Views: 0

ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (এনইইটি) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দিল্লিতে শুরু হওয়া নজিরবিহীন ছাত্র আন্দালনের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্যের লন্ডনসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপির)-এর ডাকে এবং শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকে প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসব শহরের রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার প্রবাসী ভারতীয়রা। –খবর তোলপাড়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ইউনিয়ন স্কয়ারে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে বিক্ষোভ করেন প্রবাসীরা। এসময় তাদের হাতে ‘ম্যায় ভি ককরোচ’ (আমিও ককরোচ) লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে।
একই দিনে যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে শিক্ষার্থী ও প্রবাসী ভারতীয়রা জড়ো হয়ে স্লোগান দেন এবং ঘটনার স্বচ্ছ জবাবদিহিতা দাবি করেন। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সামনেও সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এছাড়া কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, জার্মানির বার্লিন এবং নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সামনেও এই আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’ এবং ‘স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই)’-সহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা বিশ্বজুড়ে এই কর্মসূচিগুলোর আয়োজন করেন।
বুধবার (২২ জুলাই) ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটসহ দিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদ জানিয়ে সরব হয়েছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে তাকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়।
বুধবার সকালেও কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা দেশটির পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ চলাকালে তারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজকর্মী এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষকদের মতে, দিল্লিতে চলমান শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মূল্যায়নে, এই ছাত্র আন্দোলন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বা ‘বিপদঘণ্টা’ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল তরুণ ভোটাররা। কিন্তু পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরকারের প্রতি এই প্রজন্মের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত আত্রির মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের দাবিকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, এই আন্দোলন সরকারকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে সাধারণ মানুষের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতি।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মতে, অতীতে বিভিন্ন আন্দোলনকে সরকার বা মূলধারার গণমাধ্যম নির্দিষ্ট জাতিগত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে বিতর্কিত করতে সক্ষম হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে কৃষক আন্দোলনকে ‘খালিস্তানি’ এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনকে ‘মুসলিম বিক্ষোভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে এবারের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার সততা, মেধার মূল্যায়ন এবং বেকারত্বের মতো ইস্যু। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয় ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজের বৃহৎ অংশকে একত্রিত করেছে। ফলে আন্দোলনকারীদের কোনো নির্দিষ্ট নেতিবাচক পরিচয়ের ছাঁচে ফেলা সরকারের জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।