।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
কুড়িগ্রামের কাঁঠালবাড়ি বাংটুর ঘাট হতে ফুলবাড়ি রোডের ধরলা নদীতে ১৭৯০ মিটার দীর্ঘ ‘তৃতীয় ধরলা সেতু’ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল সম্প্রতি বাংটুর ঘাট পরিদর্শন করেছে এবং ব্রিজ নির্মাণের ব্যাপারে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে। এই স্বপ্নের সেতুটি নির্মিত হলে অবহেলিত কুড়িগ্রামের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে একটি নতুন সম্ভাবনার পালক যুক্ত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে এই অর্জনের চেয়েও বড় একটি প্রাপ্তি আমাদের চোখ জুড়িয়েছে। আমার দীর্ঘ ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতায় এই প্রথম দেখলাম—দল-মত ও আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে কুড়িগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নে জেলার জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করছেন! এটি যেন একতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
যেমনটি মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন—
“আমাদের শক্তি আমাদের ভিন্নতার মাঝে নয়, বরং সেই ভিন্নতাগুলোকে একসাথে মিলিয়ে এক সুতোয় গাঁথার শক্তির মাঝে।”
আমরা দেখেছি, কুড়িগ্রাম-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ বাংটুর ঘাটে ব্রিজ নির্মাণের দাবিতে জাতীয় সংসদে ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রাখেন। এরপরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) জনাব রুহুল কবীর রিজভী গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এই সেতু নির্মাণের জন্য ডিও লেটার (আধাসরকারি পত্র) প্রদান করেন। একই ধারাবাহিকতায় জেলা পরিষদের সম্মানিত প্রশাসক মো: সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদও ডিও লেটার প্রদান করে এই দাবিকে আরও বেগবান করেন।
সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হয়েছিল সেদিন, যখন পরিদর্শনরত চীনা প্রতিনিধিদলের পাশে কুড়িগ্রামের সকল স্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে একসাথে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো অঞ্চলের নেতৃত্ব নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক টেবিলে বসেছে, তখনই সেখানে বড় বড় বিজয় অর্জিত হয়েছে। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া ইউরোপের দেশগুলো কেবল পারস্পরিক সহযোগিতা ও একতার জোরে আজ পৃথিবীর বুকে অন্যতম উন্নত অঞ্চল।
আমাদের কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ মনে করে, এই গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অর্জনটি কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং এটি কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের একটি সুন্দর, সমন্বিত ও নিঃস্বার্থ কর্মযজ্ঞের ফসল। আর এর পরম উপকারভোগী কুড়িগ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। অতীতে আমাদের এই জনপদে এ ধরণের বিরল ও পজিটিভ দৃষ্টান্ত আমরা কখনও দেখি নাই।
নেতৃবৃন্দের প্রতি বিনম্র অনুরোধ—আপনাদের এই ঐক্যের ধারা যেন কখনো ম্লান না হয়। রাজনীতির মাঠে ব্যক্তিগত মতাদর্শ, দলীয় চিন্তাভাবনা বা কৌশলগত ভিন্নতা থাকতেই পারে—সেটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু যখনই প্রশ্ন আসবে কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের, নদীভাঙন রোধের কিংবা নতুন কর্মসংস্থানের; তখন যেন আমরা সবাই এক ও অবিভাজ্য থাকি। কারণ—
“একা আমরা হয়তো এক ফোঁটা পানি, কিন্তু একসাথে আমরা এক বিশাল মহাসমুদ্র।” কুড়িগ্রামের আপামর জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে আপনাদের এই যে মহানুভবতা এবং একতার অনন্য নজির, তার জন্য আপনাদের প্রতি রইল অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনারা এভাবেই কুড়িগ্রামকে ভালোবেসে পথ দেখাবেন—এই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।