কুড়িগ্রামের শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে, হারাচ্ছে শৈশব
লাবনী ইয়াসমিন:
কুড়িগ্রামের রাজারহাট, রৌমারী ও উলিপুর চরাঞ্চলের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পাড়ের বিস্তীর্ণ চরগুলোতে শিশুদের শৈশব যেন নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে । এখানে জন্ম নেওয়া শিশুদের অধিকাংশই শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ে নামতে বাধ্য হয়েছেন জীবনের কঠিন লড়াইয়ে। প্রাকৃতিক দূর্যোগে, দারিদ্র্যতার দুষ্টচক্রে, অপুষ্টিতে বন্দী এখানকার শিশুদের জীবন।
বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বাবা-মা কিংবা পরিবারের সাথে বাদাম ছাড়াচ্ছে সদ্য তুলে নিয়ে আসা বাদাম গাছ থেকে। অপরিস্কার, গায়ে ধুলি মেখে দু’হাতে ছিড়ছে বাদাম। প্রচন্ড গরমে গা দিয়ে ঝড়ছে ঘাম। নিঃশ্বাসের সাথে যাচ্ছে ধুলি। আবার কোন উঠানে মায়ের ভাতের হাড়িতে চুলোতে খড়ি ঠেলছে ১০ বছরের শিশু। কেউবা চরে বাবাকে কৃষিকাজে করছে সহায়তা করছে। আবার অনেকেই সদ্য নির্মাণ করা বাড়ির কাজে বাবা মাকে সাহায্য করছে।
কুড়িগ্রাম রাজারহাটরে ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বগুড়াপাড়ায় প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়, ১০ বছরের কিশোরী ময়নার সাথে। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর স্কুলে যাননা ময়না। চুলোর জ্বাল ঠেলতে ঠেলতে ময়না বলেন, আমার একটা ছোট ভাই হয়েছে। মা জমিতে কাজ করতে যায়। তাই ওকে দেখতে হয়। এজন্য আর স্কুলে যাইনা। এখন তাড়াতাড়ি রান্না করে আব্বা-মার খাবার নিয়ে যাইতে হবে। পড়াশোনা করলে তো বাড়ির কাজ করতে পারবো না। আব্বা-মা কাজ করতে না পারলে আমরা খাবো কি, সংসার চলবে কেমন করে?’
বিদ্যালয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, অনেক শিশু স্কুলের গন্ডিতেও পা রাখতে চায়না। আবার চরের শিশুরা সকাল বেলা স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে রওনা হতে চাইলে নদীপথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অভিভাবকেরাও ভয়ে থাকে নদী পার করতে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পুরো চর পানির নিচে চলে যায়। সেসময় স্কুল বন্ধ থাকে। আবার চর থেকে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। যা অনেক সময় পাওয়া যায় না বা শিশুদের একা যাওয়াও নিরাপদ নয়।
উলিপুরের বজরা ইউনিয়নের ফকিরের চরের বাসিন্দা মমেনা বেগম বলেন, “আমার মেয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। স্কুল নদীর ওপারে। একদিন ঝড়ের সময় নৌকা উল্টে যায়। তারপর থেকে ওকে আর স্কুলে যেতে দেইনি,”
রৌমারীর জিঞ্জিরাম নদীর তীরবর্তী দাতভাঙ্গা ইউনিয়নের ধর্মপুর চরে আগের স্কুল ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় গত বছর। এরপর থেকে এই এলাকার শিশুদের স্কুলে যাওয়া একরকম অসাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতু, মানিক, ছবি, বকুল নামের এই এলাকার শিশুরা এখন স্কুল ছেড়ে দিয়েছে।
চরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র হওয়ায় খালি পেটেই স্কুলে যায়। ফলে পড়াশোনায় মন বসাতে সমস্যা হয় বলে জানান শিক্ষকরা। ঘড়িয়ালডাঙ্গা খিতাবখাঁ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ডালিম হোসেন বলেন, ‘ বাচ্চারা ভালভাবে বই-খাতা ধরে রাখদে পারেনা। কেননা শিশুরা পর্যাপ্ত খাবার পায় না। অনেক শিশু শুধু চাল-ভাত খেয়েই দিন কাটায়, ফলে পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ক্লাসে মন বসে না, শরীরে শক্তি নেই, রোগ-ব্যাধিতে জর্জরিত।’
আবার অনেক অভিভাবক এখনও শিক্ষার গুরুত্বই বুঝতে পারছেন না। রাজারহাট উপজেলার ফুলবাড়ী চরের বাসিন্দা নুরু মিয়া বলেন “আমার ছেলে ক্লাস ফোরে পড়তো, কিন্তু গত দুই বছর ধরে সে স্কুল যায় না। সকালে মাঠে কাজ করে, রাতে আসি ঘুমায়। এত পড়াশোনা করে কি করবে। ক্ষেতের কাজ ক্ষেতে শেখা লাগে স্কুলে না।”
এছাড়া শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও পাচার – এক অদৃশ্য চক্র শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ার পর শিশুদের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে ভয়াবহ। মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসে অল্প বয়সেই। ছেলেরা হাটে-বাজারে কাজ করে, কেউ নদীতে নৌকা চালায় বা ক্ষেতে খামাড়ে কাজ করে সংসার চালায়। এর ফলে শিশুদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নজরদারির অভাবের কারণে অনেক সময় শিশুরা পাচারের শিকারও হয়- বিশেষ করে বর্ষাকালে, যখন পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান বলে: কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে ঝরে পড়া শিশুর হার-৪০–৫০% (বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী) টিকা না পাওয়া শিশুর হার ৩০–৪০% শিশুশ্রমে জড়িত ১০–১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা হাজারের বেশি।
শিশু অধিকার কর্মী আতিকুর রহমান বলেন , “চরাঞ্চলের শিশুরা কেবল শিক্ষা নয়, শৈশবই হারাচ্ছে। সরকার ও এনজিওদের উচিত চরে বিশেষ শিক্ষা প্রকল্প চালু করা এবং বর্ষায় বিদ্যালয় চলমান রাখতে নৌ-স্কুল ও ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক ব্যবস্থা চালু করা।
লাইট হাউজ সংস্থার উলিপুর কো অর্ডিনেটর রোকেয়া খাতুন বলেন ‘চরভিত্তিক ‘কমিউনিটি স্কুল’ ও নৌ-শিক্ষা চালু পুষ্টি কার্যক্রম (স্কুল মিল), বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শিশুশ্রম বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, চরাঞ্চলে শিশু বান্ধব আশ্রয় ও সুরক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করলে শিশুদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া অনেকটা হ্রাস পাবে। আমরা অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য সবসময় কাজ করে যাচ্ছি।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা বলেন, ‘ আমাদের শিক্ষা অফিসার চরাঞ্চলের স্কুলগুলো পরিদর্শন করছে। অনেক জায়গায় মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর সেসব স্কুলে এখনও হয়নি সেগুলোতে খুব শীঘ্রই চালু করা হবে। এছাড়াও বাচ্চাদের উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এখন অভিভাবকদের সচতনতা বাড়াতে হবে। সেখানে শিক্ষকরা চেষ্টা কর যাচ্ছে।’









Chief Editor-Dipali Rani Roy