২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতা, নিহত ৩৬, আহত?
২০২৬সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে সারা দেশে কমপক্ষে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৪০৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ (৭৮ শতাংশ) জন, জামায়াতের ৪ (১১ শতাংশ) জন ও আওয়ামী লীগের ১ জন এবং অন্যান্য ৩ জন।-খবর তোলপাড়।
শনিবার(১১এপ্রিল) প্রকাশিত সংস্থাটির “বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৬”শীর্ষক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত তিন মাসে কমপক্ষে ৬১০টি “রাজনৈতিক সহিংসতার”ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪০৭৮ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।’দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এ সকল হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত এবং বিএনপির ১২ জন, আওয়ামীলীগের ৪ জন, জামায়াতের ৩ জন ও অন্যান্য দলের ৩ জনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়াও সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনি সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক সাত শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ’
গত জানুয়ারি-মার্চ, এই তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। জানুয়ারি মাসে মোট ১৫১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৮ জন নিহত এবং ১২৩৩ জন আহত হন, যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সূচনা পর্যায় নির্দেশ করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সহিংসতা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়; এ মাসে ৩৪৬টি ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১৯৩৩ জন আহত হন। অন্যদিকে মার্চ মাসে সহিংসতার মোট সংখ্যা কমে ১১৩টিতে দাঁড়ালেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায় এবং আহত হন ৯১২ জন। এটি নির্দেশ করে যে সহিংসতার প্রকৃতি আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এ সময় নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।’
এইচআরএসএস বলছে, ‘এই সামগ্রিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ অন্তত ৩০টি জেলা ও উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা কোথাও কোথাও অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টা দখল, হামলা, ভাঙচুর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।’
সুপারিশ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণভোট আদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ, দুদক নিয়োগ অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ অম্তর্র্বতীকালীন সরকারের জারীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশসমূহ চলতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাতিল করা হয়েছে যা পাশ করা জরুরি ছিল।
এতে আরও বলা হয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ জরুরি। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, নির্বাচনি সহিংসতা, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সমস্যা সমাধান না হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।









Chief Editor-Dipali Rani Roy