয়নের খারিজাথাক গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশের বর্ডার অতিμম
করলাম। আমরা ভারতের পশ্চিম বাংলার জলঙ্গী বর্ডার দিয়ে ভারতে ঢুকলাম। একটি বি.এস.এফ ক্যাম্পে
ঢুকলাম। শৌচকর্মাদি করে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। বি.এস.এফ ক্যাম্পেএম.পি.এ স্যার ও আমাদের গাইডার
কে চেয়ারে বসতে দিলেন। আমাদের সবাই কে এক লাইনে দাড় করালেন। আমাদের গণনা করা হলো।
আমরা হলাম ২২ জন। এম.পি.এ স্যার যোগাযোগ করে আমাদের কে কামার পাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে ভর্তির
ব্যবস্থা করলেন। এম.পি.এ স্যার আমাদের সাথে মালদহ পর্যন্ত গেলেন। মালদহ বাজার থেকে মুড়ি ও
কাঠাল কিনে আমাদের খাওয়ালেন। তারপর আমাদের কে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষনের জন্য কামার পাড়া ইয়ুথ
ক্যাম্পে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি অস্থায়ী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশে কোলকাতা চলে
গেলেন। আমরা রাত ৯ টার দিকে কামার পাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছালাম। তাঁরা আমাদের থাকা
খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। পর দিন সকালে আমাদের সবাইকে ফলোইং করালেন। বয়সের স্বল্পতার কারণে
ট্রেনিং কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি করলেন না। নিরুপায় হয়ে আমি আমার ওল্ড মালদহের পিশে মহাশয়
বিশ^ানাথ ভট্টাচার্যের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তখন অধিকাংশ ভারতীয়রা বাংলাদেশের লোকদের কে
জয় বাংলার লোক বলতো”। ভারতের ট্রেন ও বাসে বাংলাদেশের লোকের কোন ভাড়া লাগতো না। বাস ও
ট্রেনে ভাড়া চাইতে এলে “ জয় বাংলা” বললেই বুঝতে পারতেন আমরা বাংলাদেশের শরণার্থী। কামারপাড়া
ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে একটি বাসে কাছাকাছির একটি রেল স্টেশনে গেলাম। তার পর ট্রেন ধরলাম। বারসই
রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে ট্রেন বদলাতে হলো। আমি স্টেশনে বসে আছি। আমার কাছে ট্রেনের
টিকেট নাই। মোবাইল কোর্টের লোক আমাকে ধরে নিয়ে গেল। একটি রুমে বসালো। যাদের ট্রেনের
টিকেট নাই তাদের ম্যাজিস্ট্রেট এক এক করে ডেকে ডেকে জরিমানা করলো। পর্যায়μমে আমার পালা
এলো। আমাকে নাম জিজ্ঞাসা করায় আমি বললাম “জয় বাংলা”। ওনারা বুঝতে পারলেন আমি বাংলাদেশ
থেকে গিয়েছি। আমাকে জরিমানা না করে ছেড়ে দিলেন। পরবর্তী ট্রেনে উঠে ওল্ড মালদহ স্টেশনে নেমে
পিসে মহাশয় শ্রী বিশ^ নাথ ভট্টাচার্য মহাশয়ের বাড়িতে গেলাম। কয়েক দিন ওল্ড মালদহ, গাজল,
শিলিগুড়ি, বালুর ঘাট ও জলপাইগুড়ি আত্মীয় বাড়ি ঘুরলাম। আমার পিশে মহাশয়ের এক ভগ্নিপতি ছিলেন
একটি শরণার্থী ক্যাম্পের ইনচার্জ। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন-“ তুমি ছোট মানুষ তোমার মুক্তিযুদ্ধে
যাওয়ার শারীরিক যোগ্যতা নাই। আমি তোমাকে শরণার্থী ক্যা¤েপ ভর্তি করে নিচ্ছি। তুমি রেশন ও অন্যান্য
সকল সুবিধা পাবে”। আমি বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য ভারত এসে শরণার্থী শিবিরে
বসে বসে খাবো ইহাতে সন্মত হতে পারলাম না। আবার ফিরে এলাম কামার পাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে।
আমাদের শাহজাদপুরের রবীন্দ্র নাথ বাগচী, মো: নজরুল ইসলাম ও রতন কুমার দাস সহ কয়েক জন কে
পেলাম। তাঁরা আমাকে পরামর্শ দিলেন তুমি মালঞ্চ (কুরমাইল) ক্যাম্পের ইনচার্জ, ৭ নং সেক্টরের
উপদেষ্টা ও বেড়া-সাঁথিয়া নির্বাচনী এলাকার এম.এন. এ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্যারের কাছে যাও। আমি
তাঁদের পরামর্শে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্যার এর কাছে গেলাম। আমার পরিচয় দিয়ে আমাকে মুক্তিযুদ্ধে
ভর্তি করার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি আমাকে কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে ভর্তি করার
ব্যবস্থা করলেন। আমিও কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্প ভর্তি কর্তৃপক্ষকে আমাকে ভর্তি করার জন্য বিশেষ
অনুরোধ করলাম। কর্তৃপক্ষ আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আমার দেশ প্রেম, সাহসী
মনোভাব ও অন্যান্য শুনে ভর্র্তি করলেন। প্রাথমিক ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের ফলইং করিয়ে জাতীয় সংগীত
গাওয়ানো,পিটি প্যারেড করানো হতো। কদিন কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে থাকার পর আমাকে, রবীন্দ্র নাথ
বাগচী, রতন কুমার দাস ও মো: নজরুল ইসলাম কে ট্রান্সফার করলো মালঞ্চ (কুড়মাইল) ট্রানজিট
ক্যাম্পে, মালঞ্চ (কুড়মাইল) ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে আমাদের কে আনা হলো পতিরাম প্রাথমিক ট্রেনিং
ক্যাম্পে। পতিরাম প্রাথমিক ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে এক যোগে ভারতীয় আর্মি লরিতে ২০/২২ জন কে নিয়ে
আসা হলো দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানিঘাটা নামক ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পে। ক্যাম্পে
নিয়ে আমাদের তাবুর মধ্যে থাকার সিট করে দিল। আমাদের প্রত্যেক কে একটা মগ, একটা প্লেট, দুই টা
প্যান্ট, ২টা গেঞ্জি, একটি মশারি, ও বিছানা পত্র দেওয়া হলো। ট্রেনিং শুরু হলো। প্রশিক্ষন শুরুর দিনে
প্রশিক্ষণ কো-অর্ডিনেটর প্রথমে ফলইন করিয়ে প্রশিক্ষনের বিভিন্ন নিয়ম কানুন ও অন্যান্য বিষয়ে বললেন।
তারপর তিনি বললেন দুপুর ১২-০০টায় প্রশিক্ষণ প্রধান ক্যাপটেন ডি এস ভিলন স্যার আসবেন। ঠিক দুপুর
১২-০০টায় প্রশিক্ষন প্রধান শিখ সেনা ক্যাপ্টেন ডি এস ভিলন স্যার এলেন। তিনি আমাদের সকল কে
উদ্দেশ্য করে হিন্দিতে যা বললেন তার অর্থ হলো-“... আপনাদের কে স্যালুট। আপনারা বীর, আপনারা
আপনাদের দেশ মাতাকে হানাদার মুক্ত করতে জীবন পন যুদ্ধ করতে এসেছেন। আমরা আপনাদের জন্য
তেমন কিছু করতে পারবো না। আমরা মানবিক সহায়তা, প্রশিক্ষন ও অস্ত্র দিব। আপনাদের দেশকে
আপনাদেরই স্বাধীন করতে হবে। আপনাদের জন্ম দাতা পিতা মাতাকে স্যালুট জানাচ্ছি। তাঁরা দেশের
জন্য তাঁদের সন্তানদের কে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন...”। পানিঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্প টি ৭ নং সেক্টরাধীন একটি
হায়ার ট্রেনিং ক্যাম্প। পানিঘাটা স্থান টি ছিল চারি দিকে পাহাড়ের মধ্যে একটি বনাঞ্চল। এই বনাঞ্চলে
বনমানুষ, নকশাল ও অন্যান্য খারাপ মানুষের বসবাস ছিল। স্থানটি ছিল কার্শিয়ান পাহাড় হইতে নেমে
আসা একটি ক্যানেলের দক্ষিণ পার্শে¦র বনাঞ্চল। আমাদের ট্রেনিং স্থানটি ছিল পূর্ব-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত
ক্যানেলের দক্ষিন পাশের্^ অবস্থিত। চাঁন মারি স্থানের বামপাশে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে ঝর্ণার জল।
আমার জীবনে এই প্রথম পাহাড় থেকে ঝর্নার জল আসা দেখলাম। ক্যানেলের দক্ষিন পাশের্^র পাড় ঘেশে
মর্টার ট্রেনিং হতো। মর্টারের গুলি গিয়ে পড়তো ক্যানেলের উত্তর পাশের্^র জঙ্গলে। আমাদের ২১ দিনের
ট্রেনিং হলো। আমাদের কে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এল, এম,জি,এস,এল,আর, ষ্টেনগান, টুইঞ্চ মর্টার, হ্যান্ড
গ্রেনেড চার্জ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, ফাষ্ট এইড সহ অন্যান্য ট্রেনিং দিলেন। যুদ্ধে সহযোদ্ধা আহত হলে
