।। নিকোলাস বিশ্বাস ।।
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী বাবা দিবস (ফাদার্স ডে) পালিত হয়। ২০২৬ সালে ২১শে জুন (রবিবার) বিশ্ব বাবা দিবস উদযাপিত হবে। এই দিনটি পৃথিবীর সকল বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ্য। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরামর্শদাতা, অভিভাবক এবং জীবনের পথপ্রদর্শক। বাবা হলেন সন্তানের মাথার ওপর এক অকৃত্রিম বটবৃক্ষ – যিনি নিজের সব কষ্ট আড়াল করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে আজীবন নিরলস সংগ্রাম করে যান। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পেছনে একজন বাবার অবদান অপরিসীম। তাই বাবার ত্যাগ, পরিশ্রম ও ভালোবাসাকে স্মরণ করার জন্য বিশ্ব বাবা দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশী।
মানবজীবনে বাবার ভূমিকা অনন্য। একজন শিশু জন্মের পর থেকেই বাবার স্নেহ, মমতা ও সুরক্ষার মধ্যে বড় হয়ে ওঠে। বাবা সন্তানকে সঠিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদান করেন। তিনি সন্তানের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। অনেক সময় একজন বাবা নিজের কষ্ট ও ত্যাগের কথা প্রকাশ করেন না, কিন্তু পরিবারের সুখ-শান্তি ও সন্তানের কল্যাণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যান। তাঁর কঠোর পরিশ্রমের ফলেই পরিবার নিরাপদ ও স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে।
বাবা দিবসের ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে এই দিবস পালনের ধারণার সূচনা হয়। এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সোনোরা স্মার্ট ডড (Sonora Smart Dodd) নামের এক নারী। ১৯০৯ সালে তিনি একটি গির্জায় মা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে মায়েদের অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে – যেসব বাবা তাঁদের সন্তানদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং আত্মত্যাগ করেন, তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যও তো একটি বিশেষ দিন থাকা উচিত।
সোনোরা তাঁর নিজের বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্টের জীবন থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। উইলিয়াম স্মার্ট ছিলেন একজন গৃহযুদ্ধের (American Civil War) অভিজ্ঞ সৈনিক। তাঁর স্ত্রী ষষ্ঠ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি একাই তাঁর ছয় সন্তানকে লালন-পালন ও শিক্ষিত করে তোলেন। একজন একক অভিভাবক হিসেবে তিনি যে দায়িত্বশীলতা, ত্যাগ ও ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা সোনোরার হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তাই তিনি তাঁর বাবার মতো সকল বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি বিশেষ দিবস চালুর উদ্যোগ নেন। সোনোরার প্রচেষ্টার ফলে ১৯১০ সালের ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহরে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। ধীরে ধীরে দিবসটি জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে।
বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং হৃদয়স্পর্শী। অনেক সময় বাবারা মায়ের মতো আবেগ প্রকাশ করেন না, কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা কোনো অংশে কম নয়। একজন বাবা সন্তানের সাফল্যে গর্ববোধ করেন এবং ব্যর্থতার সময় সাহস জোগান। তিনি জীবনের কঠিন সময়ে শক্ত ভিত্তির মতো পাশে দাঁড়ান। সন্তানের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া পূরণ করার জন্য তিনি নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজনকে বিসর্জন দেন। একজন বাবার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের মূল্য কখনোই সম্পূর্ণরূপে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব বাবা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাবার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই দিনে সন্তানরা বিভিন্নভাবে তাঁদের বাবাকে সম্মান জানায়। কেউ উপহার দেয়, কেউ শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করে, কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বাবা দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে বাবার অবদান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রভাবে পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ব্যস্ত জীবনযাত্রা, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং বিভিন্ন সামাজিক কারণে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে বাবা দিবস আমাদের পরিবারকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার একটি মূল্যবান উপলক্ষ্য। এই দিনটি আমাদের শেখায় যে, বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেও প্রকাশ করা উচিত। বাবা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য কেবল উপহার দেওয়া বা আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো বাবার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। একজন সন্তানের উচিত বাবার পরামর্শ মেনে চলা, তাঁর সম্মান রক্ষা করা এবং বার্ধক্যে তাঁর যত্ন নেওয়া। কারণ শৈশবে যিনি সন্তানের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে তাঁর পাশে দাঁড়ানো সন্তানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব বাবা দিবস তুলনামূলকভাবে নতুন একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদযাপন। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহাসিক দিবস নয়; বরং পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত হয়েছে। বাংলাদেশে বাবা দিবসের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ইতিহাস বা সরকারি ঘোষণা নেই। মূলত; ১৯৯০ -এর দশকের শেষ ভাগ থেকে এবং বিশেষ করে ২০০০ -এর দশকে গণমাধ্যম, স্যাটেলাইট টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে দিবসটি পরিচিত হতে শুরু করে। শহরকেন্দ্রিক পরিবার ও তরুণদের মধ্যে প্রথমে এর প্রচলন বাড়ে। বর্তমানে স্কুল, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সেক্টর ও পরিবার পর্যায়ে বাবাকে সম্মান জানিয়ে শুভেচ্ছা, অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশে বাবা দিবস সাধারণত উপহারকেন্দ্রিক উৎসবের চেয়ে পারিবারিক সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও সম্পর্কের প্রকাশ হিসেবে বেশি দেখা হয়। অনেক পরিবারে বাবার সঙ্গে সময় কাটানো, শুভেচ্ছা জানানো বা দোয়া করার মধ্য দিয়েই দিনটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতেও বাবার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে পরিবারব্যবস্থা এখনো পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন বাবা পরিবারের প্রধান অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের শিক্ষাদান, নৈতিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গ্রাম কিংবা শহর – সবখানেই বাবারা তাঁদের পরিবারের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী – যে পেশাতেই থাকুন না কেন, একজন বাবা তাঁর পরিবারের কল্যাণকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
আমার বাবা তুফান বিশ্বাস (১৯২৮ – ২০২১) -এর স্নেহময় স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি। গত ৩ জুন আমার প্রিয় বাবা তুফান বিশ্বাসের (৯৩) প্রয়াণের ৫ম বার্ষিকী ছিল। পাচঁটি বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, দয়া ও দিকনির্দেশনা আজও আমাদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। তিনি আমাদের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়েছেন এবং পরিবারের প্রতি যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন, তার জন্য আমরা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। তাঁর জীবন ছিল আমাদের জন্য এক আশীর্বাদ, তাঁর স্মৃতি এক অমূল্য সম্পদ। তিনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকবেন। এই বিশেষ দিনে আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁকে অনন্ত শান্তি দান করেন এবং তাঁর স্নেহময় আশ্রয়ে স্থান দেন। আমরা তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করি এবং তাঁর সঙ্গে কাটানো অগণিত স্মৃতিকে সযত্নে হৃদয়ে লালন করি।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব বাবা দিবস মানবসমাজে বাবাদের অসামান্য অবদানকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। একজন বাবা পরিবারের শক্তি, সাহস ও আশ্রয়ের প্রতীক। তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ এবং পরিশ্রমের কারণেই সন্তানের জীবন সুন্দর ও সফল হয়ে ওঠে। তাই ২১শে জুন ২০২৬ বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষ্যে আমরা সকল বাবাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আসুন, আমরা শুধু এই একটি দিন নয়, বছরের প্রতিটি দিন বাবাদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও যত্ন প্রদর্শন করি এবং তাঁদের অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দিই।
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com