যুক্তরাষ্ট্র ফেরত ৩১ বাংলাদেশির মুখে ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসা ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম) তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “এখনও আমার হাতে দাগ, কোমরে দাগ, পুরো শরীরে শিকলের দাগ স্পট হয়ে আছে। বাংলাদেশে বিমানবন্দরে নামার আগে আমাকে ৭৫ ঘণ্টা ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল। এমনকি বাথরুমেও যেতে দেয়নি।”
ফয়সাল জানান, পাঁচ বছর আগে তিনি ভিজিট ভিসায় বলিভিয়ায় গিয়ে দেশে ফেরেননি। পরে দালালের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাসের প্রচেষ্টায় পেরু, ইকুয়েডর ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি পরিচিতদের বাসায় আশ্রয় নিয়ে বৈধ কাগজপত্রের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।-খবর তোলপাড়।
ফয়সাল বলেন, “ওই সময় পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল, থেকে যাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ ছিল। বাইডেনের সময় অনেকেই এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন।” তবে পাঁচ বছর ধরে রাজনৈতিক আশ্রয় বা ওয়ার্ক পারমিটের তিনবার আবেদন করেও তিনি বৈধতা পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে অ্যাটর্নি পরিচয় দিয়ে আইনি সহায়তার নামে বাঙালিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া চক্রও আছে।
অবৈধ কাগজপত্র থাকার কারণে ফয়সাল ছয় মাস আগে নিউইয়র্ক থেকে গ্রেপ্তার হন। প্রথমে তাকে বাফেলোর ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়। পরে তিনিসহ কয়েকজনকে হাতে-পায়ে শেকল পরিয়ে লুইসিয়ানার আরেকটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ফয়সাল বলেন, “ভাই, আর কারো যেন এভাবে কারাগারে থাকা লাগে। ছয় মাস ছিলাম, যে খাবার খেতে দিত, মানুষ পশুপাখিকেও এখন খাবার খাওয়ায় না।”
এরপর শুরু হয় দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া। সোমবার সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফয়সালসহ ৩১ জন। বিমানে থাকা আরেকজন জানান, “সকাল ৮টায় বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য তুলছে। কিন্তু হাতে, গলায় ও কোমরে শেকল পরানো ছিল রাত ১২টা থেকেই। এরপর প্রায় ২৭-২৮ ঘণ্টা ফ্লাইটে ছিলাম। বাথরুমেও যেতে দেওয়া হয়নি।”
ফেরত আসা ৩১ জনের মধ্যে অধিকাংশ নোয়াখালীর বাসিন্দা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাদেরই একজন এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘হাতে বেড়ি, পায়ে বেড়ি, কোমরে বেড়ি, আমেরিকা থেকে বিমানে তুলছে। ৪০ ঘণ্টা পর গার্বেজের মতো ছুড়ে ফেলে গেছে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে।’
ফেয়ার্টোলের ভাই বলেন, দুই বছর আগে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিল গিয়েছিলেন তার ভাই। নয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। “ভাইয়ের জন্য জমি বিক্রি করে ৩৫ লাখ টাকা খরচ করেছি। এখন আমাদের কী হবে?”—কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তিনি।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছে ২৫০ এর বেশি বাংলাদেশিকে। যারা নানাভাবে দেশটিতে ঢুকে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করছিলেন। ফেরত আসা কর্মীদের মধ্যে নোয়াখালীর সংখ্যা বেশি। এছাড়া সিলেট, ফেনী, শরিয়তপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ রয়েছে। আরও অনেকে কারাগারে রয়েছেন, যাদেরকে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয় আবেদন ব্যর্থ হলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রশাসন অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও বিতাড়নের কার্যক্রম জোরদার করেছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “নথিপত্রহীন কাউকে ফেরত পাঠানো স্বাভাবিক। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতকড়া ও পায়ে শেকল পরানো অমানবিক। ৫০-৬০ ঘণ্টা ফ্লাইটে শেকল পরানো অবস্থায় থাকা একজনের মধ্যে আতঙ্ক ও ট্রমা সৃষ্টি করে।”
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ নভেম্বর ৩৯ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৮ জুন ৪২ জন, মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশির সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধ কাজের অনুমতি নিয়ে এক দেশে গিয়ে পরবর্তীতে অন্য দেশে অবৈধভাবে যাওয়ার প্রবণতা দেশের শ্রমবাজারের জন্য ভালো সংকেত নয়। বিশেষ করে ব্রাজিল থেকে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করা কর্মীদের খরচ ৩০-৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে, কিন্তু তারা ফিরেছেন শূন্য হাতে।
শরিফুল হাসান বলেন, “যে এজেন্সি ও যারা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন তাদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিৎ। ভবিষ্যতে আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলিতে শ্রমিক পাঠানোর আগে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।”
সূত্র: বিবিসি









Chief Editor-Dipali Rani Roy