Views: 1

রাজবংশী ভাষা তার বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে কালক্রমে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ, উপভাষা এবং প্রকাশ ভঙ্গিরীতিতে বিভক্ত হয়েছে । বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালের রাজনৈতিক সীমানা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণ এই ভাষারূপের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে । ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে রাজবংশী ভাষার বিভিন্ন রূপ ও রীতিকে প্রধানত ভৌগোলিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ভাষাবিদ ও গবেষকগণ রাজবংশী বা কামতাপুরী ভাষাকে প্রধানত তিনটি উপভাষাগত রূপে ভাগ করে থাকেন । এর প্রথমটি হলো ‘পশ্চিম রাজবংশী’, যা মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিংয়ের সমতল অংশ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বিহারের কিষাণগঞ্জ ও পূর্ণিয়া অঞ্চলে প্রচলিত । এই রূপে মৈথিলি ও হিন্দি ভাষার কিছু শব্দগত প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । দ্বিতীয়টি হলো ‘কেন্দ্রীয় রাজবংশী’, যা কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের উত্তর অংশের (যেমন: পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী) মানুষের প্রধান কথ্য রূপ । একে এই ভাষার সবচেয়ে মূল বা প্রমিত রূপের কাছাকাছি ধরা হয়। তৃতীয়টি হলো ‘পূর্ব রাজবংশী’, যার বিস্তার ভারতের আসামের গোয়ালপাড়া ও ধুবড়ি জেলা এবং বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলে । এই রূপটিতে অসমীয়া ভাষার টান এবং ব্যাকরণগত কিছু প্রভাব স্পষ্ট । এছাড়া নেপালের ঝাপা ও মোরাং জেলায় বসবাসকারী রাজবংশী জনগোষ্ঠীর ভাষাটি ‘তাজপুরিয়া’ বা নেপালি রাজবংশী রূপ নামে পরিচিত, যাতে নেপালি সংস্কৃতির দীর্ঘ সংস্পর্শের কারণে নেপালি শব্দের প্রভাব রয়েছে ।
অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি আলাদা শৈলী বা সামাজিক রীতি দেখা যায়। বাংলাদেশে রংপুর অঞ্চলের কথ্য রূপকে ‘বাহে ভাষা’ বলা হয়। রংপুরী জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন একে অপরের সাথে অত্যন্ত আপন এবং ঘরোয়াভাবে কথা বলেন, তখন এই রীতির প্রকাশ ঘটে। সম্বোধনের ক্ষেত্রে “বাহে” শব্দের বহুল ব্যবহার এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ ও আসামের কোচ-রাজবংশী মানুষরা তাদের ইতিহাস ও রাজকীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে যে শৈলীতে কথা বলেন, তা ‘কামতাপুরী বা রাজবংশী রীতি’ নামে পরিচিত, যা বর্তমানে ভারতে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । এছাড়া এই অঞ্চলের ধর্মান্তরিত মুসলিম জনগোষ্ঠী (যারা নস্যশেখ বা দেশী নামে পরিচিত) যখন এই ভাষায় কথা বলেন, তখন তাদের বাক্য গঠনে ও শব্দভাণ্ডারে প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে, যা ‘দেশী রীতি’ নামে পরিচিত।
ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাকরণ এবং ধ্বনিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু সূক্ষ্ম বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন, কোনো কাজ করা বোঝাতে এক অঞ্চলের মানুষ বলেন “করির নাগচিল” (করছিল) , আবার অন্য অঞ্চলে শোনা যায় “করবার ধরছে” বা “করার নাগছে”। রাজবংশী ভাষার কিছু নির্দিষ্ট রীতিতে শব্দের মাঝে বা শেষে ‘ঙ’, এবং ‘ম’ ধ্বনির উচ্চারণ অনেক বেশি জোরালো হয় । কোনো কোনো উপভাষায় “আমি” বোঝাতে ‘মুই’ বলা হলেও অন্য অঞ্চলে সেটি ‘মঙ’ বা ‘হামরা’ হয়ে যায় ।
কথ্য রূপের বাইরে রাজবংশী ভাষার লোকসাহিত্যে দুটি অনন্য সাংস্কৃতিক প্রকাশরীতি দেখা যায়। প্রথমটি হলো ‘গীতিময় বা সুরপ্রধান রীতি’, যা ভাওয়াইয়া, চটকা, ক্ষ্যাপা, তিস্তাবুড়ি, পদ্মপুরাণ, কুশান ও ক্ষীরোল গানের ভাষা। এই রীতি অত্যন্ত সাবলীল, কোমল এবং দীর্ঘ স্বরধ্বনিপ্রধান, যা মানুষের আবেগ ও বিরহকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। দ্বিতীয়টি হলো ‘আখ্যানমূলক বা নাটকীয় রীতি’, যার ব্যবহার হয় কুশানের গান বা লোকনাট্যের সংলাপে। এখানে ভাষা কিছুটা দ্রুতগতির এবং চটুল প্রকৃতির হয়ে থাকে, যা দর্শকদের সহজে আকৃষ্ট করতে পারে। এভাবে বিভিন্ন রূপ ও রীতির মেলবন্ধনে রাজবংশী ভাষাটি এক অনন্য ভাষাতাত্ত্বিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
-প্রণব কুমার সত্যব্রত
কবি, লেখক