পারস্পরিক সম্মতিতে অবিবাহিত দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যকার শারীরিক সম্পর্ক কোনও ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করার ভিত্তি হতে পারে না। সোমবার ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তেলেঙ্গানায় এক পুলিশ কনস্টেবল প্রার্থীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিতের সময় এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, দুই অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে তাদের চরিত্রের নেতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত নয়। আদালত বলেছেন, এমন সম্পর্কের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নৈতিকতা বা চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।-খবর তোলপাড়।
দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি মনমোহন এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ এক প্রার্থীর দায়ের করা মামলার শুনানিকালে এই পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
মামলার সূত্র অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলার কারণে তেলেঙ্গানা রাজ্য স্তরের পুলিশ নিয়োগ বোর্ড ওই প্রার্থীর ‘স্টাইপেনডিয়ারি ক্যাডেট ট্রেইনি পুলিশ কনস্টেবল’ পদে নিয়োগ সাময়িকভাবে বাতিল করেছিল।
অভিযোগ ছিল, পরিচিত এক নারীকে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন ওই ব্যক্তি। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তবে পরবর্তীতে ২০১৫ সালে লোক আদালতের মাধ্যমে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রার্থী তার চাকরির আবেদনপত্রে মামলার তথ্য গোপন না করে তা উল্লেখ করেছিলেন।
রায়ে আদালত বলেন, আইন কোথাও দুই অবিবাহিত ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতে নিষেধ করে না। তাই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতা বা চরিত্রগত ত্রুটির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
বিচারপতিরা আরও বলেন, সমাজের বাস্তবতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষকে সেই পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। আদালতের মতে, সব সম্পর্কই বিয়েতে পরিণত হয় না। ফলে কোনো সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রূপ নেয়নি বলেই ধরে নেওয়া যায় না যে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রতারণা করেছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, লোক আদালতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত মামলার আপস হওয়া মানেই এই নয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। শুধু একটি ফৌজদারি মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে কোনো চাকরিপ্রার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে তখনই, যদি এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় যা দেখায় যে অভিযোগকারীকে জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগ করে আপস করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
প্রাথমিক পর্যায়ে তেলেঙ্গানা পুলিশ নিয়োগ বোর্ড প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল করেছিল এই যুক্তিতে যে মামলাটি তার নৈতিক স্খলনের ইঙ্গিত বহন করে। পরে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের একক বিচারকের বেঞ্চ সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু পুনর্বিবেচনার পরও নিয়োগ বোর্ড আবারও নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর একক বিচারকের বেঞ্চ দ্বিতীয়বারের মতো প্রার্থীর নিয়োগের পক্ষে রায় দেন। তবে পরবর্তীতে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সেই আদেশ বাতিল করলে প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন।
বিয়ের আগের সম্পর্ক নিয়ে পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট বলেন, বর্তমান সমাজে এ ধরনের সম্পর্ক ক্রমশ সাধারণ হয়ে উঠছে। যেখানে দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্কে থাকেন, সেখানে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে সম্পর্কটি উভয়ের বৈধ সম্মতির ভিত্তিতেই বজায় ছিল।
দুই বিচারপতির বেঞ্চ আরও বলেন, মামলার নথিপত্র অনুযায়ী প্রার্থী ও অভিযোগকারী প্রতিবেশী ছিলেন এবং বহু বছর ধরে একে অপরকে চিনতেন। এছাড়া আপসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জবরদস্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা চাপ প্রয়োগের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, মূল অভিযোগটি ছিল প্রতারণা সংক্রান্ত। আর এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন অভিযোগকারী নিজেই। তিনি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে তিনি প্রতারিত হয়েছেন কি না।
বেঞ্চ আরও বলেন, অভিযোগকারীকে প্রতারণা করে সম্পর্কে জড়ানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে একমাত্র অভিযোগকারীই নির্ভরযোগ্যভাবে বক্তব্য দিতে পারতেন। সাধারণ মানুষ বা তৃতীয় পক্ষ এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, যেহেতু অভিযোগকারী নিজেই মামলা চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং মীমাংসায় সম্মতি দিয়েছেন, তাই পুলিশ নিয়োগ বোর্ডের কাছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না যে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নৈতিক অযোগ্যতার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া নিষ্পত্তি হওয়া ফৌজদারি মামলার সঙ্গে জড়িত চাকরিপ্রার্থীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালত বলেন, কেবল তখনই কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক মতামত গঠন করা যেতে পারে, যখন নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বোঝা যায় যে অপরাধটি বাস্তবে সংঘটিত হয়েছিল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।
এই মামলার ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড প্রয়োগ করে বেঞ্চ বলেন, প্রতারণার অভিযোগটি আদৌ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নিয়েই গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। কারণ অভিযোগকারী নিজে মামলাটি এগিয়ে নেননি এবং প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।
সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট প্রার্থীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করেন। আদালত রায়ে বলেন, মামলার বিদ্যমান তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তেলেঙ্গানা পুলিশ নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার কোনো সুযোগ নেই।