• সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ন
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

জীনগ্রস্ত ব্যক্তির গাছের মগডালে ওঠার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

প্রধান প্রতিবেদক:
Update : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।

আজকাল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায় জীনগ্রস্ত পুরুষ বা মহিলা গাছের মগডালে বসে আছেন। সাধারণ মানুষের ধারণা, অলৌকিক কোনো সত্তা বা জ্বীন-পরী তাকে টেনে মগডালে তুলে নিয়েছে। এ ঘটনার পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়, বরং বিজ্ঞানের চমৎকার ব্যাখ্যা রয়েছে।

মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ ও কোয়ান্টাম সংযোগ:
এই প্রক্রিয়াটি বুঝতে হলে আমাদের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বুঝতে হবে। একজন হ্যাকার যেমন সিম ক্লোন করে গ্রাহকের কল বা ওটিপি নিয়ন্ত্রণ করে, একইভাবে জ্বীন বা কোনো বাহ্যিক প্রভাব মানুষের চিন্তার জগত বা মস্তিষ্ককে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে। বিজ্ঞান বলছে, কোয়ান্টাম স্তরে নিউরনের সাথে সংকেত আদান-প্রদান করা সম্ভব, যাকে আলবার্ট আইনস্টাইন “Spooky action at a distance” বলে অভিহিত করেছেন। এই ‘ব্রেইন হ্যাকিং’-এর ফলেই ব্যক্তি নিজের চেতনার বাইরে গিয়ে কাজ করতে শুরু করে, যাকে সাধারণ মানুষ ‘জ্বীনে ধরা’ বলে মনে করে।

কোয়ান্টাম বায়োলজি ও চেতনার প্রভাব:
মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ বা ‘ব্রেইন হ্যাকিং’-এর যে বিষয়টি উল্লেখ করেছি, তার সমর্থনে আধুনিক বিজ্ঞানীদের কিছু ধারণা রয়েছে। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ (Roger Penrose) এবং অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামারফ (Stuart Hameroff) তাদের ‘Orch-OR’ তত্ত্বে প্রস্তাব করেছেন:”আমাদের চেতনা বা চিন্তা কেবল নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত নয়, এটি মাইক্রোটিউবিউলসের (Microtubules) মধ্যে ঘটা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার ফল।”অর্থাৎ, কোনো বাহ্যিক শক্তি যদি এই কোয়ান্টাম স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে মানুষের আচরণ সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব নয়।

বায়োট্রাইবোলোজি: গ্রিপ বা আঁকড়ে ধরার বিজ্ঞান:
গাছের মগডালে ওঠার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বায়োট্রাইবোলোজি (Biotribology) সরাসরি কাজ করে। এটি মূলত ঘর্ষণ (Friction) এবং গ্রিপের বিজ্ঞান। আমাদের হাতের তালু ও পায়ের তলা যখন সামান্য ঘামে (আর্দ্র হয়), তখন ত্বকের কেরাটিন স্তর নরম হয় এবং গাছের অমসৃণ তলের সাথে স্পর্শের ক্ষেত্রফল (Contact area) বেড়ে যায়। এটি একটি শক্তিশালী আঠালো বন্ধন বা ‘Adhesion-based grip’ তৈরি করে।
আমাদের আঙুলের সূক্ষ্ম রেখাগুলো প্রাকৃতিক ‘ট্রেড’ (Tread) হিসেবে কাজ করে যা পানি বা ধুলো সরিয়ে গাছের বাকলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে। এছাড়া হাতের নরম টিস্যু গাছের খাঁজের মধ্যে ঢুকে গিয়ে একটি ‘Mechanical Interlock’ তৈরি করে, যা অনেকটা গিয়ার বা চেইনের মতো কাজ করে ব্যক্তিকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
শরীরের অতিমানবিক শক্তি প্রদর্শন (অ্যাড্রিনালিন ও হিস্টেরিক্যাল স্ট্রেন্থ):
স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্ক পেশির মাত্র ৩০% থেকে ৫০% শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। একে বলা হয় “Neural Inhibition”। এটি মূলত হাড় বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া থেকে শরীরকে রক্ষা করার একটি ‘সেফটি লক’। কিন্তু বিশেষ মুহূর্তে এই লক খুলে যায়।
যখন কোনো ব্যক্তি চরম বিপদে বা তীব্র ঘোরের (Trance) মধ্যে থাকেন, তখন মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা বিপদের সংকেত দেয় এবং কিডনির ওপরের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে প্রচুর পরিমাণে ‘এপিনেফ্রিন’ বা অ্যাড্রিনালিন হরমোন নিঃসরণ হয়। এই হরমোন লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেনকে দ্রুত গ্লুকোজে রূপান্তর করে পেশিতে অফুরন্ত শক্তি জোগায়। শ্বাসনালী প্রসারিত হয়ে শরীরে প্রচুর অক্সিজেন প্রবেশ করে এবং হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়। এই অবস্থায় মানুষ তার চূড়ান্ত শক্তি বা “Absolute Strength” প্রয়োগ করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় “Hysterical Strength” বলা হয়।

অতি মানবিক শক্তি প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত:
(১) ১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের অ্যাঞ্জেলা কাভালোর ছেলে টনি একটি ১৯৬৪ মডেলের শেভ্রোলেট ইমপালা গাড়ির নিচে কাজ করছিল। হঠাত জ্যাক পিছলে গিয়ে গাড়িটি টনির ওপর পড়ে যায়। অ্যাঞ্জেলা দৌড়ে এসে গাড়ির পেছনের অংশটি খালি হাতে তুলে ধরেন এবং প্রতিবেশীরা না আসা পর্যন্ত প্রায় ৫ মিনিট সেটি ধরে রাখেন। এই গাড়িটির ওজন ছিল প্রায় ১,৫০০ কেজির বেশি। এ ভাবে টনি বেঁচে যায়। একজন মহিলার পক্ষে একহাজার পাঁচশত কেজি ওজন দু’হাত দিয়ে উত্তোলন করা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনই সম্ভব নয়। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ দিচ্ছে সম্ভব।
(২) ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা রাজ্যের টম বয়েল নামের এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশী এক কিশোরকে বাঁচাতে একই কাজ করেছিলেন। একটি শেভ্রোলেট কামারো গাড়ি এক সাইকেল আরোহী কিশোরকে চাপা দিলে টম খালি হাতে গাড়িটি তুলে ধরেন। এর ফলে কিশোরটি বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়। পরে টম জানিয়েছিলেন যে, তিনি জানতেনই না তার মধ্যে এত শক্তি আছে।
(৩). ২০১২ সালে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া লরেন কর্নাকি নামের এক তরুণী তার বাবাকে বাঁচাতে একটি বিএমডব্লিউ (BMW) গাড়ি তুলে ধরেছিলেন। গাড়ির নিচে কাজ করার সময় তরুনীর বাবা জ্যাক ফেইল করে গাড়ির নীচে পড়ে যান। লরেন তাৎক্ষণিকভাবে গাড়িটি টেনে তোলেন এবং তার বাবাকে বের করে আনেন। এরপর তিনি তার বাবাকে সিপিআর (CPR) দিয়ে বাঁচিয়ে তোলেন। মূলত ঐ মুহূর্তে তাদের মস্তিষ্কের সেফটি লক খুলে যাওয়ায় তারা এই শক্তি পেয়েছিলেন।

উপসংহার:
জীনগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। জীন যখন মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন বায়োট্রাইবোলোজির প্রয়োগ ঘটিয়ে শক্ত গ্রিপ তৈরি হয় এবং অ্যাড্রিনালিনের জোয়ারে তৈরি হয় অবিশ্বাস্য গতি ও শক্তি। জ্বীন কাউকে টেনে গাছের ওপর উঠায় না; বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক ও জৈবিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই ব্যক্তি সেই অসাধ্য সাধন করেন।’ যে কারণ গুলো বিজ্ঞান যেদিন আবিস্কার করবে সেদিন সব বিষয় দিবালোকের মতো পরিস্কার হবে।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর