Views: 1

।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার খাতা পুনঃমূল্যায়নে এ পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি আবেদন জমা পড়েছে এবং এসব খাতা মূল্যায়নে সরকার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যেমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এ ধরণের বহুল প্রত্যাশিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদও সাধূবাদ জানাই। তবে শুধু এসএসসি নয়, এইচএসসি পরীক্ষার খাতা পুনঃমূল্যায়নের জন্যও একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারের এই বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে—যার মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পুরো সমাজ উপকৃত হবে।
আমার দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত হলো, ঢালাওভাবে খাতা পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ থাকলে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপরই সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই একজন পরীক্ষার্থী ঠিক কতটি পত্রের জন্য বা কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে আবেদন করতে পারবে, তা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন । বর্তমান ব্যবস্থায় দেখা যায়, একজন পরীক্ষার্থী তার ইচ্ছামত অনেক গুলো পত্রে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে থাকে। তাদের প্রত্যাশা সহানুভূতিশীল কোনো শিক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলে হয়তো সব বিষয়ে পাস নম্বর কিংবা জিপিএ-৫.০০ পাওয়া যাবে।
পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশানুযায়ী না হলে শিক্ষা বোর্ডের সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে এবং প্রয়োজনীয় ফি প্রদান করে শিক্ষার্থীরা আবেদন করে। এই ফি-এর টাকা শিক্ষা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট উত্তরপত্র নিরীক্ষক এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাই পেয়ে থাকনে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এত প্রক্রিয়ার পরও অধিকাংশ পরীক্ষার্থীর ফলাফল আশানুরূপভাবে পরিবর্তিত হয় না।
বিষয়টি একটি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্পষ্ট করা যাক। ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সারাদেশে মোট ৭,৩৩,৬৯৭ জন পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণ বা ‘বোর্ড চ্যালেঞ্জ’-এর জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু চূড়ান্তভাবে মাত্র ১১,৩৬২ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল সংশোধিত বা পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ, আবেদনকারীদের সাপেক্ষে ফলাফল পরিবর্তনের গড় হার মাত্র ১.৫৫%। শতাংশের হিসাবে ২০২৫ সালের এসএসসিতে এই পরিবর্তনের হার ছিল ২.৭% এবং এইচএসসিতে প্রায় ৩.৩২%। একইভাবে ২০২৪ সালে এসএসসিতে ২% ও এইচএসসিতে ২.১৩% এবং ২০২৩ সালে এসএসসিতে ২.৫% ও এইচএসসিতে ২.৭% ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছিল। শতকরা হার যাই হোক না কেন, দেখা যাচ্ছে আবেদনকারীর সংখ্যা যেখানে লাখের ঘরে, সেখানে ফলাফল পরিবর্তন হচ্ছে মাত্র কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর। ২০২৬ সালের আবেদনের বিশাল সংখ্যাও ইতিমধ্যেই আমরা জানতে পেরেছি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংশ্লিষ্ট সবার জানা প্রয়োজন। একজন পরীক্ষক খাতা মূল্যায়নের পর যে নম্বর প্রদান করেন, তা সঠিক কি না বা যোগফলে কোনো ভুল আছে কি না—প্রধান পরীক্ষক ও নিরীক্ষক তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী যখন ‘বোর্ড চ্যালেঞ্জ’ করে, তখন মূলত খাতা পুনঃমূল্যায়ন করা হয় না; বরং কেবল প্রাপ্ত নম্বরের যোগফল সঠিক আছে কি না (পুনঃনিরীক্ষণ) তা দেখা হয়। পরীক্ষক যদি কোনো প্রশ্নের উত্তরে ভুলবশত নম্বর কম বা বেশি দিয়ে থাকেন, তা যেহেতু পুনরায় মূল্যায়ন করা হয় না, ফলে শিক্ষার্থী তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। যেখানে কেবল নম্বরের যোগফল পুনঃনিরীক্ষণ করতেই উপরে উল্লেখিত হারে শত শত শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, সেখানে আসল খাতা মূল্যায়নে যে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে না—তা বলা যায় না। বিজ্ঞ পাঠক ও সচেতন সমাজ নিশ্চয়ই এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন।
শিক্ষক হিসেবে আমি আমার কোনো সহকর্মী বা পেশাকে খাটো করছি না। মানুষ মাত্রই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আদালতে বিচারকের রায় কারো পছন্দ না হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির যেমন উচ্চতর আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকে এবং এতে মূল বিচারককে ছোট করা হয় না—ঠিক তেমনি খাতা কেবল পুনঃনিরীক্ষণ (যোগফল যাচাই) না করে, কোনো শিক্ষার্থী চ্যালেঞ্জ করলে এসএসসির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞ সিনিয়র শিক্ষক এবং এইচএসসির ক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক পদমর্যাদার অভিজ্ঞ শিক্ষককে দিয়ে খাতা ‘পুনঃমূল্যায়ন’ করানো উচিত। এতে পরীক্ষার্থীর ন্যায্য ফলাফল পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত হবে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী হয়তো এই কারণেই পুনঃমূল্যায়নের জন্য একটি যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরির তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই—বিদ্যমান ‘পুনঃনিরীক্ষণ’ ব্যবস্থার পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ ‘পুনঃমূল্যায়ন’ ব্যবস্থা চালু করাই হবে সময়ের সেরা সিদ্ধান্ত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে খাতা পুনঃনিরীক্ষণ ব্যবস্থা বাতিল করে পুনঃমূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করেছে। তবে অবশ্যই ঢালাওভাবে অনেকগুলো পত্রে পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ না রাখাই যুক্তিসঙ্গত। উত্তরপত্র মূল্যায়নে কেমন ভুল বা বিভ্রান্তি ঘটতে পারে, সে বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত দুটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করছি:
প্রথম অভিজ্ঞতা: আমার বড় ছেলে ২০১০ সালে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তখন উপজেলা ভিত্তিক পরীক্ষা হতো। ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, সে প্রতিটি বিষয়ে ৯০-এর উপরে নম্বর পেলেও বাংলায় পেয়েছে মাত্র ৬২। এই ফলাফলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আমার সন্তান কান্না শুরু করে এবং একপর্যায়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সারারাত চোখ খোলা রেখে বিছানায় শুয়ে ছিল সে। আমরা তার স্নায়বিক কোনো জটিলতা তৈরি হলো কি না—তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও অসহায়ত্বের মধ্যে রাত কাটাই। পরদিন কিছুটা সুস্থ হলে তাকে আমরা বোঝাই যে, পঞ্চম শ্রেণির ফলই জীবনের শেষ কথা নয়। পরবর্তীতে আমি খাতা চ্যালেঞ্জ করলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জানান, প্রচলিত নিয়মে যোগফল দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই; খাতা পুনঃমূল্যায়ন করতে হলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লাগবে। আমরা নিয়ম মেনে ব্যাংকে ফি জমা দিয়ে আবেদন করি। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা গেল, তার প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৯২! মূল ঘটনাটি ঘটেছিল—পরীক্ষক (একজন প্রধান শিক্ষিকা) খাতা মূল্যায়ন শেষে ৬২ নম্বর পর্যন্ত গণনা করে ওয়াশরুমে যান এবং ভুলবশত সেই ৬২ নম্বরই ওপরে পোস্টিং দিয়ে দেন। ওয়াশরুম থেকে এসে তিনি আর পুনরায় নম্বরটি গণনা করেননি।
দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা: এটি ২০১১ সালের ঘটনা। এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে আমি জীববিজ্ঞান ১ম পত্রের (বিষয় কোড: ১৭৮) ২৫২টি উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে দিনাজপুরের একটি বেসরকারি কলেজের প্রধান পরীক্ষকের নিকট পাঠাই। খাতা পাঠানোর তিনদিন পর উক্ত প্রধান পরীক্ষকের অধীনে থাকা একজন নিরীক্ষক (মহিলা প্রভাষক) আমাকে ফোন করে জানান, আমি একটি উত্তরপত্রে ৭৫-এর মধ্যে ৭৩ নম্বর দিয়েছি, কিন্তু তার দৃষ্টিতে শিক্ষার্থীটি ৬ বা ৭ নম্বরের বেশি পাওয়ার যোগ্য নয়! তিনি বেশ কড়া সুরে মন্তব্য করেন যে, আমি নিশ্চিতভাবেই নিজে খাতা না দেখে স্ত্রী বা কোনো ছাত্রকে দিয়ে মূল্যায়ন করিয়েছি এবং সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে আমার আরও পড়াশোনা ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। আমি তাঁকে বিনীতভাবে বলি, আমার ভুল হতে পারে, তবে আপনার অনুমান সঠিক নয়। তিনি নাছোড়বান্দা; আমাকে দিনাজপুর গিয়ে উত্তরপত্রটি পুনর্মূল্যায়ন করে আসতে হবে, নতুবা তিনি বোর্ডে অভিযোগ করবেন।
আমি তাঁকে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করতেই মূল রহস্য উন্মোচিত হয়। তিনি বললেন, বোর্ডের প্রশ্নপত্রের সাথে উত্তরপত্রের কোনো মিলই নেই। তখন আমার মনে পড়ল—উত্তরপত্রটি ছিল সত্যিই অসাধারণ মানের, যা দেখে আমি ৭৫-এ ৭৫ দিতে চেয়েও ২ নম্বর কম দিয়ে ৭৩ দিয়েছিলাম। আসলে ওই পরীক্ষার্থীটি ছিল পুরোনো সিলেবাসের মান উন্নয়ন পরীক্ষার্থী, যার প্রশ্নপত্র সম্পূর্ণ আলাদা ছিল! যখন আমি উক্ত নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষককে বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম, তখন তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইলেন। কারণ পুরোনো সিলেবাসের প্রশ্ন যে আলাদা হয়, তা তাঁদের ধারণাতেই ছিল না এবং প্রশ্ন না মেলায় তাঁরা শিক্ষার্থীটিকে ফেল করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন!
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে যে, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং পরীক্ষকের অজান্তেই বড় ধরনের ভুল হয়ে যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও খাতা ‘পুনঃমূল্যায়ন’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান, আমাদের ভবিষ্যৎ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কোনো ভুল পদ্ধতির কারণে তাদের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হোক—তা কারও কাম্য হতে পারে না।
বর্তমান বাস্তবতায় যদি উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়নের একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রবর্তিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কুড়িগ্রামের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আমার মতো একজন ক্ষুদ্র শিক্ষকের এই প্রস্তাব বা বার্তা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে কি না—তা আমি জানি না। তবে সচেতন পাঠক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই এটি নীতি নির্ধারক মহলের দৃষ্টিগোচর হতে পারে। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; আমাদের সবার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মেধার ন্যায্য অধিকার ও সুবিচার নিশ্চিত করা।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।