হরমুজ প্রণালীর বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়
।।প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
হরমুজ প্রণালী (আরবি নাম: মাদিকে হুরমুজ) একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার পশ্চিমে পারস্য উপসাগর এবং পূর্বে ওমান উপসাগর ( আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত হয়েছে)। প্রাচীন ইরানের জরাথুস্ট্র ধর্মের সর্বোচ্চ দেবতা ‘Ahura Mazda’ থেকে বিবর্তিত হয়ে শব্দটি Hormizd, Ohrmazd এবং সর্বশেষ ‘হরমুজ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এর উত্তর উপকূলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ‘আব্বাস’ এবং দক্ষিণ উপকূলে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কেশম, হরমুজ ও লারাকের মতো বেশ কিছু দ্বীপ রয়েছে।
এই প্রণালীর দৈর্ঘ্য ১৬৭ কিলোমিটার এবং প্রস্থ সর্বনিম্ন ৩৩ কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ৯৭ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর গভীরতা ৬০ থেকে ১০০ মিটার, যা বিশাল আকৃতির সুপার ট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য যথেষ্ট। নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে জাহাজগুলো নির্দিষ্ট ‘লেন’ মেনে চলাচল করে। প্রতিটি লেনের প্রস্থ ৩ কিলোমিটার এবং মাঝখানে ৩ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি নিরপেক্ষ অঞ্চল (Buffer Zone) রয়েছে। ইউএনসিএলওএস (UNCLOS) নীতিমালা অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো তাদের উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২ কিমি) পর্যন্ত জলসীমা দাবি করতে পারে।
বৈশ্বিক গুরুত্ব ও অর্থনীতিতে প্রভাব:
পৃথিবীতে এমন কিছু ক্ষুদ্র স্থান রয়েছে যা সমগ্র বিশ্বের ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে—হরমুজ প্রণালী তার মধ্যে অন্যতম। একে বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রধান ‘লাইফলাইন’ বলা হয়, কারণ বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই পথের নিরাপত্তা অনস্বীকার্য। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও এলএনজি (LNG) পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২০%। ২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% এশিয়ায় পৌঁছায়। চীন (৩৭.৭%), ভারত (১৪.৭%), জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্মিলিতভাবে এই তেলের ৯০% গ্রহণ করে।কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা এলএনজির প্রায় ৮৩% থেকে ৯০% এশিয়ায় রপ্তানি করা হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও ইরান তাদের উৎপাদিত তেলের সিংহভাগই এই পথ দিয়ে এশিয়ায় পাঠায়। সাধারণত প্রতি মাসে প্রায় ৩,০০০ জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২১টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, যা বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালীর প্রভাব:
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) প্রতি বছর যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার সিংহভাগই আসে সৌদি আরব (Aramco) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ADNOC) থেকে। যেহেতু এই দুটি দেশের তেল রপ্তানি বন্দরগুলো পারস্য উপসাগরের অভ্যন্তরে অবস্থিত, তাই বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ সরাসরি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি-র (LNG) ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট এলএনজি চাহিদার প্রায় ৬৬% কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহ করা হয়। এই গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকেও বাধ্যতামূলকভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হয়। এছাড়া রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি-র (LPG) চাহিদার প্রায় ১০০% মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানির মাধ্যমে, যা পুরোপুরি এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ প্রণালীতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র—সবই গভীর সংকটে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জ্বালানি তেলের মজুদ ও বর্তমান সক্ষমতা:
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি মূলত জ্বালানির ধরন এবং বর্তমান চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে বর্তমানে দেশে মোট তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা প্রায় ১৫.৭০ লাখ মেট্রিক টন। এই সক্ষমতা দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় ৪৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। দেশের ২৭টি ডিপোর মাধ্যমে সাধারণত ১৫-২০ দিনের জ্বালানি মজুদ রেখে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
বাস্তব চিত্র:
বড় গ্রাহকরা (যেমন: রেলওয়ে) তাদের নিজস্ব ডিপোতে মজুদ রাখলেও সামগ্রিক মজুদ সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় থাকে না। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন জ্বালানির মজুদ পরিস্থিতি নিম্নরূপ: ডিজেল:১০-১৪ দিন, অকটেন ও পেট্রোল: ১৫-৩০ দিন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েল: ২৬-২৮ দিন। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুদ থাকে, তা দিয়ে আরও প্রায় ২০-২২ দিন উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব।
সরকারি উদ্যোগ:
আগে সরকার সাধারণত ১৫ দিনের কৌশলগত মজুদ নিশ্চিত করার চেষ্টা করত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এই মজুদ সক্ষমতাকে ১ মাস বা ৩০ দিনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আমদানির জাহাজগুলো নিয়মিত বন্দরে ভিড়তে থাকে বলে সাধারণত মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নতুন সরবরাহ যুক্ত হয় যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে যা বর্তমানে বিঘ্নিত হচ্ছে। জাপান ২০০ – ২৪০ দিন , চীন ১১০ – ১৩০ দিন ,যুক্তরাষ্ট্র ৮০ – ৯০ দিন, দক্ষিণ কোরিয়া ৯০ – ১১০ দিন, জার্মানি ও ফ্রান্স ৯০ দিন এবং ভারত ৫০ – ৬৫ দিন কৌশলগত জ্বালানী মজুদ রাখে। তবে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানী মজুদ রাখলে তার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশকে অবশ্যই জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে আমদানিতে বহুমুখীকরণ নীতি অবলম্বন করতে হবে। এই লক্ষে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন একটি মাইলফলক, যার মাধ্যমে নুমালিগড় থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩১ কিমি সংযোগ ব্যবহার করে ২০২৬ সালে ১.৮০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলেই এই পাইপলাইনে কয়েক হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে এসেছে।
পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও জ্বালানি সহযোগিতা উত্তরোত্তর বাড়ছে। গত অর্থবছরে চীন থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত তেল আমদানির পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতায় এই নির্ভরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়ার তেলের ক্ষেত্রে কারিগরি ও বাণিজ্যিক কিছু সীমাবদ্ধতা এখনও বিদ্যমান। ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান কাঠামো রাশিয়ার ‘ইউরাল ক্রুড’ শোধনের উপযোগী নয় এবং ডলার সংকটে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনও বেশ জটিল। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে রুশ তেল সংগ্রহের পথ খোলা রাখছে। একইসঙ্গে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো থেকেও তেল আমদানির কৌশলগত পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NEA) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটি জ্বালানি খাতে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে; অর্থাৎ তাদের মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। চীন তাদের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি কয়লা অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন করছে। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশটি এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে—যেখানে তাদের সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সম্মিলিত সক্ষমতা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেশী ভারত যেখানে ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করে উৎস বহুমুখীকরণ (Diversification) নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ মাত্র ১২-১৫টি দেশের ওপর নির্ভরশীল, যার সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। এই একক নির্ভরতা কমাতে আঞ্চলিক শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ‘জ্বালানি কূটনীতি’ ও ‘জ্বালানি করিডোর’ সম্প্রসারণ অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির মতো আরও সাশ্রয়ী ও বিকল্প মাধ্যম অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে রাশিয়া বা অন্যান্য দেশ থেকে সরাসরি অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।
জ্বালানি খরচ সাশ্রয়ের অন্যতম শর্ত হলো পরিশোধিত তেলের বদলে অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) আমদানি করা। ভারতের আমদানিকৃত জ্বালানির প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই অপরিশোধিত তেল। বিপরীতে, বাংলাদেশের আমদানিকৃত তেলের ৭৫-৮০ শতাংশই আসে পরিশোধিত আকারে (ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ইত্যাদি)। বাংলাদেশের একমাত্র শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’র বার্ষিক সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন, অথচ দেশের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টনের কাছাকাছি। এই সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণেই বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চড়া মূল্যে পরিশোধিত তেল কিনতে হচ্ছে।
অপরিশোধিত বনাম পরিশোধিত তেল: কোনটি অধিক লাভজনক?
দেশের অর্থনীতির টেকসই বিকাশের জন্য পরিশোধিত তেলের চেয়ে অপরিশোধিত তেল আমদানি অনেক বেশি মঙ্গলজনক। অপরিশোধিত তেল শোধন প্রক্রিয়ায় কেবল জ্বালানি তেলই নয়, বরং এলপিজি, বিটুমিন (রাস্তা তৈরির কাঁচামাল), ন্যাপথা এবং লুব্রিকেন্টের মতো মূল্যবান উপজাত উৎপাদিত হয়। এগুলো আলাদাভাবে আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়, যা অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে সাশ্রয় করা সম্ভব। এছাড়া, দেশে বড় শোধনাগার থাকলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। নিজস্ব শোধন সক্ষমতা থাকলে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময়েও বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রিফাইনিং সক্ষমতা অর্জন করে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কিনে তা শোধন করে এবং উদ্বৃত্ত অংশ রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আশার কথা হলো, ২০২৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির হার এবং শোধন সক্ষমতা উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিকল্প উৎসের সন্ধান ও কৌশলগত কূটনীতি:
জ্বালানি আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করেছে। কয়লা ও এলএনজি (LNG) আমদানির জন্য ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া দীর্ঘমেয়াদী ও নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি সংগ্রহ করছে। ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল (ইথানল ও বায়োফুয়েল) এবং ভেনিজুয়েলা (অপরিশোধিত তেল) বিকল্প উৎস হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পরিবহন খরচ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এবং আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে জ্বালানি আমদানির কৌশলগত পথগুলোও আমাদের সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা উচিত।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ:
২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২,০০০ মেগাওয়াট অতিক্রম করলেও প্রাথমিক জ্বালানির অভাবে অনেক সময় পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হয় না। এই সংকট উত্তরণে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
হাইড্রোজেন ফুয়েল ও ব্লু ইকোনমি: ভবিষ্যতের জ্বালানি হিসেবে ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা (Blue Economy) ব্যবহার করে সমুদ্রের পানি থেকে হাইড্রোজেন ফুয়েল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্মার্ট গ্রিড’ ও এনার্জি স্টোরেজ (BESS):
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক, কিন্তু তা ধরে রাখার মতো বড় কোনো ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) নেই। ফলে রাতে যখন চাহিদা কম থাকে, তখন অনেক বিদ্যুৎ অপচয় হয়। আধুনিক স্মার্ট গ্রিড এবং স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করলে জ্বালানি সাশ্রয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ওয়েস্ট-টু-এনার্জি (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ):
বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ জৈব বর্জ্য উৎপাদিত হয়, তা থেকে বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এলপিজি ও কয়লার ওপর চাপ কমানো সম্ভব। এটি পরিবেশ রক্ষা এবং জ্বালানি সাশ্রয়—উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি:
কৃষি জমির ক্ষতি না করে শিল্প কারখানার ছাদে এবং চরাঞ্চলে বড় আকারের সোলার পার্ক স্থাপন করা।
আঞ্চলিক সহযোগিতা:
নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সঞ্চালন লাইন দ্রুত সম্পন্ন করা।
বিকল্প জ্বালানি:
জাত্রফা জাতীয় উদ্ভিদ থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদন করে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি: স্পট মার্কেট (Spot Market) নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের সাথে ১০-১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিশ্চিত করা।
নিজস্ব সম্পদ অনুসন্ধান:
সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
কূটনৈতিক ভারসাম্য:
রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জ্বালানি সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় দেশ সংকটে না পড়ে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন:
একটি ‘জাতীয় জ্বালানি মাস্টার প্ল্যান’ কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং সিস্টেম লস কমাতে আধুনিক ‘স্মার্ট গ্রিড’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
পরিশেষে, জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের দ্রুত প্রসার এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণই হতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। লেখক: সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।









Chief Editor-Dipali Rani Roy