বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম
যুদ্ধে ভয়াবহ জ্বালানী সংকট : কুড়িগ্রামেই পরিবেশ বান্ধব জ্বালানীর অপার সম্ভাবনা! রাজারহাটে জুয়ার আসরে পুলিশী অভিযানে গ্রেফতার ৫, জুয়ার সরঞ্জামাদী উদ্ধার রাজারহাটে গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত জ্বালানি তেল শূন্য কুড়িগ্রাম: পাম্প রক্ষায় বাঁশের বেড়া, বন্ধ দুই ফিলিং স্টেশন, ভোগান্তিতে কৃষক ও চালক বিয়ের প্রলোভনে ডেকে নিয়ে তরুণীকে গণধর্ষণ, প্রেমিক গ্রেফতার বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে তেলের তীব্র সংকট, পাম্পে দীর্ঘ সারি কুমিল্লা থেকে কুড়িগ্রামে এসে বিয়ের দাবিতে সন্তানদের নিয়ে দুই স্ত্রীর বৈবাহিক স্বীকৃতি ও ভরণপোষণের দাবি কুড়িগ্রাম খোলাবাজারে অধিক মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি, পুলিশের অভিযান কাঁঠালবাড়ি-বাংটুরঘাটে তৃতীয় ধরলা সেতুর দাবিতে মানববন্ধন
সংসদ নির্বাচন:
https://www.banglaconverter.org/election

যুদ্ধে ভয়াবহ জ্বালানী সংকট : কুড়িগ্রামেই পরিবেশ বান্ধব জ্বালানীর অপার সম্ভাবনা!

প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

।। প্রফেসর মীর্জা মো:নাসির উদ্দিন।।

মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা এক অবিরত সার্থক অভিযান। সভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য চড়াই-উতরাই এসেছে, কিন্তু মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে মাথা নত করেছে সমস্ত বাধা। যখনই কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবিক বিপর্যয় গ্রাস করেছে সমাজকে, মানুষ তখনই সেই সঙ্কটের সমাধানসূত্র খুঁজে বের করেছে। এই পথ চলা কখনও থামেনি, কখনও থমকে যায়নি।
সাম্প্রতিক অতীতের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো করোনাভাইরাস মহামারী। আমরা দেখেছি, কীভাবে এক অদৃশ্য ভাইরাস বিশ্বের তামাম ব্যবস্থা উল্টেপাল্টে দিয়েছিল। কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, কত আপনজন যে হারিয়ে গেছে। এমনকি ভীতিগ্রস্থ সন্তানও করোনায় আক্রান্ত বাবাকে রাস্তার ধারে ফেলে পালিয়ে গেছে। এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিল বিশ্ব। কিন্তু মানুষ থেমে থাকেনি। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা অল্প সময়ের মধ্যেই করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে। এই টিকার হাত ধরেই পৃথিবী আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
সেই সঙ্গে ঘটে যায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন। সামাজিক দূরত্বের বাধ্যবাধকতায় মানুষ যখন পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল, তখনই অনলাইন যোগাযোগ ও ভার্চুয়াল সভা-সমিতির দিকে ঝোঁকে মানুষ। অফিস, আদালত, শিক্ষা-সবই চলে যায় অনলাইনের আওতায়। এই অনলাইন বিপ্লব মানুষকে আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, কোনো পরিস্থিতিই মানুষের আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।
ঠিক এভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইলের অন্যায় যুদ্ধের পর থেকে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানী তেলের সঙ্কট। এই সঙ্কটও মানুষের সামনে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে মানব সভ্যতা কোনোদিনও সঙ্কটের সামনে আত্মসমর্পণ করেনি। এই সমস্যার সমাধানের পথও মানুষই খুঁজে বের করবে। খনিজ জ্বালানীর বিকল্প হতে পারে উদ্ভিদজাত তেল। এই গবেষণা শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানির বিষয়ে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গবেষণা করছেন। আশা করা যায়, আগামী দিনে আমরা এই সঙ্কট থেকেও উত্তরণের পথ খুঁজে পাব।
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাট্রোফা (Jatropha curcas) বা ভেরেন্ডা উদ্ভিদ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে। জ্যাট্রোফা একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যা মূলত এর বীজ থেকে উৎপাদিত বায়ো-ডিজেল বা জৈব জ্বালানির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। জ্রাট্রোফা সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিটার লম্বা হয়। গাছটি অত্যন্ত শক্তপোক্ত এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। এ গাছের পাতাগুলো চওড়া এবং গাঢ় সবুজ। ফুলগুলো ছোট এবং হলুদ রঙের হয়ে থাকে।ফলগুলো অনেকটা গোল বা ডিম্বাকৃতি। ফলের ভেতরে সাধারণত তিনটি করে কালো বীজ থাকে। এই বীজে প্রায় ৩০-৪০% উচ্চমানের তেল থাকে। (Future prospects of biodiesel production from jatropha in India.)

জ্যাট্রোফা চাষ পদ্ধতি :

জ্যাট্রোফা মূলত অনুর্বর বা পতিত জমিতেও ভালো জন্মে, যা এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। উপযুক্ত মাটি ও জলবায়ু: এটি দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মে। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু (২০°C থেকে ২৮°C তাপমাত্রা) এর জন্য আদর্শ, তবে এটি খরাপ্রবণ অঞ্চলেও টিকে থাকতে পারে। বীজ, চারা বা কলমের (Cuttings) মাধ্যমে এর চাষ করা যায়। শাখা কলম পদ্ধতিতে গাছ দ্রুত বড় হয় এবং ফলন তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে সাধারণত ২.৫ মিটার দূরত্বে গর্ত করে চারা রোপণ করা হয়। চারা লাগানোর প্রথম কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত জল দিতে হয়। এরপর এটি বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভর করেই বেড়ে উঠতে পারে। তবে বেশি ফলনের জন্য মাঝে মাঝে জৈব সার ব্যবহার করা ভালো।গাছ লাগানোর ২-৩ বছরের মধ্যে ফলন শুরু হয় এবং একটি গাছ প্রায় ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে।

বায়ো-ডিজেল উৎপাদন:

জ্যাট্রোফা তেল বেশ ঘন থাকায় সরাসরি আধুনিক ইঞ্জিনে ব্যবহার করলে ইঞ্জিন জ্যাম হয়ে যেতে পারে। ট্রান্স-এস্টারিফিকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেলের ঘনত্ব কমিয়ে পাতলা এবং দাহ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়।জ্যাট্রোফা তেলের সাথে অ্যালকোহল ( মিথানল) এবং অনুঘটক হিসেবে কস্টিক সোডা বা সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড মেশানো হয়। এই মিশ্রণটিকে সাধারণত ৬০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে ১-২ ঘণ্টা নাড়াচাড়া (Agitation) করলে তেলের অণুগুলো ভেঙে যায়। বিক্রিয়া শেষে মিশ্রণটিকে স্থিরভাবে রেখে দিলে এটি দুটি স্তরে ভাগ হয়ে যায়। উপরের স্তরে বায়ো ডিজেল এবং নিচের স্তরে গ্লিসারিণ উপজাত হিসেবে জমা হয়।উপরের স্তরের বায়ো-ডিজেল সংগ্রহ করে হালকা গরম জল দিয়ে ধুয়ে নেওয়া হয় যাতে অবশিষ্ট অ্যালকোহল বা সাবান জাতীয় কণা দূর হয়। এরপর এটিকে সামান্য গরম করে জলীয় অংশ শুকিয়ে নিলেই এটি ইঞ্জিনে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে যায়। (A Comprehensive exploration of jatropha curcas biodiesel production as a viable alternative feedstock in the fuel industry – Performance evaluation and feasibility analysis-Research Gate.)
জাট্রোফা (Jatropha) থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল ও বায়ো-ডিজেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এশীয় দেশগুলো বর্তমানে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশ্বের মোট জাট্রোফা চাষের প্রায় ৮০ শতাংশই এই অঞ্চলে ঘটে। ভারত জাট্রোফা তেল উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ। সরকারিভাবে ‘ন্যাশনাল মিশন অন বায়োফুয়েলস’-এর মাধ্যমে দেশটিতে বিশাল এলাকায় জাট্রোফা চাষ করা হয়। ছত্রিশগড়, রাজস্থান এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে এটি ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়। ভারত খনিজ জ্বালানি ও ভেরেন্ডা বায়োডিজেল ২৫:৭৫ অনুপাতে মিক্সিং করে সফল পরীক্ষামূলক বিমান পরিচালনা করে ২০১৮ সালে।জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্যিকভাবে জাট্রোফা চাষ ও তেল উৎপাদন করে। চীন দেশটির ইউনান এবং গুইঝৌ প্রদেশের বিশাল এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে জাট্রোফা বাগান করা হয়েছে এবং সরকার এই তেল প্রক্রিয়াকরণে বিশেষ তহবিল প্রদান করে। চায়না ২০১১ সালে জাট্রোফা ভিত্তিক বায়োফুয়েল ব্যবহার করে প্রথম এক ঘন্টার ফ্লাইট পরিচালনা করে বেইজিং বিমান বন্দরে। এয়ার নিউজিল্যান্ড ২০১৩ সালে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ১০% জাট্রোফা থেকে উৎপাদিত বায়োডিজেল ব্যবহার করে। ব্রাজিল , ফিলিপাইন,মালয়েশিয়া এবং আফ্রিকা বতসোয়ানা সহ বেশ কয়েকটি দেশ জাট্রোফাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং এখানে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ ও রপ্তানি বাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে।(A review of the sustainability of Jatropha cultivation projects for biodiesel production in southern Africa: Implications for energy policy in Botswana. Science Direct)

লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ:
জাট্রফা চাষে এক একর জমি থেকে দীর্ঘমেয়াদী আয়ের চমৎকার সুযোগ রয়েছে, যেখানে রোপণের তিন বছর পর থেকে টানা প্রায় ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। এক একর জমিতে চাষাবাদ, রক্ষণাবেক্ষণ, বীজ সংগ্রহ, মাড়াই ও তেল নিষ্কাশন বাবদ মোট খরচ হতে পারে প্রায় ৪৪,০০০ টাকার মতো। বিপরীতে, প্রতি একর থেকে প্রাপ্ত ৮০০ লিটার তেল (৯০ টাকা লিটার দরে) থেকে ৭২,০০০ টাকা, ১৫০০ কেজি খৈল থেকে ১৫,০০০ টাকা এবং উপজাত গ্লিসারিন থেকে ৫,০০০ টাকা আয়সহ মোট সম্ভাব্য আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯২,০০০ টাকা। অর্থাৎ, যাবতীয় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি একর জমি থেকে বছরে প্রায় ৪৭,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত নীট মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।( Biodiesel Production from Jatropha: A Computational Approach by Means of Artificial Intelligence and Genetic Algorithm.)

সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা:

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে আবাদি জমিতে জাট্রফা চাষ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পতিত ও প্রতিকূল জমিতে এর অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১০.৬৫ লাখ একর অনাবাদি জমি এবং ২০-২৫ লাখ একর চর এলাকা রয়েছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মতো খরা ও লবণাক্তপ্রবণ উপকুলীয় অঞ্চলের বিশাল এলাকায়, যেখানে অন্য ফসল ফলে না, সেখানে জাট্রফা চাষ অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। রেল লাইনের দু’পাশে কিংবা অন্যান্য সড়কের পরিত্যক্ত জায়গায় জাট্রফা লাগানো যেতে পারে তাহলে একদিকে যেমন বায়োডিজেল পাওয়া যাবে অন্যদিকে সড়কের মাটি ক্ষয় রোধ হবে। জাট্রফার পাতা বিষাক্ত হওয়ায় গবাদি পশুর উপদ্রব নেই, ফলে বেড়া দেওয়ার বাড়তি খরচ ছাড়াই এটি চাষ সম্ভব। চরের ভূমিহীন কৃষকদের এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পতিত জমি ‘সবুজ জ্বালানি খনিতে’ রূপান্তরিত হবে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সরকারি প্রণোদনা, ‘বাই-ব্যাক পলিসি’ (সরকারিভাবে ক্রয় নিশ্চিতকরণ), স্থানীয় পর্যায়ে বায়ো-ডিজেল রিফাইনারি স্থাপন এবং উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ নিলে কুড়িগ্রামের মতো পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো বায়ো-ডিজেল উৎপাদনে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।

আমদানিকৃত পেট্রোলিয়ামের দাম যুদ্ধের কারণে লাগামহীন, সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে জাট্রফা বায়ো-ডিজেল উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী হতে পারে (যার উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি প্রায় ০.৬ ডলার বা ৭০-৮০ টাকার আশেপাশে রাখা সম্ভব।জাট্রফা প্রধানত ডিজেলের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, সরাসরি পেট্রোলের নয়। তবে পরিবহণ খাতে ডিজেলের ব্যবহার কমানো গেলে সামগ্রিক জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমবে।জাট্রফা তেল থেকে উৎপাদিত বায়ো-ডিজেল সরাসরি ডিজেল ইঞ্জিনে ব্যবহার করা যায় অথবা সাধারণ জ্বালানির সাথে ৪০% পর্যন্ত মিশ্রিত করে ব্যবহার করা সম্ভব।এটি প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কার্বন নিঃসরণ ৮০% পর্যন্ত কমিয়ে আনে।
বর্তমান যুদ্ধে তেলের সংকট আমাদের শিখিয়েছে যে, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরতা যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই সংকটে জাট্রফা প্রধানত ডিজেলের বিকল্প, পেট্রোলের নয়। জাট্রফার মতো দেশীয় বায়ো-ফুয়েল কেবল বিকল্প নয়, বরং আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ঢাল হতে পারে।বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে সাধারণ ডিজেলের সাথে ২০% পর্যন্ত জাট্রফা বায়ো-ডিজেল মিশিয়ে কোনো ইঞ্জিন পরিবর্তন ছাড়াই ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি খনিজ তেলের আমদানি নির্ভরতা ২০% কমিয়ে দেয়। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ১০০% মেটাতে বিশাল পরিমাণ চাষযোগ্য জমির প্রয়োজন, যা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটি একটি বড় অংশের ব্যাকআপ বা বিকল্প হিসেবে চমৎকার।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প হিসেবে জাট্রফা:

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত পেট্রোলিয়ামের আকাশচুম্বী দাম আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় প্রযুক্তিতে জাট্রফা বায়ো-ডিজেল উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান হতে পারে। যদিও জাট্রফা সরাসরি পেট্রোলের বিকল্প নয়, তবে এটি ডিজেলের বিকল্প হিসেবে চমৎকার কাজ করে। প্রচলিত ডিজেলের সাথে ২০% থেকে ৪০% পর্যন্ত জাট্রফা তেল মিশিয়ে কোনো ইঞ্জিন পরিবর্তন ছাড়াই ব্যবহার করা সম্ভব, যা খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে দেবে। এছাড়া, এটি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৮০% পর্যন্ত হ্রাস করে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।
পুরো জ্বালানি চাহিদা জাট্রফা দিয়ে মেটানো বাস্তবসম্মত না হলেও, দেশের বিশাল পতিত জমি ও চরাঞ্চলে এর চাষ একটি শক্তিশালী ‘ব্যাকআপ’ হতে পারে। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরতা কমাতে জাট্রফার মতো দেশীয় বায়ো-ফুয়েল আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ঢাল হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকটে আমাদের আর বিদেশের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। নিজের মাটির এই ‘সবুজ সোনা’ ব্যবহারের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব।

লেখক: অধ্যক্ষ (পি.আর.এল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর