Views: 0
দিপালী রানী রায়:
খামারজুড়ে হাজার হাজার মুরগি। প্রতিদিন খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত খামারিরা। কিন্তু দিন শেষে হিসাবের খাতায় মিলছে না আয়-ব্যয়ের সমীকরণ। একদিকে মুরগির খাবার, বাচ্চা ও ওষুধের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তি। অথচ কমছে মুরগি ও ডিমের বিক্রয়মূল্য। ফলে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা খামার টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েক’শ শ্রমিকদের জীবিকাও।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে পোল্ট্রি শিল্পের এমন সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে। রাজারহাটে ব্রয়লার খামারিরা উৎপাদন উপকরণের বাড়তি দামে দিশেহারা। অন্যদিকে ফুলবাড়ী উপজেলায় ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও লাভ কমছে, কোথাও মূলধন টিকিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজারহাট উপজেলার বাছড়া এলাকার আহসান পোল্ট্রি ফার্ম এবং চাকিরপশার তালুক গ্রামের ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মের চিত্র এই সংকটের বাস্তব উদাহরণ। একটি খামারে ১ হাজার, অন্যটিতে ৫ হাজার ব্রয়লার মুরগি পালন করা হয়। দুই খামারের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অথচ মুরগি বিক্রি করে আয় কমেছে।

আহসান পোল্ট্রি ফার্মের স্বত্বাধিকারী আহসান হাবীব হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি বস্তা পোল্ট্রি ফিডের দাম ছিল ৩ হাজার ৩০০ টাকা। অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তার খামারে মাসে ৬০ বস্তা এবং ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে ৩০০ বস্তা খাবার প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে শুধু ফিডের দাম বাড়ার কারণে দুই খামারের মাসিক ব্যয় বেড়েছে ৭২ হাজার টাকা।
মুরগির বাচ্চা কেনার খরচও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রতিটি বাচ্চার দাম ছিল ৩২ টাকা, অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৪৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি বাচ্চায় বাড়তি গুনতে হচ্ছে ১২ টাকা।
ওষুধ ও পরিচর্যার উপকরণের দামও বেড়েছে। রেস্টলিফের প্রতি লিটারের দাম ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬০ টাকা, টু প্লাসের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং পোল্ট্রি খাবার স্যালাইনের দাম প্রতি কেজি ১৫০ থেকে বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে। মুরগির ঘরের বিছানা তৈরির তুষের দাম কেজিতে ১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা এবং কাঠের গুঁড়ার প্রতি বস্তার দাম ২০০ থেকে বেড়ে ৩০০ টাকা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিলেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ বিল ছিল ৩ হাজার টাকা, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে আগে ৬ হাজার টাকা বিল এলেও সেপ্টেম্বরে দিতে হয়েছে ৮ হাজার টাকা।
তবে খামারিদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মুরগির বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া। সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৪২ টাকা দরে। অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২৮ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে কমেছে ১৪ টাকা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দুই খামারের বিক্রিতে। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৯৯৫ কেজি মুরগি বিক্রি করে আয় হয়েছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৯০ টাকা। অক্টোবরে ১ হাজার ৮০০ কেজি মুরগি বিক্রি করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। এক মাসে বিক্রির পরিমাণ ও দাম কমে মোট বিক্রি কমেছে ৫২ হাজার ৮৯০ টাকা।
অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার কেজি মুরগি বিক্রি করে আয় হয়েছিল ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। অক্টোবরে ৯ হাজার ১০০ কেজি বিক্রি করেও পাওয়া গেছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ বিক্রির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও কম দামের কারণে আয় কমেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা।
এই হিসাব শুধু বিক্রির পরিমাণ ও আয়ের তুলনা। এর বাইরে ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। ফলে প্রকৃত লাভ-লোকসানের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আহসান হাবীব হাসান বলেন, ‘ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল, লিটার, তুষ ও গাড়িভাড়া—সবকিছুর দাম বাড়ছে। অথচ মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে কেজিতে ১৪ টাকা দাম কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ঋণ করে খামার শুরু করেছিলাম, এখন সেই ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি জানান, সোনালী ব্যাংক ও ব্যুরো বাংলাদেশ এনজিও থেকে মোট পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে খামার শুরু করেন। নিজস্ব জায়গায় আহসান পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তুলতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মকে প্রতি মাসে শেড ভাড়া বাবদ দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। দুই খামারে চারজন শ্রমিক কাজ করেন, তাদের মাসিক মজুরি বাবদ ব্যয় প্রায় ১২ হাজার টাকা।
একই সংকটে রয়েছেন রাজারহাটের নাজিমখান ইউনিয়নের মনিডাকুয়া গ্রামের খামারি আতিকুর রহমান ও রবিউল ইসলাম। আতিকুর রহমান বলেন, ‘আগে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হতো। কিন্তু যেভাবে ফিড, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ বাড়ছে, তাতে এখন সেই লাভ থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।’
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘লাভের কথা বাদই দিলাম, এখন আসল পুঁজিটুকু টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা মুশকিল।’
শুধু ব্রয়লার নয়, ডিম উৎপাদনকারী খামারিরাও রয়েছেন একই সংকটে। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের সুখদেব গ্রামের আবুল কালামের রয়েছে সাড়ে ৫ হাজার মুরগি। খামারটির মালিক জানান, ফিড, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ টাকা। অথচ বাজারে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকছে খুবই সামান্য। কোনো কোনো সময় লোকসানও গুনতে হচ্ছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়ছে খামারের শ্রমিকদের জীবনেও। মুন্সি পোল্ট্রি ফার্মের কর্মচারী একরামুল হক বলেন, প্রতিদিন ডিমের বাজার ওঠানামা করে। কখনো চাহিদা কমে গেলে খামারিরা বিপাকে পড়েন। মালিক লাভ করতে না পারলে শ্রমিকদের জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, ‘মহাজন লাভ করতে না পারলে শ্রমিকরা কীভাবে বাঁচবে?’
একই খামারের কর্মচারী মিলন জানান, ভোর ৫টায় খামারে এসে মুরগিকে খাবার ও পানি দেওয়া, খামার পরিষ্কার করাসহ নানা কাজ করতে হয়। সকাল সাড়ে ১১টা ও বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো সংরক্ষণ ও বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও ডিমের দাম কমে গেলে চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। তখন তিনজনের জায়গায় দুজন কর্মচারী দিয়ে কাজ চালানো হয়। এতে শ্রমিকদের মধ্যেও চাকরি হারানোর আতঙ্ক বাড়ে।
কুড়িগ্রাম জেলা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিয়াকত আলী রিটু বলেন, অনেক উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে ইতিমধ্যে পোল্ট্রি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হলে ফিড ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে কৃষকদের মতো বিশেষ হারে বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগ করেও খামারিদের পথে বসতে হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলায় বর্তমানে ২৭৫টি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এসব ডিম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। তবে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি ও বাজারদরের অস্থিরতায় এ খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রহমত আলী জানান, প্রতিটি জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খামারীরা বিপাকে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকার ফিডের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকির বিষয়টি বিবেচনা করছে। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে খামারিরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।