• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হাতে ৫০ দিন, শেখ হাসিনা সত্যি ফিরছেন? তারপর কী হবে বাংলাদেশে? সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ৪ দিনের সরকারি সফরে রংপুর ও লালমনিরহাটে আসছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী খবর সংযোগ পত্রিকার পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেল ক্যান্সার আক্রান্ত নাছিমা সিএনজি চলাচলের অনুমতির দাবিতে চালকদের সড়ক অবরোধ চিলমারীতে “আইএফআইসি ব্যাংকের ৫০বছর” পূর্তি উদযাপিত এক দশক ধরে অধরা ব্রিজ, সীমাহীন দুর্ভোগে এলাকাবাসী কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দুর্গাপূজা ঘিরে প্রশাসনের কঠোর প্রস্তুতি, সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান ইউএনও’র উলিপুরে অম্বিকা চরণ রায় শিক্ষাবৃত্তি-২০২৬ প্রদান
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

উচ্চ আদালতে গতিহারা আলোচিত হত্যার বিচার !

প্রধান প্রতিবেদক:
আপডেট: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

Views: 4

 

ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা দেশের আপামর মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশের মানুষ। রাজপথে আন্দোলন হচ্ছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে এ হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ঠিক রামিসার মতো মাগুরার ছোট্ট শিশু আছিয়া, সিলেটের রাজন, খুলনার রাকিব ও ফেনীর নুসরাত হত্যার ঘটনাও দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি করেছিল। প্রতিটি হত্যার ঘটনার পর সারা দেশের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। দাবি ওঠে দ্রুত বিচারের। তখনকার সরকারও প্রতিটি মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার পদক্ষেপ নেয়। আলোচিত এসব হত্যার নৃশংস ঘটনার বিচারও দ্রুত শেষ হয়। তবে পরবর্তী সময় সর্বোচ্চ আদালতে এসে এসব হত্যার বিচার গতি হারায়। পড়ে দীর্ঘসূত্রতার মুখে। বছরের পর বছর পার হলেও উচ্চ আদালতে এসব চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না।-খবর তোলপাড়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধস্তন আদালতে খুলনার আলোচিত শিশু রাকিব হত্যার বিচার করা হয়েছিল মাত্র ১০ কার্যদিবসে। অনেক আইনজীবীর মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে দ্রুতগতির বিচার। আর আলোচিত শিশু রাজন হত্যার বিচার করা হয় মাত্র ১৭ কার্যদিবসে। আর মাত্র ১৩ কার্যদিবসে শেষ হয় মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার বিচার। নুসরাত হত্যার বিচারও দ্রুততম সময়ে মাত্র সাত মাসে শেষ করা হয়। কিন্তু এসব চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যার পর দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। মানুষের রাগ-ক্ষোভ কমেছে। সবার কাছেই মলিন হয়ে গেছে তাদের ওপর চালানো সেসব নৃশংসতার স্মৃতিও। বিচারও গতি হারিয়েছে। রাজন-রাকিব হত্যার বিচার ১০ বছর পরও চূড়ান্ত করা যায়নি। এর মধ্যে এই দুই শিশু হত্যার বিচার প্রায় ৯ বছর ধরে ঝুলে আছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। নুসরাত আর আছিয়ার বিচার এখনো হাইকোর্টের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি। নুসরাতের মামলা অধস্তন আদালতে সাত মাসে নিষ্পত্তি হলেও হাইকোর্টে ঝুলে আছে সাত বছর ধরে।

এ কারণেই সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিশু রামিসা হত্যার বিচারও হয়তো বিচারিক আদালতে দ্রুত শেষ হবে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কবে চূড়ান্ত হবে? কবে অপরাধীর সাজা কার্যকর হবে? বিচারিক আদালতের পর সর্বোচ্চ আদালতের গণ্ডি পেরোতে কতদিন লাগবে? মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর প্রতি নৃশংসতা ঠেকাতে হলে এসব হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে। অপরাধীদের সাজা দৃশ্যমান হতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রপক্ষকে স্পর্শকাতর এসব মামলার তদারকি করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের নৃশংসতা কমানো যাবে না।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর প্রধান নির্বাহী মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এলিনা খান কালবেলাকে বলেন, মাগুরার আছিয়া, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে অল্প কিছু দিনেই রায় হয়েছে, এটি ঠিক; কিন্তু এও সত্য যে, এ মামলাগুলো এখনো হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, স্পর্শকাতর মামলাগুলো কেন উচ্চ আদালতে পড়ে থাকবে? আসামিপক্ষ তো চাইবে বিচার যেন বিলম্ব হয়, তাতে তাদের জন্য ভালো। কিন্তু আমরা বিচারে আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা চাই না। নতুন করে আর কোনো রামিসার ঘটনা শুনতে চাই না।

এলিনা খান আরও বলেন, আমাদের প্রসিকিউশন আছে, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আছে। কিন্তু সেগুলো থেকে এ ধরনের কোনো তৎপরতা দেখি না যে, শিশু হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোয় কী করতে হবে। মামলাগুলো উচ্চ আদালতে গিয়ে আটকে যায়। সে ক্ষেত্রে অধস্তন আদালতে রায়ের পর আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি মনিটরিং সেল থাকতে পারে, যাতে মামলাগুলো তদারকি করা যায়। কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সমন্বয় করতে পারে। অ্যাডভোকেট এলিনা খান আরও বলেন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রামিসার বাবা বিচারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন ‘আমি বিচার চাই না’—তার এই ক্ষোভ যৌক্তিক। বাস্তবতা থেকেই তিনি মূলত বিচারের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি তো দেখছেন বিচারে কী হচ্ছে না হচ্ছে। এখন তার এই হতাশা ও ক্ষোভ প্রশমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

‘সিলেটের রাকিব ও খুলনার রাকিব হত্যার বিচার ঝুলছে আপিল বিভাগে’

চুরির অপবাদে ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন শেখপাড়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয় শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে (১৪)। সে ছিল সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামের সবজি বিক্রেতা। তার লাশ গুম করার সময় ধরা পড়ে একজন। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে। ফেসবুকে প্রচারের উদ্দেশ্যে সেই নির্মম নির্যাতনের ভিডিওচিত্রও ধারণ করে নির্যাতনকারীরা। পরে ভিডিও ফাঁস হলে দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। ঘটনার পরপরই পালিয়ে সৌদি আরব চলে যান মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম। ইন্টারপোলের (আন্তর্জাতিক পুলিশ) মাধ্যমে একই বছরের ১৫ অক্টোবর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

একই বছরের ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনার টুটপাড়ায় শরীফ মোটরস নামের গ্যারেজে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ায় ব্যবহৃত কমপ্রেশার মেশিনের নল রাকিবের মলদ্বারে দিয়ে শরীরে বাতাস ঢোকানো হয়। এতে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ওই রাতেই সে মারা যায়। অভিযোগ ওঠে, ওই গ্যারেজের কর্মী রাকিব বিভিন্ন সময় মারধরের শিকার হতো এবং ঠিকমতো মজুরি না পেয়ে অন্য একটি কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হন শরীফ। পরে সুযোগ পেয়ে রাকিবকে ধরে এনে সহযোগীকে নিয়ে ওই নির্যাতন চালান। এ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে শরীফ মোটরসের মালিক শরীফ, তার সহযোগী মিন্টু ছাড়াও শরীফের মা বিউটি বেগমকে জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাকিবের বাবা মো. নুরুল আলম এ তিনজনের বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।

এ দুটি ঘটনা তখন সারা দেশে আলোড়ন তোলে। দ্রুত বিচারের পদক্ষেপ নেয় তখনকার সরকার। একই বছরের ৯ নভেম্বর সিলেট ও খুলনার পৃথক আদালত এ দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণা করেন। সিলেটের রাজন হত্যা মামলার ১৩ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি কামরুল ইসলামসহ চারজনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। ফাঁসির সাজা পাওয়া অন্য তিন আসামি হলেন সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার পীরপুর গ্রামের বাসিন্দা, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের চৌকিদার সাদেক আহমদ ওরফে বড় ময়না (৩৫), শেখপাড়া গ্রামের তাজউদ্দিন আহমদ ওরফে বাদল (২৪) ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের জাকির হোসেন ওরফে পাবেল ওরফে রাজু মিয়া (২০)। জাকির হোসেন পলাতক রয়েছেন।

সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আকবর হোসেন মৃধা এ রায় দেন। এই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তি হলেন জালালাবাদ থানা এলাকার জাঙ্গাইল গ্রামের বাসিন্দা ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর আহমদ ওরফে নূর মিয়া (২০)। তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয় কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ওরফে আলী ও শামীম আহমদকে। শামীমও পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ আলী, আজমত উল্লাহ ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি করে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল রায় দেন। রায়ে সিলেটের অধস্তন আদালতের দেওয়া চার আসামির ফাঁসির আদেশই বহাল রাখা হয়। এ মামলায় অধস্তন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি নূর মিয়ার দণ্ড কমিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রধান আসামি কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহাম্মেদের সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। অন্য আসামি দুলাল আহাম্মেদ ও আয়াজ আলীর এক বছরের সাজাও বহাল রাখা হয়।

অন্যদিকে মোটর গ্যারেজের কর্মী রাকিব (১২) হত্যার ঘটনায় প্রধান দুই আসামি মো. শরীফ ও মিন্টু খানের ফাঁসির আদেশ দেয় খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালত। অন্য আসামি বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। ১০ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া শেষ করে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক দিলরুবা সুলতানা।

ওই রায়ে বলা হয়, আসামিরা অভিনব কৌশলে যে মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা নিষ্ঠুরতার চরমতম উদাহরণ বলে বিবেচিত। বাংলা ভাষায় নিষ্ঠুরতার যত সমার্থক শব্দ আছে, ‘তার সব এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। আসামিপক্ষের দাবি, ইয়ার্কি করতে গিয়ে কাজটি ঘটে গেছে। তাদের ইয়ার্কির বলি কখনোই একজন শিশু হতে পারে না। কথিত এ ধরনের ইয়ার্কি জঘন্য ও নিষ্ঠুরতম।’ এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি করে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শিশু রাকিব হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মামলার প্রধান আসামি মো. শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। রাজন-রাকিব হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করার পর মামলা দুটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর ৯ বছর পার হয়েছে। কিন্তু মামলা দুটি আপিল বিভাগে আজও চূড়ান্ত শুনানি হয়নি।

‘নুসরাত হত্যা মামলা সাত বছর ধরে ঝুলে আছে হাইকোর্টে’

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন লাগানো হয়। জানা যায়, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় সেদিন পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে নুসরাতকে হত্যাচেষ্টা করে তারেই সহপাঠীরা। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনা তখন দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় সরকার। একই বছর ২৪ অক্টোবর ফেনীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ বহুল আলোচিত এ মামলায় অভিযুক্ত ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। মামলার রায় ঘোষণার পর ৭ বছর পার হয়েছে। মামলাটি এখনো হাইকোর্টের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) ও আসামিদের আপিল এবং জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ শুনানি শুরু হওয়ার কিছুদিন পর বেঞ্চটি ভেঙে যায়। বেঞ্চ পুনর্গঠনের পর আর নতুন করে মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি। মামলাটি হাইকোর্টের গণ্ডি না পেরোনোয় তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চলছে অসন্তোষ। নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘নুসরাতের মৃত্যু এখন স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে আমাদের পরিবার। আমরা জানি, আর ফিরে আসবে না নুসরাত। রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছি।’

‘মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলা’

গত বছরের মার্চে রমজানের ছুটিতে মাগুরার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যায় আট বছরের শিশু আছিয়া। সেখানে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ মেয়েটিকে শুধু ধর্ষণই করেনি, হত্যারও চেষ্টা চালায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু হয় আট বছরের শিশুটির। এ ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের নামে মামলা করেন। পরে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ঘটনার পর ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে জনগণ। হিটু শেখের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারও তৎপর হয়ে ওঠে। বিচার হয় দ্রুতগতিতে। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে এ ঘটনার বিচার শেষ করা হয়। গত বছরের ১৭ মে সেই মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেয় মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান। একই সঙ্গে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় তাকে। রায়ে বাকি তিন আসামি খালাস পেয়েছেন। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) এবং সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)। এ রায়ের দুদিন পরই মামলাটি ডেথরেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। মাত্র দুই মাসের মাথায় বিচার শেষ হলেও হাইকোর্টে মামলাটি প্রায় এক বছর পড়ে আছে। এখনো এ মামলার পেপারবুকই প্রস্তুত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ জরুরি। শিশুদের প্রতি নৃশংসতা বন্ধ করতে হবে। এজন্য শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো স্পর্শকাতর অপরাধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তা হচ্ছে না। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করতে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে। আসামিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকলে সমাজে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায় এবং জনগণের মধ্যে বিচারহীনতার ধারণা তৈরি হয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজু বলেন, ‘দেশের আদালতগুলোতে মামলাজট অহসনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এটা চলতে থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, বিচারহীনতার কারণেই দেশে অপরাধ বাড়ছে। শিশু ধর্ষণের মতো আলোচিত মামলায় নিম্ন আদালতে রায় হলেও উচ্চ আদালতে এসে আটকে যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতি চাইলে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠন করে দিতে পারেন।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের একদল আইনজীবী শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো থেকে উদ্ভূত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করেছেন। আবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন সময়ে অধস্তন আদালতে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হলেও, হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামির ফাঁসি হলেও ডেথ রেফারেন্সে শুনানি কবে হবে অনিশ্চিত, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাসহ বহু মামলা এভাবে অপেক্ষমাণ অবস্থায় আছে সর্বশেষ মিরপুরে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসার বাবা বলেছেন, বিচার করতে পারবেন না। বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে আপনাদের ও আমাদের সবার এ দায় এড়ানোর উপায় নেই। সীমাবদ্ধতা আমরা বুঝি তবুও সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতেও শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আলাদা করে, মামলাগুলো (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল), বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। তবে এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর