• সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ক্লাব কাপ ওপেন তায়কোয়ানডো চ্যাম্পিয়নশীপ ২০২৬ এ ১৫টি পদক জয় করে রাজশাহী তায়কোয়ানডো দোজাং চুক্তি হলে মোঘলহাটের পরিত্যক্ত স্থলবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ —দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আটোয়ারীতে তাফসিরুল কোরআন মাহফিল ও হাফেজ ছাত্রদের পাগড়ী প্রদান পরপর তিন ভূমিকম্পে কাঁপল বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল এক লাফে বিপুল পরিমাণে বাড়ল এলপিজির দাম কুড়িগ্রামে গাছে গাছে মুগ্ধর বাণি, মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে চারপাশে মাদক নির্মূলে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভূমিকা রাখতে হবে -রাজারহাটে মেজর জেনারেল (অব.) আমসাআ আমিন রাজারহাটে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে মাদ্রাসায় বিক্ষোভ, অধ্যক্ষের পদত্যাগ আটোয়ারীতে আগাছা নাশক বিষ স্প্রে করে বেগুন ক্ষেত জ্বালিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা আটোয়ারীতে নজরুল বর্ষের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

কুড়িগ্রামে গাছে গাছে মুগ্ধর বাণি, মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে চারপাশে

প্রধান প্রতিবেদক:
আপডেট: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

Views: 0

হুমায়ুন কবির সূর্য:

কুড়িগ্রামে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামীণ সড়কের দু’পাশে গাছের গায়ে লাগানো ছোট ছোট কিছু পোস্টার এখন ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। আর এই মুগ্ধতা ছড়ানোর নেপথ্যে রয়েছে মুগ্ধ নামের পঞ্চম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী। নিজের হাতের লেখায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক বাণী লিখে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুপাশের গাছে গাছে লাগিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে সে। ছোট্ট মুগ্ধর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নজর কেড়েছে সবার।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের শাহবাজার এলাকার ঘোগারকুটি গ্রামের সুন্দর একটি পাকা সড়ক। সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ। সেই গাছগুলির ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে সুন্দর হাতের লেখায় কয়েকটি পোস্টার। সেসব পোস্টারে লেখা, অকারণে গাছ কাটবো না, পাখি আমাদের বন্ধু মোড়ে গতি কমান জীবন বাঁচান বা মাদককে না বলুন।’ সড়কে এই পথ ধরে যারাই হেঁটে যাচ্ছেন, তারাই থমকে দাঁড়াচ্ছেন, পোস্টারের লেখাগুলো পড়ছেন আর মুগ্ধ হচ্ছেন। এই পোস্টারগুলো লিখেছে ওই গ্রামে অবস্থিত উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী মিছবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। বরাবর ক্লাসে ১ম হয় সে। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা করে এলাকার জন্য, দেশের জন্য ভাল কিছু করার। এজন্য সময় পেলেই হাতে রঙ-তুলি আর কাগজ নিয়ে পরম যত্নে মেঝেতে বসে বিভিন্ন বাণী লেখে ছোট্ট মুগ্ধ। তার চোখ-মুখে গভীর মনোযোগ। স্কুলে টিউটোরিয়াল ক্লাস থেকে ছবি আঁকা ও সুন্দর হাতের লেখার হাতেখড়ি তার। আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সে এখন একাই বদলে দিচ্ছে চারপাশের চিরচেনা রূপ। এ কাজে সহযোগিতা করছে তার ক্লাসের সহপাঠী ও এলাকার শিশুরা। মুগ্ধ নিজের সাইকেলে বা হেঁটে হেঁটে বন্ধুদেরকে নিয়ে সুতো দিয়ে গাছের গায়ে পোস্টার লাগায়। এজন্য একটি মই তৈরী করেছে সে। মুগ্ধ পোস্টার লাগায় আর বন্ধুরা মুগ্ধ চোখে মুগ্ধর কাজগুলো দেখে।

পথচারী রিয়াজুল ইসলাম জানান, ‘আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লেখাগুলো দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। এতো ছোট্ট একটা ছেলে এতো সুন্দর চিন্তা করতে পারে, তা ভাবাই যায় না। ওর লেখাগুলো পড়ে মানুষ যদি সচেতন হয় তাহলে সার্থক হবে ছেলেটি।’

ঘোগারকুটি গ্রামের আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ দেখে অভ্যস্থ। এগুলো কাজে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু আমাদের পাড়ার মুগ্ধ নামের ছোট্ট একটি ছেলে এভাবে নীতিকথা লিখে গাছপালায় প্রদর্শন করে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা মুগ্ধর জন্য অনেক আশীর্বাদ করছি। গ্রামের মানুষ মুগ্ধর লেখা পোস্টারগুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।’

আমরা সরাসরি মুগ্ধর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি। মুগ্ধর মা মমতা বেগম জানান, ‘আমার ছেলে ঘরে থাকা বিভিন্ন কার্টুনগুলো কেটে খাতার পৃষ্টা ছিড়ে সেখানে বিভিন্ন বাণী লিখে জমা করতো। এরপর পাড়ার বন্ধুরা মিলে একটা মই তৈরি করে আমার কাছ থেকেিআটা আর সুতো কিনে সেগুলো নিয়ে বাইরে যায়। পরে পাড়ার লোকজন এসে বলতে লাগলো তোমার ছেলে পুরো গ্রামজুড়ে গাছের মধ্যে পোস্টার লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। কথাগুলো শুনে আমরা বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। চোখদুটো ভিজে যায়। ছেলে যে এ ধরণের পরিকল্পনা করেছে আমার জানা ছিল না। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন। সমাজের জন্য মানুষের জন্য যেন সবসময় ভালো কিছু করে।’

শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ও মুগ্ধর বাবা সুজাউদ্দৌলা জানান, ‘স্কুল ছুটি শেষে বাসায় ফিরছিলাম সবাই বলাবলি করছে মুগ্ধ গাছে গাছে যেন কি লাগাচ্ছে। আমি সড়কের দুপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করি আমার ছেলের হাতের লেখা পোস্টার! সুন্দর সুন্দর নীতিবাক্য লিখে ছড়িয়ে দিয়েছে। গোপনে এসব কাজ করছিল সে। আমাকে জানায়নি। আমি সত্যি অবাক হয়ে গেছি। এতো ইমোশনাল হয়ে গেছি যে, বাসায় এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। আপনারা দোয়া করবেন ছেলে যতদিন এ ধরণের কাজ করবে ততদিন আমি তাকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করবো।’

মুগ্ধ উদ্বুদ্ধ হয়েছে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলীর কাছে। প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী জানান, ‘টিউটেরিয়াল ক্লাসে ছবি আঁকা, পোস্টার-প্লাকার্ড ও হাতের লেখা শিখানো হতো। মুগ্ধর হাতের লেখা ভালো ছিল। সে খুব মনযোগী ছাত্র। সবসময় নতুন কিছু করতে চাইতো। সেই চাওয়া থেকে হয়তো এমন ভালো কাজ করতে পেরেছে সে। এভাবে সকল শিক্ষার্থীরা যদি সামাজিক জনসচেতনামূলক কাজে এগিয়ে আসে তাহলে সমাজে ইতিবাচক েএকটা পরিবর্তন হবে।’

আমাদের কথা হয় মুগ্ধর সাথে। তার পরো নাম মিছবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। তারা দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। বাবা স্কুল শিক্ষক। মা গৃহিণী। পারিবারিকভাবে সে শিক্ষামূলক কাজে আগ্রহি ছিল। মা তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করতো। মুগ্ধ জানায়, ‘আমি ক্লাসে পোস্টার-প্লাকার্ড লেখা শিখে ২০টির মতো বাণী লিখে গোপনে জমা করি। আমি গ্রামের মানুষকে নিয়ে খুব চিন্তা করি। এলাকার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নয়, তারা অকারণে গাছ কেটে ফেলছে, বাড়ির চারপাশ নোংরা করে ফেলছে, অনেকে মাদকে আসক্ত। এসব মানুষকে সচেতন করার জন্য পোস্টার লিখে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তার দুপাশে লাগিয়ে দেই। যাতে তারা মনে করে অনেক কাজ আছে যেগুলো তারা না করলেও পারে। এভাবেই প্রতিবাদ ও মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ হাতে নেই আমি।’

মুগ্ধ আরও জানান, ‘আমার এই ছোট্ট কাজে যদি একজন মানুষও সচেতন হয় সেটাই হবে আমার সফলতা। এই কাজ আমি চালিয়ে যাবো।’

ফুলবাড়ী উপজেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বড়ভিটা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও সংস্কৃতিকল্যাণ ট্রাস্ট’র পরিচালক মো. নুর মোহাম্মদ বলেন, সমাজে সৃজনশীল ও সচেতনতামূলক কাজে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষর্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। এই ধরনের প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক শিশুরাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের জ্ঞান ও গরিমা দিয়ে সমাজ তথা দেশকে পাল্টে দিবে। আমাদের মুগ্ধর মতো শিশুদের পাশে থাকা দরকার। তাদের চিন্তা শক্তিকে বলিয়ান করতে সহযোগিতা করা দরকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর