• রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
প্রহ্লাদ জোশী ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী বঙ্গভবনে অফিস করবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, থাকবে স্পিকারের বাসভবনে অবশেষে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি: ভূমি মন্ত্রীর মাধ্যমে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে ২৫ কেজি নিমের বীজ দিলেন ‘তাল বেলাল’ বিজিবি’র অভিযানে প্রায় ৩২ লাখ টাকার চোরাই পণ্য উদ্ধার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করি চিলমারীতে স্ত্রীর অধিকারের দাবিতে অনশন ৫ আগস্ট খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালো বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি
স্বাগতম:
দৈনিক তোলপাড় পত্রিকায় প্রবেশ করায় আপনাকে স্বাগতম। গুরত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ওয়েবসাইটটির সাথেই থাকুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রচারের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিন +৮৮-০১৭১৯০২৬৭০০

কুড়িগ্রামকে সিম্বলিক জিওগ্রাফির কালিমা থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন

প্রধান প্রতিবেদক:
Update : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।

সিম্বলিক জিওগ্রাফি বা প্রতীকী ভূগোল হলো মানবীয় ও সাংস্কৃতিক ভূগোলের একটি বিশেষ ধারণা। এটি কেবল পাহাড়, নদী বা সীমানার মতো বাস্তব বস্তুগত উপাদান নিয়ে আলোচনা করে না; বরং কোনো নির্দিষ্ট স্থান, অঞ্চল বা ল্যান্ডস্কেপ মানুষের মননে, সংস্কৃতিতে বা রাজনীতিতে কী ধরনের অর্থ, প্রতীক এবং আদর্শ বহন করে, তা নিয়ে কাজ করে। সহজ কথায়, একটি ভৌগোলিক স্থান বস্তুগতভাবে যা—তার চেয়ে মানুষের কাছে মানসিকভাবে বা সামাজিকভাবে তার পরিচয় ও গুরুত্ব কী—সেটাই সিম্বলিক জিওগ্রাফি হিসেবে প্রকাশ পায়।
এডওয়ার্ড সাইদের বিখ্যাত ‘ওরিয়েন্টালিজম’ তত্ত্বে এই সিম্বলিক জিওগ্রাফির চমৎকার উদাহরণ মেলে। পশ্চিমা বিশ্ব ঐতিহাসিকভাবেই ভৌগোলিক মানচিত্রকে এমনভাবে প্রতীকায়িত করেছে যেখানে ‘পাশ্চাত্য’ মানেই সভ্য, আধুনিক ও প্রগতিশীল; আর ‘প্রাচ্য’ মানেই রহস্যময়, অনুন্নত বা সনাতন। এটি বাস্তব ভূগোলের চেয়েও বেশি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী বিভাজন।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব ও প্রতীকী ভূগোল:

সিম্বলিক জিওগ্রাফি বা ভৌগোলিক প্রতীকায়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর ও সংবেদনশীল। নেতিবাচক সিম্বলিক জিওগ্রাফি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বকে অবচেতনভাবেই আরও বেশি পিছিয়ে দেয়। যখন কোনো অঞ্চলের মানুষ অনবরত শুনতে থাকে যে তাদের এলাকাটি ‘অনগ্রসর’ বা ‘সুযোগ-সুবিধাহীন’, তখন তাদের অবচেতন মনে একটি হীনম্মন্যতা দানা বাঁধে। তারা ভাবতে শুরু করে যে তারা হয়তো মূলধারার চেয়ে কম যোগ্য।
মনোবিজ্ঞানে একটি কথা আছে— আপনি কাউকে বারবার যা বলবেন, সে নিজেকে অবচেতনভাবে তেমনই ভাবতে শুরু করবে। সিম্বলিক জিওগ্রাফির নেতিবাচক প্রভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের তরুণ সমাজ অনেক সময় বড় স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলে। তারা মনে করে, “যেহেতু আমি একটি প্রান্তিক অঞ্চলে বড় হয়েছি, তাই বড় কোনো অর্জন আমার জন্য নয়।” যখন কোনো অঞ্চলের পরিচয় কেবলই ‘সাহায্যপ্রার্থী’ বা ‘ত্রাণ-নির্ভর’ হিসেবে প্রতীকায়িত হয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে সেই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উদ্যোগী মনোভাব বা স্বাবলম্বী হওয়ার মানসিকতাকে মন্থর করে দেয়। সিম্বলিক জিওগ্রাফি যদি কেবলই বঞ্চনা ও করুণার আখ্যান তৈরি করে, তবে তা নিঃসন্দেহে মানুষের মনস্তত্ত্বকে পঙ্গু করে এবং তাদেরকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

সাহিত্য ও ইতিহাসে প্রতীকী ভূগোলের রূপান্তর:

সিম্বলিক জিওগ্রাফি কীভাবে একটি অঞ্চলের মানুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বন্দি করে ফেলে, আবার কীভাবে সেই প্রতীকী পরিচয়কে ভেঙে তারা ঘুরে দাঁড়ায়— এই বাস্তব সত্যটি বোঝার জন্য সাহিত্য এবং ইতিহাসের চেয়ে বড় কোনো আয়না হতে পারে না। বিশ্বসাহিত্য ও ইতিহাসে এমন কিছু অসামান্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভূগোল কেবল মাটির টুকরো নয়, বরং অবহেলা, স্টিরিওটাইপ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

১. আমেরিকার অ্যাপালাচিয়া পার্বত্য অঞ্চল: ভৌগোলিকভাবে এটি পাহাড়-বেষ্টিত এবং খনি-নির্ভর অঞ্চল। মার্কিন মূলধারা বা পপ-কালচারে দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে ‘হিলবিলি’ বা ‘রেডনেক’ হিসেবে প্রতীকায়িত করা হয়েছে— যার অর্থ হলো তারা অশিক্ষিত, গেঁয়ো, অলস এবং সহিংস। এই নেতিবাচক প্রতীকায়নের ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের তরুণদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছিল যে, তারা আধুনিক আমেরিকার অংশ নয়। মূলধারার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের এতটাই পিছিয়ে দিয়েছিল যে, তারা নিজেরাও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের সাহিত্যিক ও সমাজকর্মীরা এই নেতিবাচক প্রতীকায়নকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তাঁরা দেখাচ্ছেন যে, এই অঞ্চলের মানুষ অলস নয়, বরং তারা খনি ও প্রকৃতির সাথে লড়াই করা অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী ও খাঁটি সংস্কৃতির ধারক।

২. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’: রাঢ় অঞ্চলের কোপাই নদীর বাঁকে গড়ে ওঠা ‘কাহার’ সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি সিম্বলিক জিওগ্রাফির আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপন্যাসের ভূগোলটি হলো ‘হাঁসুলি বাঁক’—যা মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, বাঁশঝাড় আর নদীঘেরা এক আদিম ভূখণ্ড। এখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস ছিল, এই বাঁকের বাইরে যাওয়া মানেই অবধারিত ধ্বংস। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘করালী’ যখন এই ভৌগোলিক ও মানসিক সীমানা ভেঙে শহরের কারখানায় কাজে যেতে চায়, তখন সমাজের মাতব্বর ‘বনোয়ারী’ তাকে বাধা দেয়। বনোয়ারীর মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছিল সেই নেতিবাচক সিম্বলিক জিওগ্রাফি দ্বারা— যা শেখাত, “আমরা কাহার, আমাদের কাজ ছোটলোকগিরি করা, এর বাইরে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।” তারাশঙ্কর দেখিয়েছেন কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ভূগোলের প্রাচীন সংস্কার মানুষের মনকে আটকে রাখে, এবং কীভাবে নতুন প্রজন্ম (করালী) সেই প্রতীকী দেয়াল ভেঙে প্রগতির দিকে পা বাড়ায়।

৩. আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘The Old Man and the Sea’: এই উপন্যাসে উন্মুক্ত সমুদ্র এক বিশাল প্রতীকী ভূগোল। এখানে সমুদ্র কেবল একটি জলভাগ নয়; এটি নিয়তি, মহাবিশ্বের বিশালতা, একাকীত্ব এবং মানুষের জীবনের অন্তহীন সংগ্রামের প্রতীক। বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো টানা ৮৪ দিন কোনো মাছ না পেয়ে চরম ভাগ্যের পরিহাস ও অপমানের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। ৮৫ তম দিনে তিনি সমুদ্রের গভীরে গিয়ে এক বিশাল মার্লিন মাছ শিকার করেন। কিন্তু ফেরার পথে হাঙরের দল আক্রমণ করে মাছটির সব মাংস খেয়ে ফেলে। সান্তিয়াগো যখন তীরে ফেরেন, তখন মাছটির কেবল বিশাল কঙ্কালটুকু অবশিষ্ট ছিল। বাহ্যিকভাবে সান্তিয়াগো হয়তো সবকিছু হারিয়েছেন, কিন্তু মানসিকভাবে তিনি সমুদ্রের আদিম শক্তি আর নিজের দুর্ভাগ্যকে জয় করেছিলেন। তার সেই অমর উক্তি—”মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত হতে পারে না”—সমুদ্র নামক সেই বিশাল ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মিক বিজয়ের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

সিম্বলিক জিওগ্রাফি থেকে বের হয়ে আসার আরো কাহিনী:

রাজনীতি বা সাহিত্যে একসময় যে অঞ্চলগুলোকে অবহেলা ও কলঙ্কের বৃত্তে বন্দি করা হয়েছিল, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক উত্থান, সাহিত্যিক পুনর্জাগরণ বা মানুষের প্রতিরোধের মাধ্যমে সেই ভূগোলগুলোই আজ পরম সম্মান ও গৌরবের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ডাবলিন ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এক পরাধীন ও নোংরা শহর, যাকে সাহিত্যে অবহেলার প্রতীক হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু ১৯২২ সালে জেমস জয়েসের কালজয়ী উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ এই রূপ বদলে দেয়। তিনি ডাবলিনের সাধারণ জীবনকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়ে মহিমান্বিত করেন। প্রতি বছর ১৬ই জুন বিশ্বজুড়ে মানুষ সেখানে “ব্লুমসডে” উদযাপন করতে ছুটে আসে।সাহিত্যের এই ছোঁয়ায় সেই অবহেলিত শহরটি আজ ইউনেস্কোর “সিটি অফ লিটারেচার” হিসেবে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত। ডাবলিন প্রমাণ করে, সাহিত্য কীভাবে একটি অবহেলিত ভূগোলকে সর্বোচ্চ গৌরবের প্রতীকে রূপান্তর করতে পারে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মঙ্গোলিয়াকে আদিম ও বর্বরতার চারণভূমি হিসেবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হতো। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আধুনিক ইতিহাসবিদ জ্যাক ওয়েদারফোর্ড তাঁর ‘Genghis Khan and the Making of the Modern World’ গ্রন্থে মঙ্গোলীয়দের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পুনরুত্থানকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেন যা ইউরোপীয়দের ধারণাকে বদলে দেয়।একসময়ের ধ্বংসের কেন্দ্র ভাবা সেই স্তেপ অঞ্চল আজ ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য এলাকা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে “সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের ল্যান্ডমার্ক” হিসেবে সম্মানিত। এভাবেই মঙ্গোলিয়া অবহেলার বৃত্ত ভেঙে নিজের ঐতিহাসিক আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করেছে।

কুড়িগ্রামের উত্তরণ: বঞ্চনার প্রতীক থেকে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত:

দীর্ঘদিনের অবহেলা, নদীভাঙন, আর অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে মানচিত্রে কুড়িগ্রামের যে নেতিবাচক ও প্রান্তিক ‘সিম্বলিক জিওগ্রাফি’ বা মঙ্গা কবলিত মফিজ এলাকার প্রতীকী পরিচয় তৈরি হয়েছে, তা চিরস্থায়ী কোনো ভাগ্যলিপি নয়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলা বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এই নেতিবাচক পরিচয়কে অস্বীকার করে, মনের ভেতরের জড়তা ভেঙে আত্মআবিষ্কারের লড়াইয়ে নামার সময় এখনই। ভৌগোলিক বঞ্চনার এই করুণা-ভিত্তিক পরিচয়কে কুড়িগ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এক অনন্য শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের প্রয়োজন কুড়িগ্রামের মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে এক দূরদর্শী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ, সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে স্থানীয় মেধাবীদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি এবং বেসরকারি খাতের প্রসারে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

জীবনানন্দ দাশ যখন বাংলার রূপসী রূপের বর্ণনা দেন, বা জেমস জয়েস যখন ডাবলিনের রাস্তাকে মহাকাব্যিক মাত্রা দেন, তখন মানুষের “স্থান-চেতনা” জাগ্রত হয়। মানুষ তখন সেই জড় মাটিকে নিজের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে। দর্শনের ভাষায় একে বলে “উপলব্ধির রূপান্তর”। কুড়িগ্রামকে নিয়ে বঞ্চনার সিম্বলিক জিওগ্রাফির প্রতীকী পরিচয় বদলে উপলব্ধির রুপান্তরে সমষ্টিগত যাত্রা শুরু করার উপযুক্ত সময় হয়ে গেছে। প্রান্তিকতার আত্মোপলব্ধিই হোক আমাদের ঐক্যের শক্তি।

লেখক: অধ্যক্ষ (পি আর এল),কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com