Views: 2

ফিরোজ হোসেন বদলগাছী, (নওগাঁ) :
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নে পারিবারিক জমি বিরোধ মীমাংসার জন্য বসা সালিসে নির্ধারিত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ভুক্তভোগীর হাতে ১ লাখ টাকা তুলে দিয়ে বাকি ৫০ হাজার টাকা ‘খাটুনির মজুরি’ হিসেবে রেখে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান একেএম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে। এ ঘটনায় অভিযোগকারী নুর ইসলামের স্ত্রী তাহমিনা বেগম দাবি করেছেন, দুই দিন ধরে সালিসের পর জমির বিরোধ মীমাংসা হয় এবং জমির অংশ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাঁর স্বামীকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নির্ধারিত পুরো টাকা তাঁদের হাতে দেওয়া হয়নি।
তাহমিনা বেগমের অভিযোগ, গত ১৭ আগস্ট সোমবার ও ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ির সামনে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে জমি নিয়ে বিরোধের সালিস বসে। পরে বিরোধ মীমাংসা করে নুর ইসলামকে জমির অংশ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তাঁর দাবি, ১৯ আগস্ট বুধবার ওই টাকা আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের কক্ষে দেওয়া হয়। এরপর ২০ আগস্ট রাতে চেয়ারম্যান তাঁদের ডেকে নিয়ে তাঁর হাতে ১ লাখ টাকা দেন। বাকি ৫০ হাজার টাকা চেয়ারম্যান নিজের কাছে রেখে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাহমিনা বেগম বলেন, চেয়ারম্যান আমার হাতে ১ লাখ টাকা দিয়েছেন। আর ৫০ হাজার টাকা তিনি রেখে দিয়েছেন। চেয়ারম্যান বলেছেন—‘আমরা খেটেছি, আমরা খাব না?
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সালিসের খরচ বাবদ অপর পক্ষের প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। পাশাপাশি বকশিশ দেওয়ার কথাও ছিল। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নুরে আলম বাবুর পক্ষে মুমিন নামে এক ব্যক্তি চেয়ারম্যানের কাছে টাকা পৌঁছে দেন।
এদিকে সালিসে বিচারের আগে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধেও। তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন তিনি।
মাহাতাব আলী প্রামাণিক বলেন, আমার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। টাকা-পয়সার বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। এবং টাকা লেনদেনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না। তারা গরীব ভাত হয়না! টাকা কোথায় থেকে দিবে। ওই নারী আমার খুবই পরিচিত, তারা পাগল।
চেয়ারম্যান একেএম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে এর আগেও সালিসের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের ভাষ্য, কয়েক মাস আগে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের মিষ্টিআলার মোড় এলাকার একটি জমি নিয়ে সালিসে এক পক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
এ ছাড়া বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কেউ কেউ। উত্তর আধাইপুর হিন্দুপাড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক ও গর্ভধারণের ঘটনায় সালিসে লক্ষাধিক টাকার লেনদেনের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সালিসে বিরোধ মিটিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের প্রশ্ন, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত বা সালিসি কার্যক্রম কি ‘খাটুনির মজুরি’ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে?
অভিযোগের বিষয়ে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম রেজাউল কবির পল্টন বলেন, অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। রাজনৈতিক চক্রান্তে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করা ৫০ হাজার টাকা নিজের কাছে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বিষয়টি নিয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনির সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি লিখিতভাবে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে গ্রাম আদালতে বিচার করার পর ‘খাটুনির নামে’ মজুরি নেওয়ার কোনো বিধান নেই। এমনটা যদি হয়ে থাকে এবং অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—সালিসে নির্ধারিত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে কেন অভিযোগকারীর হাতে দেওয়া হলো ১ লাখ টাকা? বাকি ৫০ হাজার টাকার প্রকৃত হিসাব কী? সেটি কি সত্যিই সালিসের খরচ, বকশিশ নাকি ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া অর্থ—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।