• শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রংপুরের ৪ হত্যা: প্রীতিলতা রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোনকে ফোন করেছিলেন কেন? সুপরিচিত আর্টিস্ট আবুল কাশেম আর নেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ফের বন্যার আশঙ্কা : উদ্ধারকাজ স্থগিত রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কুড়িগ্রাম ইউনিটের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের জয় চাকরি যেমন একটি পেশা, খেলাধুলাও তেমনই একটি পেশা —দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী খাটুনির মজুরি’ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নেপালে আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি: বাংলাদেশের শোক, সহায়তার আশ্বাস ৫ কারণে পুরুষদের শুক্রাণু সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সারা বাংলাদেশে ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব শেখ হাসিনাসহ চার পলাতককে ফেরাতে কূটনৈতিক-আইনি প্রক্রিয়াধীন
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

রংপুরের ৪ হত্যা: প্রীতিলতা রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোনকে ফোন করেছিলেন কেন?

প্রধান প্রতিবেদক:
Update : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

Views: 1

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারকে হত্যার ঘটনার প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তাদের অনুসন্ধানে ঘটনার পর পুলিশি ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি সামনে এসেছে।-খবর সংবাদদাতা, রংপুর। 

ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাক্রম সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দেয়। সেই ব্যাখা ও ঘটনার প্রেক্ষাপটে আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করে।

প্রতিনিধি দল নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশ, থানা কর্তৃপক্ষ, মর্গ ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি বলে জানায় সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারকে হত্যার ঘটনায় আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়েছে।

স্বজনদের দেওয়া তথ্য

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী আসক প্রতিনিধিদের জানান, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় তার বোনের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তবে পরদিন তিনি দেখতে পান, রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে তার বোনের নম্বর থেকে তাকে একটি ফোন করা হয়েছিল। তিনি সেই ফোন ধরতে পারেননি।

পূজা চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার বোন সাধারণত এত রাতে তাকে ফোন করতেন না। ফলে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ওই ফোনকলটি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পুলিশের বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সময়ের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখলে।

পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভোরের দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে ফেললে তাদের সঙ্গে তার বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং এর পরই তাকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও একে একে হত্যা করা হয়।

সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে তার বোনের কাছে করা ফোনকলটি এই সময়রেখার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ওই কলটি কে করেছিলেন, কলটি কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, তখন মোবাইল ফোনটি কোন অবস্থানে ছিল এবং এর পর পরিবারের সদস্যদের ফোনগুলো কখন বন্ধ হয়—এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড, মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ওই ফোনকলের সময় ও পুলিশের বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সময়ের মধ্যে কোনো অসংগতি আছে কি না, তাও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এরপর ২২ আগস্ট শনিবার রাত ৮টার কিছু পরে পূজা চক্রবর্তী তার বোনের নম্বরে ফোন করে সেটি বন্ধ পান। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া না পেয়ে রাত সোয়া ৯টার দিকে তিনি স্বামীকে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান। বাড়িতে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় তারা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।

পূজা চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছিল ছাদে, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ দ্বিতীয় তলা থেকে ছাদে ওঠার সিঁড়িতে এবং আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ একটি কক্ষের এক কোণে। ঘরের আসবাব, জামাকাপড়, গয়নাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংস্থাটির প্রতিনিধিদের জানান, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নিহতদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গেলে গণপতি চক্রবর্তী তাদের বাধা দেন। পুলিশের দাবি, পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তারা একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় বলেও পুলিশ জানায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন, খাবার খান এবং পরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তদন্তের সূত্র ও আলামতের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করা হয় এবং পরে আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্বাধীন ও বস্তুগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা যদি সত্যিই ওই বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন, খাবার খেয়ে থাকেন বা গোসল করে থাকেন, তাহলে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।

এ ক্ষেত্রে ঘরের বিভিন্ন স্থান, বাথরুম, ব্যবহৃত পানির উৎস, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য জৈব ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে এসব পরীক্ষার ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তদন্তের অগ্রগতি ও ডিবির বক্তব্য

আসকের প্রতিনিধি দল রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে। তিনি বলেন, ঘটনার বিভিন্ন দিক ও আলামত যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাইরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের ব্যাখ্যায় বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সম্ভাব্য সিসিটিভি ক্যামেরায় উপস্থিতি ধরা পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

তবে বিদ্যুৎসংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কে বা কারা তা করেছিলেন এবং এর সঙ্গে সিসিটিভি বা হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয়ও বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযুক্তদের পরিবারের বক্তব্য

সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস তার ছেলের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্নের কথা আসক প্রতিনিধিদের জানান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশে নেওয়ার সময় তার ছেলের পোশাকসহ কিছু বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।

গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও তার ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানান এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন।

অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার আরেক তরুণ সীমান্ত চন্দ্র দাসের বাবা-মায়ের সঙ্গেও সংস্থাটির প্রতিনিধি দল কথা বলে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত ঘটনার রাতে বাড়িতে ছিলেন এবং সে রাতে সিদ্ধার্থ দাস কিছু সময়ের জন্য তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তবে তিনি সেখানে রাতযাপন করেননি বলে তারা জানান। এসব বক্তব্যও তদন্তের সময় অন্যান্য তথ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মর্গ ও ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য

সংস্থাটির প্রতিনিধি দল মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলে। যতন কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখেননি বলে জানান, তবে শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে তার মনে হয়েছে।

নিহত দুই নারীর শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত তার চোখে পড়েনি বলেও তিনি জানান। তবে এ বিষয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মর্গের কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার কোনো আলামত ছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই অধিকতর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর