ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তানসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভূরাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরের আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন। -খবর তোলপাড়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান সংকট ঘিরে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ যোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। সোমবার প্রকাশিত ওই পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে সমাধান প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা “অপরিহার্য” হওয়া উচিত।
ট্রাম্প জানান, গত শনিবার (২৩ মে) তিনি একাধিক দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেন। আলোচনায় ছিল ইরান ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর এবং জর্ডান-এর নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সংকট সমাধানে যে পরিমাণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর একযোগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
প্রসঙ্গত, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো, সুদান এবং কাজাখস্তান এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্প তার পোস্টে দাবি করেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উল্লেখযোগ্য সুফল পেয়েছে। তার মতে, চলমান যুদ্ধ, উত্তেজনা ও সংঘাত সত্ত্বেও এসব দেশ কখনো এই জোট থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা করেনি। বরং তারা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে চুক্তির সম্প্রসারণ দ্রুত শুরু হওয়া উচিত এবং এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার ধারণা, এই দুই দেশ যুক্ত হলে পরবর্তীতে অন্য রাষ্ট্রগুলোও এতে যোগ দিতে আগ্রহী হবে।
তবে এ বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যদি কোনো দেশ এই উদ্যোগে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখায়, তাহলে সেটিকে “খারাপ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত” হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এমন দেশগুলোর ইরান-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সমঝোতা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, কয়েকজন আরব নেতা তাকে জানিয়েছেন— যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানকেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হিসেবে দেখতে আগ্রহী তারা।
নিজের বক্তব্যে ট্রাম্প এই সম্ভাব্য চুক্তিকে “ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাগুলোর একটি” বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, অতীতে কিংবা ভবিষ্যতে এর চেয়ে বড় ধরনের কোনো চুক্তি নাও হতে পারে। তার মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল আরও ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
তবে ট্রাম্পের এই প্রস্তাব ও বক্তব্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ কী?
ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম— এই তিন ধর্মেরই আদি পুরুষ হিসেবে সম্মানিত ইব্রাহিম (আ.) এর নামে এই চুক্তির নামকরণ করা হয়। নামটির মাধ্যমে ধর্মীয় ঐক্য ও শান্তির প্রতীক তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সুসম্পর্ক স্থাপন করতে আব্রাহাম অ্যাকর্ড উত্থাপন করেন। মূলত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য এ চুক্তির মধ্যস্থতা করেছিলেন। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং বাহরাইন প্রথম এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মরক্কো এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সুদান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
আব্রাহাম চুক্তির মূল বিষয়
মূলত ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে আব্রাহাম চুক্তির মূল বিষয়গুলো গৃহীত হয়েছে।
১. ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ এবং এক দেশ অন্য দেশে দূতাবাস ও কনস্যুলেট খোলা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা।
২. ইসরায়েল ও স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং পর্যটন, কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা।
৩. পরিবহন ও ভ্রমণ সুবিধার জন্য দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা। নাগরিকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ এবং পর্যটন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া।
৪. মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে ইরান এবং উগ্রপন্থার প্রভাব কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
গত শতাব্দীতে চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনেক আরব দেশ ঘোষণা দিয়েছিল যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে তারা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না। কিন্তু আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সেই অবস্থান পরিবর্তিত হয়, যা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে।