Views: 0

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করছেন পোশাক শ্রমিকরা। গার্মেন্টস শিল্পের সাম্প্রতিক এই অস্থিরতা ও শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা, সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং তাদের সহযোগী সংগঠন (যেমন- ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ) এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির নেতাকর্মীরা শ্রমিক অসন্তোষকেে উস্কে দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। -খবর তোলপাড়।
সরকারের একাধিক মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, আসন্ন ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে নিরপরাধ শ্রমিকদের ব্যবহার করছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন নাকি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে কোন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য এই আন্দোলন। হঠাৎ শ্রমিকদের এই আন্দোলন ঘিরে তাই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে নেমে আন্দোলনকে আরো ত্বরানিত করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলের সুবিধাভোগী সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা এই অস্থিরতার পেছনে মূল ইন্ধনদাতা। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ এবং ছাত্রলীগ ছদ্মবেশে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনের ভেতর ঢুকে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর উসকে দিচ্ছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত ১২,৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি থেকে বাড়িয়ে তা ৩০,০০০ টাকা করার দাবিতে চলতি বছরের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ঢাকা, মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া এবং গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে প্রায় ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং ১০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। এসব শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের চাপে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মালিক, বিপর্যস্ত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা। শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও আন্দোলন থামছে না। বরং এক এলাকার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে অন্য এলাকায়।
এই আন্দোলনের নেপথ্যে আসলে কারা রয়েছ? শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন? আন্দোলনের মধ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ কতটা সত্য? সে বিষয়ে কি কোন প্রমাণ মিলেছে? বিভিন্ন এলাকার শ্রমিক, স্থানীয় সূত্র, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে আন্দোলনের পেছনে একাধিক পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গার্মেন্টস কর্মীর ছদ্মবেশে আন্দোলনে প্রবেশ করে সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে। তারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাধারণ শ্রমিকদের অন্তরালে থেকে এই নাশকতা পরিচালনা করছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদেরও ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন, আসন্ন ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারকে নীতিগত ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য শ্রমিকদের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১ ও ২ নভেম্বরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান যে, পোশাক খাতের এই অস্থিরতা মূলত ‘সীমান্তের ওপার’ থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে ধ্বংস করতে মুখোশধারী বহিরাগত বা থার্ড পার্টি নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ইতোমধ্যেই একটি ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড (মিনিমাম ওয়েজ বোর্ড) গঠন করা সত্ত্বেও আন্দোলন ও সহিংসতা থামছে না। এটি প্রমাণ করে যে এর পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী ‘তৃতীয় পক্ষের’ জোরালো ইন্ধন রয়েছে।
পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, বারবার আন্দোলনের কারণে কারখানা চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং অনেক মালিক ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ (নো ওয়ার্ক, নো পে) নীতি বা শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা বাস্তবায়নের কথা ভাবছেন। মালিকদের দাবি, যেসব কারখানা সাধারণ মজুরির চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়, সেগুলোতেও বহিরাগতরা এসে হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, সাধারণ শ্রমিক এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার্স ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের মতো শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এই আন্দোলনের মূল কারণ রাজনৈতিক নয়, বরং জীবনযাত্রার চরম ব্যয়বৃদ্ধি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ বাড়ি ভাড়া এবং চিকিৎসা খরচের কারণে বর্তমান মজুরি দিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুজ্জামান বাদশা ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে উত্তরায় কর্মসূচি ছিল না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরখানের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান নাবিলও বলেছেন, তাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না, যদিও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতার কথা তিনি শুনেছেন।
আন্দোলনের প্রথম দিকের বড় উত্তেজনা তৈরি হয় রাজধানীর উত্তরায়। ১৩ অক্টোবর থেকে আজমপুর, রাজলক্ষ্মী, উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সড়কে নামেন। ১৭ অক্টোবর শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, যানবাহন ভাঙচুর ও সাউন্ড গ্রেনেড-জলকামান ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে। এরপর প্রকাশ্য আন্দোলন থেমে গেলেও শ্রমিকদের মূল দাবিগুলোর সমাধান হয়নি। এ আন্দোলনের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উত্তরার পর গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও চন্দ্রা এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ তীব্র হয়। স্থানীয় সূত্র ও শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দুই সপ্তাহ ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ চলছিল। ৩১ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের সফিপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। পরে কোনাবাড়ীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ এবং চন্দ্রায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম ও পিকআপভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে যাওয়ার পথে শ্রমিকদের অবরোধের মুখে পড়েন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
শ্রমিক অসন্তোষ ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব শিল্পাঞ্চলের প্রায় ২১০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে গাজীপুরে ১৫০টি এবং সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৬০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে বন্ধ কারখানার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
শিল্প পুলিশ সূত্র দাবি করে, গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ইন্ধন রয়েছে। উত্তরায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা, গাজীপুরে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের দাবি এবং মিরপুরে আওয়ামী লীগের ১১ নেতাকর্মী আটকের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। মিরপুরে দুই দিনের বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এতে অজ্ঞাত তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের যাচাই-বাছাই চলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পুলিশ বাদী। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গার্মেন্টস শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হওয়ায় শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি আন্দোলনের নামে সহিংসতা বা নাশকতার অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।