সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকল্প আত্মসাৎ: ২ ভাই গিলে খেয়েছে ১৯ কোটি টাকা
শুধু ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের আড়ালে এক বছরে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে উপকারভোগীর তালিকায় নাম আছে, কিন্তু প্রশিক্ষণ পাননি, এমন ব্যক্তিদের আড়ালে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৮ লাখ টাকার বেশি।
কাগজে-কলমে তাঁরা গ্রাফিক্স ডিজাইন এন্ড মাল্টিমিডিয়া, সেলাই ও এমব্রডারি, এবং ব্লক বুটিক প্রশিক্ষণ, ফুড এন্ড বেভারেজ টেক্সটাইল প্রশিক্ষন প্রাপ্ত। এবং প্রশিক্ষক।-খবর তোলপাড়।
তবে বাস্তবে এসব পেশায় যুক্ত নন তাঁরা। মূলত দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পেশাজীবীদের জন্য বরাদ্দ থাকা উদ্যোক্তা মূলধন ও প্রশিক্ষণ ভাতা আত্মসাৎ করতে এমন ভুয়া পেশাজীবী বানানো হয়েছে তাঁদের।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রান্তিক পেশাজীবী জাতিগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার উৎকর্ষ এবং পেশার আধুনিকায়নের মাধ্যমে তাঁদের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিসহ সমাজের মূল শ্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণের নিমিত্ত জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পে হয়েছে এমন অনিয়ম।
প্রকল্পের আওতায় ক্ষেত্রবিশেষে কেউ কেউ ভুয়া নাম-ঠিকানার আড়ালে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে, ধনী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা এবং উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য নিজেদের প্রান্তিক পেশাজীবী হিসেবে দেখিয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল:
দেশব্যাপী প্রান্তিক পেশাজীবীগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ ও তাদের তথ্য সম্বলিত অনলাইন ডাটাবেজ;
-পেশার টেকসই উন্নয়নে সফটস্কিলস/উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ প্রদান।
-মাঠ পর্যায়ের এ পেশাজীবীদের উৎপাদিত পণ্যবাজারজাত করণের লক্ষ্যে ঢাকায় ১ টি বিপনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
-উপার্জন সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে ও দক্ষতা উন্নয়নের নিমিত্ত প্রশিক্ষণ প্রদান।
-হাতে কলমে এপ্রেন্টিসশীপ (শিক্ষানবিশি) প্রশিক্ষণ প্রদানেরমাধ্যমে পেশার মানোন্নয়ন।
-কাজের সুযোগ সৃষ্টি ও আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি।
-প্রশিক্ষনোত্তর পেশার টেকসই উন্নয়নে নগদ অর্থ সহায়তা।
-প্রান্তিক পেশাজীবীগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
-গুগল ম্যাপিং এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও অনুদান (নগদ সহায়তা) প্রাপ্তদের ব্যবসা প্রসারে সহায়তা এবং মনিটরিং এর মাধ্যমে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
-পেশাজীবীদের উৎপাদিত পণ্যের উৎকর্ষ সাধনে পরামর্শ/প্রশিক্ষণসহ তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বহূমুখী ব্যবহারে প্রচারণা।
– প্রশিক্ষনোত্তর সমাজসেবা অধিদপ্তর/বিএমইটি কর্তৃক কম্পিটেন্ট সনদ প্রদান।
প্রকল্প পরিচালক ও প্রত্যাশী সংস্থা কচুয়া ডালিমা এ্যাসোসিয়েশন: মুল হোতা দুই ভাই…..
প্রকল্প কোড নং ২২৪৩৪২৯০০। দুঃস্থ ও অসহায়দের প্রায় ১৯ কোটি টাকার পুরোটাই দূর্নীতি করে আত্মসাৎ করেছেন প্রকল্প পরিচালক ও প্রত্যাশী সংস্থা কচুয়া ডালিমা এ্যাসোসিয়েশন। যার নিবন্ধন নং : সসেঅদ – পটুয়া – ৬৫০/২০১৯। প্রকল্পটি জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা হওয়ার কথা থাকলেও তা পরবর্তিতে প্রস্তাবিত ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত ছিল।
পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলা, দুমকি উপজেলা, মির্জাগঞ্জ উপজেলা, দশমিনা উপজেলা, বাউফল উপজেলা, কলাপাড়া উপজেলা, গলাচিপা উপজেলা, রাঙ্গাবালী উপজেলা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। বস্তবে বাউফল উপজেলায় কালাইয়া ইউনিয়নে গ্রাফিক্স ডিজাইন এন্ড মাল্টিমিডিয়া, সেলাই ও এমব্রডারি, এবং ব্লক বুটিক প্রশিক্ষণ, ফুড এন্ড বেভারেজ টেক্সটাইল প্রশিক্ষনের নামে মানুষ জন জড়ো করে শুধু লিস্ট তৈরী করেছে। ১২০ জন স্বচ্ছল ফ্যামিলর মানুষকে ১৫০০০ করে টাকা দিয়েছে। যেখানে কোনো দুস্থ বা অসহায় কেউই ছিলনা।
তালিকায় ভুয়া নাম: ভুয়া প্রশিক্ষক
বাউফল উপজেলায় কালাইয়া ইউনিয়নে বাবুল মাস্টার বাড়িতে অফিস নিয়ে গ্রাফিক্স ডিজাইন এন্ড মাল্টিমিডিয়া, সেলাই ও এমব্রডারি, এবং ব্লক বুটিক প্রশিক্ষণ, ফুড এন্ড বেভারেজ টেক্সটাইল প্রশিক্ষনের নামে মানুষ জন জড়ো করে শুধু লিস্ট প্রস্তুত করেছে। ১২০ জন স্ব”ছল ফ্যামিলর মানুষকে ১৫০০০ করে টাকা দিয়েছে। যেখানে কোনো দুস্থ বা অসহায় কেউই ছিলনা।
বাবুল মাস্টারের বাড়িতে অফিস থাকাকালীন ট্রেনিং সেন্টারে মোট সরাঞ্জম ও আসবাবপত্র ১০টি কম্পিউটার, ১০টি পিসির জন্য বোর্ডের টেবিল, ১০টি প্লাস্টিকের টুল, ১টি ছোট বোর্ডের টেবিল, ১টি প্লাস্টিকের চেয়ার, ১টি সেলাই মেশিন, ১০টি কাঠের বেঞ্চ টুল, ১টি হোয়াইট বোর্ড। কর্যত প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যাচ তৈরী করে সময় পার করতেন। সেলাই ও কম্পিউটারে প্রশিক্ষণের জন্য যারা ভর্তি হতেন, তাদের আবার অন্য ট্রেডে ভর্তি দেখিয়ে লিস্ট ক্সতরী করা হতো।
উজ্জল নামের একজন প্রশিক্ষক ছিলেন যিনি স্থানীয় এক ফুয়েল বিক্রেতার দোকানে ফুয়েল বিক্রীর কাজ করতেন, পরবর্তিতে কচুয়া ডালিমাতে জয়েন করেন। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও হার্ডওয়ার সম্পর্কে তার কোনো ট্রেনিং নাই বা একাডেমিক কোন সার্টিফিকেট নাই এবং ১টি সেলাই মেশিন শো হিসেবে থাকতো। অভিজ্ঞ কোনো ট্রেইনার ছিলনা।
শাহিনা নামে একজন মহিলা যিনি আবার বাবুর্চি, ক্লিনার, মাঠ কর্মি ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করত। তারও কোনো ট্রেনিং বা একাডেমিক কোন সার্টিফিকেট নাই। ফুড এন্ড বেভারেজ এরও কোনো কার্যক্রম ছিলনা। কিন্তু শাহিনা নামের সেই মহিলা সময় পার করার জন্য কিছু ক্লাস নিতেন। যখনই সমাজসেবা থেকে পরিদর্শনে আসতো আশপাশের বাসা থেকে রান্নার কিছু সরঞ্জাম নিয়ে এসে সাজিয়ে রাখতো। মূলত তিনি ট্রেনিংয়ের নামে প্রশিক্ষণার্থীদের লিস্ট তরী করতেন। টেক্সটাইল কোনো ট্রেনিং বা কার্যক্রম কিছুই ছিলনা। পরবর্তিতে ফোরকান মেম্বারের বাড়িতে ট্রেনিং সেন্টার করে বিভিন্ন ট্রেডে টাকার বিনিময় ছাত্র ছাত্রী ভর্তি করে একজন প্রশিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন, যা প্রকল্প শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে। অথচ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল পটুয়াখালি জেলার সমস্ত উপজেলায়। ৩১-০১-২০০৬ তারিখ একনেক কর্তৃক অনুমোদিত সরকারী সংশোধিত নীতিমালার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের অধিন গৃহীত সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারী সহায়তা প্রয়োজন যা জিও-এজিও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হবে। অর্থ্যাৎ সরকারের মোট বরাদ্ধের ২০% প্রত্যাশী সংস্থা ব্যয় ভার বহন করার কথা। সেক্ষেত্রে সমাজসেবার অডিট রিপোর্টে দেখা যায় কচুয়া ডালিমা এসোসিয়েশনে ব্যাংক একাউন্টে মাত্র ১০০০ টাকা ডিপোজিট।
তাহলে প্রশ্ন জাগে সংস্থা ৪ কোট ৯৮ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা কোথায় পেলো। তাছাড়া সমাজসেবা বেসরকারী সংস্থা র আইন অনুযায়ী কমিটি ও সদস্য পদে কোনো আত্মীয়করণ করা যাবেনা। কিন্তু কচুয়া ডালিমা এসোসিয়েশন পুরোটাই আত্মীয় স্বজন দ্বারা গঠিত হয়েছে।
এ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. কামরুজ্জামান। তিনি দাবি করেন, উপজেলা কমিটি সুবিধাভোগীর তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করে। কোনো অনিয়মের ঘটনা তাঁর জানা নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের আড়ালে (অন্তত ১২০ জন) এক বছরে (২০২০-২১) আত্মসাৎ করা হয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি।
প্রকল্প পরিচালক ও প্রত্যাশী সংস্থা কচুয়া ডালিমা এ্যাসোসিয়েশন এর ব্যপারে দুদকের এক উপ-পরিচালকের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বা পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আইনানুনাগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি।









Chief Editor-Dipali Rani Roy