বা শহীদ হলে করণীয় সর্ম্পকে এবং ফাষ্ট এইড সম্পর্কে ধারণা দিলেন। ভারতীয় কয়েক জন হিন্দু বিহারী
ও শিখ সৈন্য প্রশিক্ষন দিলেন আমাদের কোম্পানীর। আমাদের কোম্পানীর নাম ছিল ডেল্টা কোম্পানী।
প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন শিখ সেনা ক্যাপটেন ডি.এস. ভিলন। পানি ঘাটা হায়ার ট্রেনিং ক্যাম্পে এক রাতে
তাবুর মধ্যে শুয়ে বাবা মা ও পরিবারের অন্যান্যের জন্য অঝড়ে কাঁদছি। আমার কান্নায় আমার তাবুর মধ্যে
অবস্থানকারী অন্যান্যদের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাঁবুর মধ্যের এক সাথী ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর কে ডেকে নিয়ে
এলেন। আমাদের কোম্পানীর ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর এসে আমাকে কান্নাকাটি না করার জন্য বললেন।
তিনি হিন্দিতে যা বললেন তার অর্থ হলো-তুম কানু সান্যাল হ্যায়, তুম সংশপ্তক হ্যায়, তুম নাহি কাঁদা...।
মুক্তিযোদ্ধাদের বিদায়ের পূর্বে শ্লেটে চক দিয়ে এফ.এফ নম্বর লিখে বুকের উপর ধরিয়ে ছবি তোলা হতো।
কিন্তু আমাদের কোম্পানীর প্রশিক্ষনার্থীদের বিদায়ের পূর্বে কদিন ধরে বৃষ্টি হলো। আবহাওয়া জনিত কারণে
আমাদের ছবি তুলতে পারলেন না। বিদায়ের সময়ে জানতে পারলাম আমার এফ.এফ নং-৪৭৪২।ট্রেনিং
শেষে ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রাক যোগে আমাকে, রবীন্দ্র নাথ বাগচী, মো: নজরুল ইসলাম ও রতন কুমার দাস ও
অন্যান্য প্রায় ৫০ জন কে নিয়ে আসা হলো ৭ নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুরে। ইহা ছিল পশ্চিম
বাংলার কালিয়াগঞ্জ থানার তরঙ্গপুর নামক স্থানে অবস্থিত। তরঙ্গপুর এনে সিরাজগঞ্জ জেলার কয়েক জনের
সমন্বয়ে একটি গেরিলা গ্রুপ করা হলো। আমাদের গ্রুপের গ্রুপ লিডার নিযুক্ত হলেন বেলকুচি থানার তামাই
গ্রামের জনাব এম.এ মান্নান। ডেপুটি লিডার নিযুক্ত হলেন শাহজাদপুর থানার জামিরতা গ্রামের অধিবাসী
রবীন্দ্র নাথ বাগচী। আমাদের কে তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র, গোলা-বারুদ, রেশনিং ও পকেট মানি দেওয়া
হলো। আমার নামে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এক ম্যাগজিন ও এক বেল্ট গুলি, একটি বেওনেট ও একটি
হেলমেট ইস্যু করা হলো। অন্যান্য গোলা বারুদ, মাইন,গ্রেনেড ও এক্সপ্লোসিভ কমান্ডার স্যারের দায়িত্বে
দিলেন। মৃত্যু যে হবেনা এমন কোন গ্যারান্টি ছিল না। তাই আমি মৃত্যুর প্রস্তুতি ও যুদ্ধ জয়ের জন্য
তরঙ্গপুর বাজার থেকে একখানা শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থ, একটি বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের জাতীয়
পতাকা ও একটি ৪ ব্যান্ডের রেডিও কিনলাম। তরঙ্গপুর থেকে কালিয়াগঞ্জ পর্যন্ত বাসে এসে ট্রেনে উঠলাম।
শিলিগুড়ি রেলওয়ে জংসন ষ্টেশনে এসে আমাদের ট্রেন বদলাতে হলো। শিলিগুড়ি স্টেশনের প্লাট ফরমে
গ্রুপের সকলের সাথে বসে আছি। দেখলাম আমাদের প্লাট ফরমের সামনের লাইনে একটা ফাঁকা ট্রেন
দাড়িয়ে আছে। আমি প্র¯্রাব করার জন্য ট্রেনের একটি টয়লেটে ঢুকলাম। আমি টয়লেট করছি এমন
অবস্থায় ট্রেনটি স্টার্ট করলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাড়াগুড়া করে বাথরুম থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে
প্লাট ফরমের উপর নেমে পড়লাম। আমার হাটুতে ব্যাথা লাগলো। আজ ভাবি-তখন পকেটে কোন আইডি
কার্ড ছিল না। আমার অপরিচিত যায়গা। ওখানকার একজন মানুষও আমাকে চেনে না। আমি মারা গেলে
আমার সাথীরাও আমাকে খুঁজে পেতেন না। আমার লাশ কবর হতো কী দাহ হতো নিশ্চয়তা ছিল না।
আমার বাবা-মা সারা জীবন আমার পথ প্রানে চেয়ে থাকতেন। আমার লাশ টাও পেতেন না। পরে ট্রেন
বদলীয়ে আসাম গামী ট্রেনে উঠলাম। আসাম গামী ট্রেনে ধুপরী নামক ষ্টেশনে আমরা নামলাম। তারপর বাস
যোগে মানিকার চর এলাম। রাত হয়ে যাবার কারণে কমান্ডার স্যার রাতে মানিকার চর একটি বডিং ভাড়া
করলেন। আমাদের কে সেই বডিং এ থাকার ব্যবস্থা করলেন। পরদিন সকালে মানিকার চর থেকে নদী পার
হয়ে এলাম তদানীন্তন রংপুর জেলার কুড়িগ্রাম মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মুক্তাঞ্চলে স্থাপিত রৌমারী
মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। রৌমারী ক্যাম্পে আমরা ¯œান খাওয়া দাওয়া করলাম। আমাদের কমান্ডার স্যার
সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তাঞ্চল যমুনার চড়ে পৌঁছানোর জন্য একটি বড় ছই ওয়ালা নৌকা ভাড়া করলেন।
রৌমারী ক্যাম্প থেকে রাতের খাবার খেয়ে রাত ৯:০০ টার দিকে আমাদের নৌকা ছাড়লো। ইহা ছিল ৬
সেপ্টেম্বর’৭১। নৌকা বাহাদূরাবাদ ঘাট, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, কাজিপুর থানা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে
আসতে হয়। আমরা জানতে পেরে ছিলাম। বাহাদূরাবাদ ঘাট অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ণ এলাকা। ঐ ক্যাম্পের
পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারেরা ভয়ানক। তারা স্পীড বোট নিয়ে রাতে নদী টইল দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের
নৌকা পেলে ধরে নিয়ে যায়। ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক অত্যাচার করে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। আমাদের
কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যার নির্দেশ দিলেন-”আপনারা সবাই নৌকার ডওরার মধ্যে পজিশন অবস্থায়
থাকুন। পাকিস্তানি হানাদারেরা ধরতে এলে আমরা ধরা দিব না। যুদ্ধ করবো। যুদ্ধ করে শহীদ হবো কিন্তু
ওদের হাতে ধরা দিব না”। রাত ২.০০ টার দিকে আমরা বাহাদূরাবাদ ঘাট এলাকা অতিμম করতে
থাকলাম। ওদের সার্চ লাইটের আলো এসে বার বার আমাদের নৌকাতে পড়ছিল। ভগবানের কৃপায়-ওরা
আর স্পীড বোট নিয়ে ধরতে এলোনা। আমরা বাহাদূরাবাদ ঘাট এলাকা অতিμম করলাম। আমাদের সাথে
চিড়া গুড় ছিল। ভোরে মাঝিরা এক কাইসা খেতের মধ্যে নৌকা ঢুকিয়ে দিল। আমরা নীচে নেমে খেতের
মধ্যে প্র¯্রাব পায়খানা করলাম। আমাদের সাথে থাকা চিড়া ও গুড় দিয়ে সকালের জলখাবার খেলাম। তার
পর নৌকা আবার ছাড়লো। তখন কাজিপুর থানার অধিকাংশ এলাকা সহ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা
পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে। কাজিপুর থানার সম্মুখ দিয়ে আমাদের নৌকা আসবে। দেখে শুনে খোঁজ
নিয়ে থামিয়ে থামিয়ে ৪ দিন ভরে নৌকা এসে পৌছালো সিরাজগঞ্জ হানাদার মুক্তাঞ্চল যমুনার চরে। ইহা
ছিল টাঙ্গাইল জেলার সিংগুলির চড়েরনিকটবর্তী। নৌকাতেই রান্নার ব্যবস্থা ছিল। মাঝিরা কোন রকমে
ডালভাত অথবা খিচুরী রান্না করে আমাদের খাওয়াতো। এই ভাবে খেয়ে না খেয়ে চলছিলাম। পরদিন রাতে
যমুনা নদীর এপাড়ে চলে এলাম। চলে এলাম বেলকুচি-কামারখন্দ নির্বাচনী এলাকার এম.এন.এ জনাব মো:
আব্দুল মোমিন তালুকদারের গ্রামের বাড়িতে। তিনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর ভাই মো: রশিদ
তালুকদার আমাদের থাকা খাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করলেন। অক্টোবর’৭১ মাসের আগ পযর্ন্ত
আমাদের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা কম থাকায় সম্মূখ যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কমান্ডার স্যার নেন নি। কমান্ডার
স্যারের কাছে জানলাম জনাব মো: আমির হোসেন ভুলু এর গ্রুপ আমাদের এই এলাকাতেই আছেন। আমরা
পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ও তাদের দোসরদের আতঙ্কে রাখার জন্য গেরিলা কার্যμম “হিট এন্ড রান”
চালাতাম। পাকিস্তানি সৈন্য বা রাজাকার ক্যাম্পের নিকট বর্তী গিয়ে ২/৪ টা থ্রি নট থ্র্রি রাইফেলের আকাশ
মুখি ফাঁকা গুলি ছুড়ে চলে আসতাম। পাকিস্তানি দালাল, পীচ কমিটির লোক ও অন্যান্যরা আমাদের
অস্থিত্বের কথা জেনে ভয় ও আতঙ্কে থাকত। আমরা দিনের বেলা স্কুলে বা কারো বাড়িতে আত্মগোপন করে
থাকতাম। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ছিল দুইটি পক্ষ। একটি স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যটি
স্বাধীনতার বিপক্ষে। আমাদের কার্য এলাকার অধিকাংশ মানুষ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। স্বাধীনতার বিপক্ষের
পীচ কমিটির সদস্য,রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও অন্যান্যরা। স্বাধীনতা বিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ
গ্রহণ কারীদের তথ্য দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে এসে বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ, লুটতরাজ,চাঁদাবাজি
করতো। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দাতা বাড়ির মালিককে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করতো। হিন্দু ও
আওয়ামী লীগ নেতারা ছিল ওদের বড় টার্গেট। হিন্দু নারী পুরুষকে ধরে নিয়ে যেত। নির্যাতন, ধর্ষণ ও
হত্যা করতো। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারাও বিশেষ ভাবে অত্যাচারী পাকিস্তানি দালাল ও রাজাকারদের হত্যা
করতো। গণহত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য মানবতা বিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত কোনপাকিস্তানি হানাদার
সৈন্যকে ধরতে পারলে ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে বিচার করার পরিকল্পনা ছিল। যে কারণে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা
গ্রুপে সাহসী একজন কে জল্লাদ হিসাবে মনোনীত করা হয়েছিল। আমাদের গ্রুপের জল্লাদ হিসেবে
মনোনীত ছিলেন দৌলতপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুল হক। আমরা এমন কোন পাকিস্তানি হানাদার
সৈন্য ধরতে পারি নাই। আমরা কখনো কাউকে মারি নাই। আমাদের গ্রুপের নীতি ছিল- “আমরা আমাদের
দেশী কোনো ভাই কে হত্যা করব না। বুঝিয়ে তাদের কে স্বাধীনতার পক্ষে আনবো” যে কারণে আমাদের
মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ কোন স্বাধীনতা বিরোধীকে ধরি নাই, শাস্তি দেই নাই বা হত্যা করি নাই। আমরা নিজেরা
বা তাদের আত্মীয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে বিভিন্ন ভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বাধীনতার পক্ষে আনার চেষ্টা
করতাম। আমাদের হাতে আগ্নেয় অস্ত্র থানা সত্বেও আমরা প্রতিটি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকতাম। যে কোন
সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের আμমন করতে পারে। আমাদের থাকা খাবার কোন নিশ্চয়তা ছিল না।
নিজেরা রান্না করে খাবো এমন কোন থালা বাসন আমাদের কাছে ছিল না। আমরা আজ এ শেল্টারে কাল
সে শেল্টারে থাকতাম। কোন শেল্টারেই একাধিক দিন থাকতাম না। কোন কোন দিন শেল্টারের অভাবে
সারারাত চিড়া গুড় খেয়ে রাত্রি জেগে স্কুলের বেঞ্চে শুয়ে থাকতে হতো। আমাদের কাছে কোন মশারি,
বালিশ, লেপ কাঁথা ও অন্যান্য ছিল না। কি যে অমানবীয় কষ্ট। আমাদের শেল্টার পালা μমে আমরা দু’জন
করে করে পাহাড়া দিতাম। প্রতি রাতে কমান্ডার স্যার আমাদের পাশ ওয়ার্ড দিতেন। আমরা আমাদের
শেল্টার ডিউটি দেওয়ার সময়ে কোন লোক এলে “ হল্ট” বলে দাড় করাতাম। তারপর “হ্যান্ডস আপ” বলে
হাত উপরে উঠাতে বলতাম। তার পর জিজ্ঞাসা বাদ করে নিশ্চিত হয়ে যেতে দিতাম। আমরা রাতে বিভিন্ন
রাজাকারদের বাড়িতে গিয়ে তাদের আত্মীয় স্বজনকে বুঝাতাম। সকালে আমরা অস্ত্রে ফুল থ্রু মারতাম,
পরিস্কার করতাম ও অস্ত্রে তেল দিতাম। তখন দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা
একেক দিন একেক জনের বাড়িতে খাওয়া - দাওয়া করতাম। স্বাধীনতা বিরোধীদের ভয়ে অনেকে
আমাদের কে শেল্টার বা খাবার দিতে সাহস পেতেন না। কারণ অধিকাংশ গ্রামেই ছিল ২/১ জন করে
পাকিস্তানি দালাল ও রাজাকার। তারা খোঁজ জানলে পাশর্^বর্তী আর্মি বা রাজাকার ক্যাম্পে সংবাদ দিয়ে
তাদেরকে নিয়ে এসে বাড়িঘর জ¦ালিয়ে দিবে, বাড়ির মালিককে ধরে নিয়ে হত্যা করবে ও অত্যাচার চালাবে
এই ছিল তাদের ভয়। আমাদের সাথে সব সময় চিড়া গুড় থাকতো। স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ নেতা-
কর্মীদের ট্রেনিং দেওয়ায়ে আমাদের সাথে নিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাবার কারণে আমার পিতৃদেব ও
মাতৃদেবী পাগল প্রায় হয়ে গিয়ে ছিলেন। একটি অবুঝ কিশোর ছেলের প্রশিক্ষন প্রাপ্ত, পেশাদার, আধুনিক
অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত ভয়ংকর হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ! আমাকে খুঁজে যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে
আনার জন্য ও রাজাকারদের আলটিমেটামে গণহত্যার হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য গোটা পরিবার বাড়িঘর
সবফেলে গ্রামের মো: হোসেন আলীর কাছে শর্ত সাপেক্ষে বাড়িঘর সব জিম্মা রেখে ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে
ভারতের আসামের মানিকার চড় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। কোথায়ও আμমণের পূর্বে আমরা
রেকী করে দেখতাম। “জয় বাংলা ” ছিল আমাদের রণাঙ্গণেরপ্রধান ধ্বণি। আমি আমার গ্রুপ কমান্ডার ও
রণাঙ্গণের সাথিদের বলে রেখে ছিলাম- “আমি রণাঙ্গণে মারা গেলে, তরঙ্গপুর বাজার থেকে আমার কেনা
জাতীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে আমার দেহ নদীতে দিয়ে দিবেন”। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে আমি মারা গেলে
তখন বাংলাদেশে আমার লাশ নিয়ে অন্ত্যেষ্টি μিয়া করার মত পরিবারের কোন লোক ছিল না। রনাঙ্গনে
মারা গেলে লাশ নিয়ে গ্রামে যাওয়ারও অবস্থা ছিলনা। আমি দুই জন গ্রুপ কমান্ডাররের অধীনে সম্মুখ/
গেরিলা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি। এক- গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান এবং দুই ডেপুটি গ্রুপ কমান্ডার
(গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচী এর কমান্ডানাধীনে। গ্রুপ কমান্ডার এম.এ
মান্নান স্যার এর অধীনে বেলকুচি থানা অপারেশন কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের সন্নিকটে এ্যাম্বুস ও
বেলকুচি থানার (বর্তমানে উপজেলার) কল্যাণপুর যুদ্ধ। বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীনে ধীতপুর
যুদ্ধ। আমাদের গ্রুপের গেরিলা/সম্মুখ যুদ্ধগুলোর বিবরণ হলোঃÑ
১. বেলকুচি থানা অপারেশন :
বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। এই থানা অপারেশনে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার
জনাব এম.এ মান্নান স্যার। ২৪ অক্টোবর’৭১ কমান্ডার স্যারের ও আরো ৩ জনের রেকিতে একযোগে
বেলকুচি থানা ও মুসলিমলীগ নেতা মোঃ আব্দুল মতিনের বাড়ি আμমন করে ছিলাম। সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি
শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করে ছিলেন। কমান্ডার স্যার আমাদের গ্রুপ কে দুই গ্রুপে ভাগ করে
দিয়ে ছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আμমন করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্র
নাথ বাগ্চীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতা মো: আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি আμমন করে মতিন সাহেবকে
ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা অপারেশণ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ছিলাম। রাত ৯
টায় বানিয়া গাতি শেল্টার থেকে যাত্রা করে ছিলাম। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশ্যে ভাগ হয়ে
ছিলাম। রাত ১২টায় একযোগে আμমনের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক আমাদের গ্রুপ থানার পশ্চিম
পাশ দিয়ে স্ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলে ছিল। হুইসেল বাঁজিয়ে থানার সবাইকে
জানিয়ে দিয়ে আমাদের কে লক্ষ্য করে সেন্ট্রি গুলি করা শুরু করে ছিল। তাঁরপর আমাদের গ্রুপ কমান্ডার
জনাব এম.এ মান্নান স্যার কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করে ছিলেন। তারপর সবাই একযোগে গুলি শুরু করে
ছিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী যুদ্ধ হয়ে ছিল। যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। আমার মাথায় হেলমেট ছিল। দুইটি
গুলি এসে আমার হেলমেটে লেগে ছিল। আমার ডান পাশে অবস্থান নিয়ে ছিলেন যুদ্ধের কমান্ডার। বিজয়
আর না হয় মৃত্যু ছাড়া কোন পথ ছিল না। আমরা সবাই বৃষ্টির মত গুলি চালাচ্ছিলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে
কমান্ডার স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন-“দেবেশ, মাথা তুলো না গুলি চালিয়ে যাও”। আমাদের গুলির
কাছে হেরে গিয়ে থানার পুলিশ ও রাজাকারেরা থানার পিছনদিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর নদীতে থাকা
একটি লঞ্চে আমাদের রেঞ্জের বাইরে যমুনা নদীর মাঝ স্থানে চলে গিয়ে ছিল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ
করে আত্মসমর্পণ করলো। তারপর আমরা সবাই থানার ভিতরে ঢুকে পড়ে ছিলাম। থানার মাল খানা থেকে
সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ছিলাম। এই যুদ্ধে দু’জন রাজাকারকে জ্যান্ত ধরে নিয়ে এসে ছিলাম। ভোর
হয়ে গিয়েছিল। মতিন সাহেবের বাড়ি আμমন করা দলটিও এলো। মতিন সাহেব পালিয়ে গিয়েছিল।
তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে অধিকাংশ বাড়ি ও দোকানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা
তৈরি করে রেখে ছিল। আমাদের বিজয় দেখে স্বতফুর্ত আনন্দে থানার আশেপাশের লোকজন দোকান ও
বাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে ছিলেন। আমরা বিজয়ী হয়ে কিছু সময় উল্লাস করে
শেল্টারে চলে এসে ছিলাম। ধরে আনা রাজাকার দু’জন কে চোখ বেঁধে আমাদের শেল্টারের রুমের পাশের্^র
রুমে রাখা হয়েছিল। আমি আমার কমান্ডার স্যারের অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে রাজাকার দুই জনের
কাছে রাজাকার হওয়ার প্রেক্ষাপট জিজ্ঞাসা বাদ করলাম। রাজাকার দুই জন ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের
কাছ থেকে জানা গিয়েছিল তারা কাউকে অত্যাচার করে নাই। তারা একটি চাকরি ভেবে রাজাকারে যোগ
দিয়েছিল। রাজাকার দু’জন কে দেখে সহজ সরল ও ভালো মানুষ মনে হলো। রাতে শ্লেটার পরিবর্তনের
সময়ে কমান্ডার স্যার কে বললাম- স্যার রাজাকার দুই জন ভালো মানুষ, তারা কারো ক্ষতি করে নাই।
তাদের বাড়িতে স্ত্রী পুত্রাদি আছে। তারা গরিব মানুষ। দয়া করে এদের কে ছেড়ে দিন।” আমাদের
কমান্ডার স্যার ছিলেন খুব ভালো মানুষ। ছোট মানুষ হিসেবে আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার কথায়
সম্মত হয়ে তিনি রাজাকার দুই জন কে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিলেন। রাতে শেল্টার পরিবর্তনের সময়
আমি ও দৌলতপুরের মো: শামসুল হক রাজাকার দুইজন কে ছেড়ে দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে এসে
ছিলাম। পরদিন সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য এসে বেলকুচি থানার আশে পাশে
আগুন দিয়েছিল এবং মানুষদের নির্যাতন করেছিল।
২. কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন সন্নিকটে এ্যাম্বুস :
কালিয়া হরিপুর স্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের মাঝ পথে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের কাছে আমরা
এ্যাম্বুস করেছিলাম। কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার সদর থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন। এই এ্যাম্বুসের
নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান। ঐ রাত ১১টার দিকে আমাদের গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের
জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকির ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন ও জামতৈল
স্টেশনের মাঝ পথে আমরা এ্যাম্বুস করেছিলাম। কমান্ডার স্যার μোলিং করে রেল লাইনে বৈদ্যুতিক মাইন
বসিয়ে এসে ছিলেন। গ্রুপ কমান্ডার স্যার ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ছিলেন। আমরা সবাই
ধানক্ষেতের মধ্যে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। কামান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারী। টর্চ লাইট ও
হ্যারিকেন হাতে পাকি মিলি শিয়া ও রাজাকারেরা টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের
মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ছিল। মাইনটি পাকি হানাদারদের নজরে পড়ে ছিল। পাকি হানাদাররা
হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে কমান্ড করলো। আমাদের দিকে টর্চ লাইট মেরে
মেরে উর্দূতে আমাদের কে উদ্দেশ্য করে বকাবকি করতে থাকলো। এমন সময় ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ
গামী পাকিস্তানি সৈন্য বাহী ট্রেন এলো। কালিয়া হরিপুর ষ্টেশনের পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও অন্যান্যরা
সিগন্যাল দিয়ে ষ্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে
আমারকে কে খুঁজতে থাকলো। আমাদের মাইনটি ব্রাষ্ট করা সম্ভব হলো না। পাকি হানাদারদের
সংখ্যাধিক্যতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার কমান্ড করলেন। আমরা
μোলিং করে কিছু দূর পিছিয়ে এসে হেঁটে রাত ১২.০০ টার দিকে তামাই গ্রামে চলে এসে ছিলাম। পরের
দিন সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুরের আশেপাশে বিভিন্ন গ্রামের
অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং গ্রামের অনেককে ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা এ্যাম্বুস থেকে ফিরে
এসে তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবার
ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর
আমাদের সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয় ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে
আমাদের গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই কমান্ডার
স্যার ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগ্চী কে কমান্ডার করে আমাদের কয়েক জনের আর একটি গ্রুপ তৈরি
করে দিলেন। পরস্পর যোগযোগ রেখে কাজ করার জন্য বিভিন্ন নিদের্শনা দিলেন।
৩. কল্যাণপুর যুদ্ধ:
কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব
এম.এ মান্নান। তামাই গ্রাম থেকে সারারাত হেঁটে বেলকুচি থানার কল্যাণপুর নামক গ্রামে কয়েকটি বাড়িতে
আশ্রয় নিলাম। ৫ নভেম্বর’৭১ গ্রামের নেতৃস্থানীয়রা আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আমরা
সারারাত নিদ্রাহীন থেকে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে পিটি, প্যারেড
করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে ফুলথ্রু মারলাম। দুইজন করে করে ডিউটি করতে থাকলাম।
অন্যান্যরা ঘুম বা বিশ্রামে থাকলাম। কল্যানপুর একটি নিভৃত গ্রাম। আমাদের ধারনা ছিল এই গ্রামে পাকি
হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে
জানালেন আমাদের কে ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকি হানাদার মিলে শিয়া ও রাজাকার
আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যানপুরের দিকে আসতে ছিল। দুইজন পাকিস্তানি দালাল গামছা দিয়ে
মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আস ছিল। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫
জন মিলেশিয়া ও ৮ জন রাজাকার আছে। আমাদের কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা কল্যানপুর
রাস্তার দক্ষিন ধারে বাংকারের মত বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশ ঝাড়ের সামনে দিয়ে চলা রাস্তা
ধরে পাকিস্তানি মিলেশিয়া ও রাজাকারের আসছিল। আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে কমান্ডার
স্যার কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পার্শে¦ পজিশন নিল। ওরাও
আমাদের কে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে ছিল। আমরাও একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকলাম।
গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশে পাশে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের সহযোগীতা করার জন্য এগিয়ে
এসে ছিলেন। এক ঘণ্টার অধিক সময় সম্মুখ যুদ্ধ চলছিল। তারপর পাকি হানাদারেরা পিছিয়ে গিয়ে ছিল।
যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বিজয় উল্লাস করে ছিলাম। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। কয়েকটি
বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে ছিলাম। তারপর কমান্ডার স্যারের নির্দেশে রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন
হয়ে আমরা কয়েক জন হেঁটে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মোঃ শামসুল হকের বাড়িতে শেল্টার নিয়ে
ছিলাম। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে শেল্টার
নিয়ে থাকলাম। প্রতিদিন রাতে কমান্ডার পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে অস্ত্রে ফুল থ্রু মারা হতো ও
তেল দেওয়া হতো। প্রতিদিন পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্প আμমন করার জন্য গ্রুপ করে
করে রেকি করতাম। আমাদের গ্রুপের গেরিলা/সম্মুখ যুদ্ধগুলোর বিবরণ হলোঃÑ
১. বেলকুচি থানা অপারেশন :
বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। এই থানা অপারেশনে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার
জনাব এম.এ মান্নান স্যার। ২৪ অক্টোবর’৭১ কমান্ডার স্যারের ও আরো ৩ জনের রেকিতে একযোগে
বেলকুচি থানা ও মুসলিমলীগ নেতা মোঃ আব্দুল মতিনের বাড়ি আμমন করে ছিলাম। সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি
শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করে ছিলেন। কমান্ডার স্যার আমাদের গ্রুপ কে দুই গ্রুপে ভাগ করে
দিয়ে ছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আμমন করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্র
নাথ বাগ্চীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতা মো: আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি আμমন করে মতিন সাহেবকে
ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা আμমন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ছিলাম। রাত ৯ টায়
বানিয়া গাতি শেল্টার থেকে যাত্রা করে ছিলাম। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গেটের উদ্দেশ্যে ভাগ হয়ে
ছিলাম। রাত ১২টায় একযোগে আμমনের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক আমাদের গ্রুপ থানার পশ্চিম
পাশ দিয়ে স্ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেলে ছিল। হুইসেল বাঁজিয়ে থানার সবাইকে
জানিয়ে দিয়ে আমাদের কে লক্ষ্য করে সেন্ট্রি গুলি করা শুরু করে ছিল। তাঁরপর আমাদের গ্রুপ কমান্ডার
জনাব এম.এ মান্নান কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করে ছিলেন। তারপর সবাই একযোগে গুলি শুরু করে
ছিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী যুদ্ধ হয়ে ছিল। যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। আমার মাথায় হেলমেট ছিল। দুইটি
গুলি এসে আমার হেলমেটে লেগে ছিল। আমার ডান পাশে অবস্থান নিয়ে ছিলেন যুদ্ধের কমান্ডার। বিজয়
আর না হয় মৃত্যু ছাড়া কোন পথ ছিল না। আমরা সবাই বৃষ্টির মত গুলি চালাচ্ছিলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে
কমান্ডার স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন-“দেবেশ মাথা তুলো না, গুলি চালিয়ে যাও”। আমাদের গুলির
কাছে হেরে গিয়ে থানার পুলিশ ও রাজাকারেরা থানার পিছনদিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর যমুনা নদীতে
থাকা একটি লঞ্চে আমাদের রেঞ্জের বাইরে যমুনার মধ্যে চলে গিয়ে ছিল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ করে
আত্মসমর্পণ করলো। তারপর আমরা সবাই থানার ভিতরে ঢুকে পড়ে ছিলাম। থানার মাল খানা থেকে
সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ছিলাম। এই যুদ্ধে দু’জন রাজাকারকে জ্যান্ত ধরে নিয়ে এসে ছিলাম। ভোর
হয়ে গিয়েছিল। মতিন সাহেবের বাড়ি আμমন করা দলটিও এলো। মতিন সাহেব পালিয়ে গিয়েছিল।
তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে অধিকাংশ বাড়ি ও দোকানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা
তৈরি করে রেখে ছিল। থানার আশেপাশের লোকজন দোকান ও বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে
দিয়ে ছিলেন। বিজয়ী হয়ে আমরা ভোরের দিকে কিছু সময় বিজয় উল্লাস করলাম। তারপর ধরে আনা
রাজাকার দুই জন সহ আমরা বেলকুচি থানার একটি নিভৃত গ্রামে শেল্টার নিলাম। ঐ দিন বেলা ১১.০০
টার দিকে সিরাজগঞ্জ সদর থেকে বেশ কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারেরা বেলকুচি থানায় এলো। তারা
বেলকুচি থানার আশে পাশের কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে কয়েক জন যুবক কে ধরে এনে অত্যাচার করেছিল।
বেল কুচি থানা অপারেশনের সময়ে আমরা ২ জন রাজাকার কে ধরে এনে ছিলাম। প্রথমত রাজাকার
দুইজন কে আমাদের শেল্টারের একটি রুমে চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। আমি আমার গ্রুপ কমান্ডার স্যারের
অনুমতি নিযে তাদের রুমে গেলাম। আমি রুমে ঢুকে তাঁদের নাম ও ঠিকানা জানলাম। তাঁরা আমাকে
অনুরোধ করলেন আমাদের চোখের বাঁধন খুলে দিন। আমাদের কষ্ট হচ্ছে। আমি রাজাকার ২ জনের
চোখের বাধঁন খুলে দিলাম। তারপর তাদের রাজাকার হওয়ার প্রেক্ষাপট জিজ্ঞাসা করলাম। তাঁরা যা
বললেন- তার মোটা মাটি অর্থ হলো- আমরা রাজাকার সম্পর্কে কিছু বুঝিনা। আমরা গরীব মানুষ। আমরা
বিবাহিত। আমাদের পরিবারে বাবা, মা স্ত্রীও ছেলে মেয়ে আছে। আমরা রাজাকার হওয়াটা একটি চাকরি
মনে করে রাজাকারে ভর্তি হয়েছি। আমরা কাউকে কোন প্রকার অত্যাচার করি নাই। আমরা কখনো
পাকিস্তানি সৈন্যদের কে সাথে নিয়ে গিয়ে কোন বাড়ি লুটতরাজ করি নাই। কোন বাড়িতে আগুন দেই নাই।
কোন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি- চিনিয়ে দেই নাই। আমরা চাকরি করি, বেতন পাই। সেই টাকা দিয়ে পরিবারের
ভরণ পোষণ করি। আপনি দয়া করে সবাই কে বলে আমাদের কে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমরা
আর রাজাকারে ফিরে যাবো না”। তাদের দেখে ও তাঁদের কথা শুনে মায়া হলো। দুপুরে রাজাকার দুই
জনকে সাথে নিয়ে সবাই এক সাথে বসে খেলাম। বিকালে কমান্ডার স্যার কে তাঁদের সাথে আলাপ চারিতার
কথা বললাম। তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। রাত ৯.০০ টার দিকে আবার রাজাকার
দুই জন কে সাথে নিয়ে শেল্টারে বসে এক সাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর শেল্টার পরিবর্তনের জন্য
যাত্রা করলাম। চলার পথে কমান্ডার স্যার কে রাজাকার দুইজনকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুনরায় অনুরোধ
জানালাম। কমান্ডার জনাব এম, এ মান্নান স্যার ছিলেন শিক্ষিত ও ভালো মানুষ। তিনি আমার অনুরোধে
রাজাকার দুই জনকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুমতি দিলেন। স্যারের অনুমতি পেয়ে আমাদের গ্রুপের
সবাইকে রাস্তায় দাড় করিয়ে রেখে আমি আর-আমাদের গ্রুপের সহযোদ্ধা দৌলতপুর গ্রামের মো: শামসুল
হক রাজাকার দুই জন কে কিছুৃদূর এগিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিয়ে এলাম। সর্বশেষ বলে এলাম আপনারা সরাসরি
বাড়িতে চলে যাবেন। আর থানায় ফিরে যাবেন না। আর রাজাকারে যাবেন না। দেশ অল্প দিনের মধ্যেই
স্বাধীন হবে। বেলকুচি থানা অপারেশন যুদ্ধে আমাদের গ্রুপের সাথে ছিলেন কাজিপুরের জনাব মো: আমির
হোসেন ভুলু এর দল সহ আরো বেশ কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা দল।
২. কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন সন্নিকটে এ্যাম্বুস :
কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশন ও জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনের মাঝে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের
কাছে আমরা এ্যাম্বুস করেছিলাম। কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার সদর থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন।
এই এ্যাম্বুসের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান। ৪ নভেম্বর’৭১ গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের
সিরাজগঞ্জের এম,এন, এ জনাব মোঃ মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভায়রা আওয়ামীলীগ নেতা জনাব
মোঃ আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকির ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন ও জামতৈল স্টেশনের
মাঝ পথে আমরা এ্যাম্বুস করেছিলাম। এই রাতের পাশওয়ার্ড ছিল ১. জবা ও ২. পলাশ। কমান্ডার স্যার-
নির্দেশ দিলেন পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে কারণ বশত ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে সবাই একত্রিত
হবো। আমার তামাই গ্রামের বাড়িতে। কমান্ডার স্যার μোলিং করে রেল লাইনে বৈদ্যুতিক মাইন বসিয়ে
এসে ছিলেন। গ্রুপ কমান্ডার স্যার ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ছিলেন। আমরা সবাই ধানক্ষেতের
মধ্যে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। কামান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারী। টর্চ লাইট ও হ্যারিকেন
হাতে রেল লাইনে পাকি মিলি শিয়া ও রাজাকারেরা টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের
মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ছিল। মাইনটি পাকি হানাদারদের নজরে পড়ে ছিল। পাকি হানাদাররা
হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে কমান্ড করলো। আমাদের দিকে টর্চ লাইট মেরে
মেরে উর্দূতে বকাবকি করতে থাকলো। ইতিমধ্যে ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ গামী পাকি হানাদার বাহী
একটি ট্রেন এলো। পাকি হানাদারেরা সিগন্যাল দিয়ে ষ্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি
হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে আমাদের কে খুঁজতে থাকলো। আমাদের মাইনটি ব্রাষ্ট করা সম্ভব
হলো না। পাকি হানাদারদের সংখ্যাধিক্যতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার
কমান্ড করলেন। আমরা μোলিং করে কিছু দূর পিছিয়ে এসে তামাই গ্রামে চলে এসে ছিলাম। পরের দিন
সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুরের আশেপাশে বিভিন্ন গ্রামের অনেক
বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং গ্রামের অনেককে ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা এ্যাম্বুস থেকে ফিরে এসে
তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা
করে রেখেছিলেন। আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের
সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয় ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে আমাদের
গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই কমান্ডার স্যার ডেপুটি
কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগ্চী কে কমান্ডার করে আমাদের কয়েক জনের আর একটি গ্রুপ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
নিলেন। কমান্ডার স্যার নির্দেশ দিয়ে বললেন- আজ থেকে আমাদের গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্র নাথ
বাগ্চী কে আমার দ্বিতীয় গ্রুপের গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে মনোনীত করা হলো। দ্বিতীয় গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা গণ
আমার অনুপস্থিতিতে রবীন্দ্র নাথ বাগ্চীর কমান্ডানাধীন হয়ে কাজ করবেন। রবীন্দ্রনাথ বাগ্চীর গ্রুপের
সদস্যরা হলেন শাহজাদপুর থানার অধিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ১. মো: বজলুল করিম দুলাল। ২. নজরুল ইসলাম
৩. রতন কুমার দাস ৪. দেবেশ চন্দ্র সান্যাল ও অন্যান্যরা এবং চৌহালী থানার মো: নজরুল ইসলাম।
আপনারা আমাদের মুল গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করে অবস্থান নিয়ে নিয়ে আমাদের মুল গ্রুপের কাছাকাছি
থাকবেন। প্রয়োজনের সময়ে আমরা দুই গ্রুপ একত্রিত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প, রাজাকার ক্যাম্প
আμমন ও থানা অপারেশন করবো। সিদ্ধান্ত নিয়ে এক যোগে হেঁটে হেঁটে আমরা এলাম কল্যানপুর নামক
গ্রামে।
৩. কল্যাণপুর যুদ্ধ:
কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার জনাব এম.এ
মান্নান। বেলকুচি থানার কল্যাণপুর নামক গ্রামে একটি স্কুলে আশ্রয় নিলাম। ৫ নভেম্বর’৭১ গ্রামের কয়েক
জন নেতৃ স্থানীয় মানুষ আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আমরা সারারাত নিদ্রাহীন থেকে ও
হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে কমান্ডার স্যারের কমান্ডে আমরা প্রকাশ্যে পিটি,
প্যারেড করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে ফুলথ্রু মারলাম। কমান্ডার স্যারের কমান্ডে আমরা দুইজন
করে করে ডিউটি করতে থাকলাম। অন্যান্যরা ঘুম বা বিশ্রামে থাকলাম। কল্যানপুর একটি নিভৃত গ্রাম।
আমাদের ধারনা ছিল এই গ্রামে পাকি হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত
সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানালেন আমাদের কে ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন
পাকি হানাদার মিলে শিয়া ও রাজাকার আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যানপুরের দিকে আসতে ছিল।
দুইজন পাকিস্তানি দালাল গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আস
ছিল। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫ জন পাকিস্তানি মিলেশিয়া ও ৮ জন রাজাকার আছে।
আমাদের কমান্ডার স্যার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যারের নির্দেশ
মত। কল্যানপুর রাস্তার ধারে বাংকারের মত বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশ ঝাড়ের সামনে দিয়ে
চলা রাস্তা ধরে পাকিস্তানি মিলেশিয়া, রাজাকারেরা এবং পথ চিনানো লোক দুইজন আসছিল। আমাদের
রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে কমান্ডার স্যার কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। এক লাফে হানাদারেরা
রাস্তার উত্তর পার্শে¦ পজিশন নিল। ওরাও আমাদের কে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে ছিল। আমরাও একযোগে
বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকলাম। জীবন মরণ ভয়াবহ যুদ্ধ। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশে পাশের গ্রাম
সমূহে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের সহযোগীতা করার জন্য এগিয়ে এসে ছিলেন। এক ঘণ্টার
অধিক সময় ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ চলছিল। তারপর পাকি হানাদারেরা পিছিয়ে গিয়ে ছিল। যুদ্ধে জয়ী হয়ে
আমরা বিজয় উল্লাস করে ছিলাম। সাহায্য কারী বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে পরিচয় হলো। দেখা গেল
জনাব মো: নজরুল ইসলাম ও মো: বাবর আলীর মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ সহ কয়েকটি গ্রুপ আমাদের সহযোগিতা
করার জন্য এসেছে। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। বিকাল ৩.০০ টার দিকে এক ব্যক্তি
দৌড়ে হাপাতে হাপাতে আমাদের কমান্ডার স্যারের কাছে এসে বললেন-“বেলকুচি থানা ও অন্যান্য যায়গা
থেকে বেশ কিছু হানাদার সৈন্য ও রাজাকারেরা ভারী অস্ত্র নিয়ে আপনাদের কে আμমন করার জন্য
আসছে। সংবাদটি পেয়ে কমান্ডার স্যার সবাই কে নিরাপদ স্থানে সড়ে পরার নিদের্শ দিলেন। কমান্ডার
স্যারের নির্দেশে রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন হয়ে আমরা কয়েক জন হেঁটে পিড়ার চর,খাসিয়ার চর,
ও অন্যান্য গ্রাম ঘুরে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মোঃ শামসুল হকের বাড়িতে শেল্টার নিয়ে ছিলাম। পর
দিন বেতকান্দি মিস্ত্রীবাড়ির ফাঁকা ভিটায় এসে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। মো: কোরপ আলী মোল্লা নামক
এক জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আমাদের সকালের খাবার ব্যবস্থা করলেন। আমরা ওখানে খাওয়া-দাওয়া
করলাম। তিনি তার বাড়িতে দুপুরের খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু আমাদের কমান্ডার রাজি হলেন
না। আমরা ফরিদ পাঙ্গাসী গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলহাজ¦ মো: আবু তালেব মাষ্টারের
বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য
গ্রামে শেল্টার নিয়ে থাকলাম। প্রতিদিন রাতে কমান্ডার স্যার আমাদের পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে
অস্ত্রে ফুল থ্রু মারা হতো ও তেল দেওয়া হতো। প্রতিদিন পাকিস্তানি সৈন্য ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্প
আμমন করার জন্য গ্রুপ করে করে রেকি করতাম।
৪. ধীতপুর যুদ্ধ:
ধীতপুর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার
(কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগ্চী। ১২ডিসেম্বর’৭১ রাতে আমাদের শেল্টার ছিল
সৈয়দপুর গ্রামের কালা চμবর্ত্তী, আখর হাজী ও অন্যান্যের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর’৭১ বেলা ১২.০০ টার
দিকে সংবাদ পেলাম পাকি হানাদারেরা কৈজুরী হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পাকি হানাদারেরা
পরাজিত হয়ে লঞ্চে যমুনা নদী পাড় হয়ে মালিপাড়া রাজাকার ক্যাম্পে এসে ছিল। মালিপাড়া ক্যাম্প থেকে
রাস্তা চিনানোর জন্য দুই জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াপদা বাঁধ ধরে বেড়ার উদেশ্যে যাচ্ছিল। কৈজুরী
থেকে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পিছু নিলাম। আমরা পাকি হানাদারদের অনুসরণ করছিলাম। আমাদের
কমান্ডারের নির্দেশ ছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের লোকজনদের আর ক্ষতি না করলে আমরা ওদেরকে
কিছু বলব না। ওরা ক্ষুধার্ত। কৈজুরী গ্রামের একজনের মুলা ক্ষেত থেকে মুলা খাওয়ার চেষ্টা করলো। ওরা
হয়তো জানতো না কাঁচা মুলা খাওয়া যায় না। ওয়াপদা বাঁধ ধরে ওরা অগ্রসর হতে লাগলো। আমরাও
নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ওদের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। ওরা ভীষণ μোধী। ধীতপুর নামক স্থানে গিয়ে ওরা
আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে ছিল। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাঁধের পশ্চিম দিকে পজিশন নিয়ে
ছিলাম। পাকিস্তানি হানাদারেরা ওয়াপদা বাঁধের পূর্ব পার্শ্বে পজিশন নিয়ে ছিল। এক ঘণ্টার অধিক সময়
ব্যাপি গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকলো। গুলির শব্দে শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও বেড়া থানার বিভিন্ন
স্থানে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা দল আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলো। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে
এলো। হানাদারেরা গুলি করা বন্ধ করলো। আমরাও অন্ধকারে গুলি করা বন্ধ করে দিয়ে ছিলাম। সারারাত
আমরা না খেয়ে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। আমাদের গ্রুপটি ছিল বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন। এই
যুদ্ধে আমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালিয়েছি। আমার বাম পাশের্^ অবস্থান ছিল আমার কমান্ডার রবীন্দ্র নাথ
বাগচীর। তিনি এলএমজি চালাচ্ছিলেন। আমার ডান পাশের্^ অবস্থান পজিশন নিয়ে অস্ত্র চালাচ্ছিলেন কাদাই
বাদলা গ্রামের মো: নজরুল ইসলাম, পুকুর পার গ্রামের রতন কুমার দাস ও অন্যান্যরা। আমাদের গ্রুপের
ডান পাশের্^ অবস্থান ছিল বেড়া থানার এস এম আমির হোসেন এর গ্রুপ ও অন্যান্য গ্রুপ। সারা রাত দুই জন
রাজাকার মাঝে মধ্যে কাভারিং ফায়ার করছিল। আমরাও ওদের ফায়ারের জবাবে দুই একটি করে ফায়ার
করছিলাম। ভোরের দিকে আমাদের কমান্ডার ও অন্যান্যরা রাজাকার দুই জন কে ঘিরে ধরে আত্মসমর্পন
করিয়ে ছিল। রাজাকার দুই জন কে আত্মসমর্পন করানোর পর জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল রাত ১২.০০ টার
পর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদেরকে কভারিং ফায়ার চালানোর নির্দেশ দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা বেড়ার দিকে
পালিয়ে গেছে। পরে জানা গেল। ঐ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বেড়া নদীতে থাকা ভেড়া কোলা গ্রামের
হলদারদের নৌকায় বেড়া নদী পাড় হয়ে নগর বাড়ি হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে গেছে। এই ভয়াবহ যুদ্ধে
আমাদের পক্ষের দুই জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন। ঐ দিন স্থানীয় দুজন পথচারী গোলাগুলির সময়ে
গুলি লেগে মারা গিয়ে ওয়াপদা বাঁেধর উপর পরে ছিলেন। পরে জানা গেল পাকিস্তানি সৈন্যরা ভেড়া কোলা
হলদারদের নৌকায় বেড়া নদী পার হয়ে নগর বাড়ি হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে গেছে। সকালে দেখা
গেল ওয়াপদা বাঁধের উপর দুই জন সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সময়ে গুলি লেগে মারা গেছেন। আমাদের পক্ষের
বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। এস.এম আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের গুরুতর আহত দুই
জন কে বেড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরে জানা গেছে এস.এম. আমির হোসেন ভাইয়ের গ্রুপের
জনাব মো: আব্দুল খালেক ও মো: আমজাদ হোসেন দুই জনই শহিদ হয়েছেন। ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে
আমাদের গ্রুপ জামিরতা হাই স্কুলে ক্যাম্প করে আশ্রয় নিলাম। ঐ দিনই অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর শাহজাদপুর
থানা হানাদার মুক্ত হলো। ১৬ ডিসেম্বর’৭১ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের
বিভিন্ন স্থানে থাকা একানব্বই হাজারাধিক পাকিস্তানি সৈন্যের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী অন্যান্য কিছু সৈন্য নিয়ে
আত্মসমর্পণ করে ছিল। ১৭ ডিসেম্বর’৭১ ভারতীয় বিমানে আমাদের যৌথ বাহিনীর উর্ধতন অফিসার ও অন্যান্যরা
বাংলাদেশের আকাশ পথে ঘুড়ে যুদ্ধত্তোর স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থা দেখে ছিল। একটি বিমান আমাদের জামিরতা
হাই স্কুল ক্যাম্পের উপর দিয়ে গিয়ে ছিল। হানাদার মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। এখন আমার দায়িত্ব এলো
বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে খুঁজে ভারতের শরণার্থী শিবির থেকে স্বাধীন দেশে ফিরিয়ে আনার। ১৮ ডিসেম্বর
কমান্ডার রবীন্দ্র নাথ বাগচী এর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ভারত গেলাম। ঐ দিন রাত ১০.০০টার দিকে গিয়ে
পৌছালাম মালদহ ষ্টেশনে। রাত টি ছিল কনকনে শীতের রাত। ষ্টেশনে গিয়ে জানলাম ওল্ড মালদহের দিকে ট্রেন
আসবে রাত ২.০০ টায়। রাত ১০.০০ থেকে ২.০০ টা পর্যন্ত কনকনে শীতের মধ্যে শুধু জামা ও গেনজি গায়ে নিয়ে
ষ্টেশনে অবস্থান করলাম। তারপর রাত ২.০০ টার ট্রেনে ওল্ড মালদহ গেলাম। ভোরের দিকে গিয়ে আমাদের পিশে
মহাশয়ের বাড়িতে গেলাম। পিশিমা এর কাছে জানতে পারলাম আমার বাবা-মা জলপাই গুড়ি আমার ছোট ঠাকুর
দা মনিন্দ্র নাথ সান্যাল এর বাড়িতে গেছে। আমার বড় দাদা আমার খোঁজে বাংলাদেশে এসেছে। পিশিমা কে
বললাম- “বাবা মাকে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে যাবার কথা বলবেন।” পরদিনই আবার চলে এলাম বাংলাদেশে
বড় দাদার খোঁজে। বাড়িতে বড় দাদার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিরে এলাম জামিরতা হাই স্কুেল অবস্থিত আমাদের
মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। জানুয়ারী’৭২ মাসে বাবা-মা সহ পরিবারের সবাই দেশে ফিরে এলেন। আমাদের গ্রামের মো:
হোসেন আলী আমাদের বাড়িঘর সব বুঝে দিলেন। কিছু দিন সরকার শরণার্থী ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা শরণার্থী
পরিবার কে পুণর্বাসনের জন্য চাউল, গম ও অন্যান্য সহযোগীতা দিলেন। ১২ জানুয়ারী’৭২ নতুন সরকার স্বাধীন
বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। কিছু দিন পরই আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমাদের গ্রুপ
২৪ জানুয়ারী’৭২ রবিবার সিরাজগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) সদরস্থ ইব্রাহিম বিহারীর বাসায় স্থাপিত অস্ত্র জমা
নেওয়া ক্যাম্পে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিলাম। পরে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি উদ্যোগে ন্যাশনাল
মিলেশিয়া ক্যাম্প স্থাপন করা হলো। আমাদের সিরাজগঞ্জ মহকুমা কার্যালয়ের পশ্চিম পাশের্^ (বর্তমানে যেখানে
নিউমার্কেট স্থাপন করা হয়েছে) ন্যাশনাল মিলেশিয়া ক্যাম্প স্থাপন করা হলো। মহকুমা কার্যালয় হতে ইচ্ছুক সকল
মুক্তিযোদ্ধাকে ন্যাশনাল মিলেশিয়া ক্যাম্পে ভর্তির পরামর্শ দিলেন। আমাদের সাথী অনেক মুক্তিযোদ্ধা ন্যাশনাল
মিলেশিয়া ক্যাম্পে ভর্তি হলো। আমি ন্যাশনাল মিলেশিয়া ক্যাম্পে ভর্তি হলাম না। আমি বাড়িতে চলে এলাম।
কয়েক দিন পর সংবাদ পেয়ে মহকুমা কার্যালয়ে গিয়ে অস্ত্র জমা দেওয়ার রশিদ জমা নিয়ে বকেয়া রেশনিং ও পকেট
মানি হিসাবে ১১০/- টাকা, জেনারেল মুহম্মাদ আতাউল গণি ওসমানি স্বাক্ষরীত সনদ নং-১২৯১৫৮, একটি সাদা
কম্বল দেওয়া হলো। বাড়িতে এসে আমার রতন কান্দি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমার বড় দাদা শ্রী
দেবেন্দ্র নাথ সান্যাল এম.কম এম.এড এর কাছ থেকে অষ্টম শ্রেণির অটো পাশের টিসি নিয়ে শাহজাদপুর বহুপাশির্^ক
উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী (বিজ্ঞান) এ ভর্তি হয়ে লেখা পড়া শুরু করলাম। শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এক
মুক্তিযোদ্ধার জীবন যাত্রা। স্বাধীনতার পর বাবা-মা ও অন্যান্যের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের পরিবারের
দুঃখ কষ্টের কথা জানলাম। পরিবারের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ আমি। পরিবার কে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা, অর্থনৈতিক,
মানসিক কষ্ট দেয়া সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। তবুও মনে শান্তি কৃপাময় পরমেশ^রের কৃপায় আমাদের পরিবারের
কারো জীবন নাশ হয় নাই।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল,পিতা: দ্বিজেন্দ্র নাথ সান্যাল,মাতা: নিলীমা সান্যাল, গ্রাম ও
ডাকঘর:রতন কান্দি,ইউনিয়ন:হাবিবুল্লাহনগর,উপজেলা:শাহজাদপুর, জেলা: সিরাজগঞ্জ।গেজেট নং-
বে-সামরিক সিরাজগঞ্জ-১৬৭৯। ভারতীয় প্রশিক্ষণ - এফ.এফ. নং-৪৭৪২। সমন্বিত তালিকা জলা
ভিত্তিক -১৪১১, উপজেলাভিত্তিক-১৫৮ মুক্তিযোদ্ধা পরিচিতি - ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিষ্টেম, ডিজিটাল সনদ
ও পরিচয় পত্র নং- ০১৮৮০০০১৪১১।
প্রধান সম্পাদক- দিপালী রানী রায়
খামারবাড়ী, ফার্মগেট ঢাকা-১২১৫ ও ট্রাফিক মোড়, রাজারহাট-৫৬১০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল - ০১৭৭৩৩৭৪৩৬২, ০১৩০৩০৩৩৩৭১, নিউজ ইমেইল- dailytolpernews@gmail.com, বিজ্ঞাপন- prohaladsaikot@gmail.com