ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যম। একই সময়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। বিপুল আসনে জয় পাওয়া ভারতীয় জনতা পার্টি এখন নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত, আর সেই দায়িত্বে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠানো হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে।-খবর তোলপাড়।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই হাওড়া, বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, বাঁকুড়া ও কলকাতার একাধিক এলাকায় তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাওড়ার উদয়পুর ও রাজারহাট নিউ টাউনে দুই বিজেপি কর্মী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বিজেপি, অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে বীরভূমের নানুর ও কলকাতার বেলেঘাটায় তাদের দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।
এই সহিংস পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে আসানসোল শিল্পাঞ্চলসহ একাধিক এলাকায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, কিছু স্থানে দোকানপাটেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলের অফিস ভাঙচুরের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহিংসতা রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, যেখানেই ভাঙচুর বা হামলার ঘটনা ঘটবে, সেখানে অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্য প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এই নির্বাচনে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে গেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এটি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন।
এই ফল ঘোষণার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি নির্বাচন হারেননি এবং তার দলের বিরুদ্ধে “বলপ্রয়োগ করে হারানোর চেষ্টা” করা হয়েছে। মমতার এই অবস্থান রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
সরকার গঠন ও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে এখন কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিজেপি। দলীয় সূত্রের বরাতে আনন্দবাজার জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তার সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। বিজেপি বিধায়কদের বৈঠকের মাধ্যমে নতুন পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন করা হবে, যিনি কার্যত রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হবেন।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠান ৯ মে হতে পারে, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীর সঙ্গে মিলিয়ে আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “শপথ গ্রহণের তারিখ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই চূড়ান্ত করবে।”
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজ্য রাজনীতির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সহিংসতা, পাল্টা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক সতর্কতার মধ্যে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অমিত শাহের কলকাতা সফরকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক মহলে বাড়ছে আগ্রহ। তার উপস্থিতিতেই ঠিক হবে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।