রাজনীতির মাঠে প্রতিশ্রুতির বাণিজ্য : জনগণের সাবধান থাকার এখনই সময়
।। শিশির আসাদ।।
নির্বাচন সামনে এলেই আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ যেন হঠাৎ বদলে যায়। সারা বছর যাদের দেখা মেলে না, যারা সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না, তারা যেন আচমকাই মানুষের খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা মঠ সব জায়গাতেই তখন তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কেউ দোয়া নেয়, কেউ প্রণাম করে, কেউ অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয়, আবার কেউ ভবিষ্যতের বিশাল উন্নয়নকল্প তুলে ধরে। এমন একটি ব্যস্ততা তৈরি হয় যেন দেশের প্রতিটি উন্নয়ন, প্রতিটি কল্যাণ, প্রতিটি পরিকল্পনাই তাদের একার হাতে সম্ভব।
প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাজনীতির অংশ এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যখন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়, যখন তা পরিকল্পনার বদলে প্রলোভনে পরিণত হয়, তখনই রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজে একটি অদ্ভুত নিয়ম যেন প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। নির্বাচন এলেই মানুষকে কিছু বলা লাগবে, মানুষকে কিছু দেখাতে হবে। সারা বছরের অনুপস্থিতি ঢেকে দিতে কিছুদিনের উপস্থিতিকে জোরালো করে দেখাতে হবে। এবং মানুষকে বোঝাতে হবে “দেখুন, আমরা আছি, সব ঠিক করে দেব।”
রাজনীতির এই মৌসুমি উচ্ছ্বাস আসলে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক খেলা। মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, নেতা তার জন্য ভাবেন, তার পাশেই আছেন। যদিও বাস্তবে হয়তো গত কয়েক বছর কোনো খোঁজই নেওয়া হয়নি। কারণ নেতৃত্বের বড় অংশ এখনও বিশ্বাস করে, মানুষের অনুভূতিকে দ্রুত ছুঁয়ে দিলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তারা সেই অনুভূতির প্রতিদান দিতে বাধ্য হয়। অনেক ভোটার এখনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক; তারা খোঁজেন নেতা দরজায় এসেছে কিনা, উৎসবে শুভেচ্ছা জানিয়েছে কিনা, কিংবা বাজারে দেখে সালাম দিয়েছে কিনা। নেতারা এই মনস্তত্ত্ব জানেন, তাই নির্বাচনের আগে আচমকা মানুষের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
কিন্তু ঘনিষ্ঠতা আর দায়িত্ব এক জিনিস নয়। মানুষের সাথে কয়েকদিনের ঘোরাঘুরি দীর্ঘমেয়াদি জনসেবার বিকল্প হতে পারে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া, মানুষের সামনে হাত তুলে দোয়া চাওয়া, কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে বড় বড় উন্নয়নের কথা বলা।এসবই তখনই মূল্যবান, যখন এর ধারাবাহিকতা থাকে সারা বছর। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এসবের পরিমাণ বেড়ে গেলে মানুষের মনে সন্দেহ জাগে। এসব কি সত্যিই জনসেবার উদ্দেশ্যে, নাকি ভোটের আগে আবেগ তৈরি করার কৌশল?
সবচেয়ে দুঃখজনক দৃশ্য দেখা যায় যখন জনসভায় ভিড় দেখানোর জন্য “ব্যবস্থা” নেওয়া হয়। কোনো কোনো এলাকায় মানুষ জড়ো করার জন্য পরিবহনসহ খরচ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। দেখানো সমাবেশের সংখ্যাই যেন জনপ্রিয়তার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই সমর্থন স্বতঃস্ফূর্ত নয়; এটি কেনা। যে সমর্থন কেনা,তা কখনোই টেকসই হয় না। যে হাততালির শব্দ লেনদেনের ভিত্তিতে ওঠে, নির্বাচন শেষ হলেই সেই শব্দ মিলিয়ে যায়।
আমরা এমন এক যুগে আছি যেখানে ভোটারদের স্মৃতি আর ছোট নয়। আগে মানুষ অনেক কথা ভুলে যেত, ভুলে যেত নেতাদের ব্যর্থতা, অবহেলা, বা অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। এখন আর তা হয় না। মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সংরক্ষণ করে রাখে নেতা কী বলেছিলেন, কখন বলেছিলেন, এবং পরে কী করেছেন। প্রতিশ্রুতিগুলো এখন ভিডিও, পোস্ট, ক্লিপ হিসেবে মানুষের ফোনে জমে থাকে। ফলে আজকের নেতা মিথ্যা বললে, অতিরঞ্জন করলে বা মানুষের সামনে অবাস্তব স্বপ্ন দেখালে, তা সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে যায়। প্রতারিত হলে একবার মানুষ হয়তো ক্ষমা করে, কিন্তু দ্বিতীয়বার আর নয়।
রাজনীতিতে কখনোই ভণ্ডামি দিয়ে দীর্ঘসময় টিকে থাকা যায় না। যেসব নেতা ফাঁপা প্রতিশ্রুতি দেন, বারবার কথা বদলান, ক্ষমতার কাছে গিয়ে মানুষের কথা ভুলে যান। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। জনসভায় হাততালিতে তারা মুহূর্তের জনপ্রিয়তা পেতে পারেন; কিন্তু জনগণের হৃদয়ে জায়গা তৈরি হয় অন্যভাবে। সততা, ধারাবাহিকতা, এবং কাজের মাধ্যমে।
এই কারণেই প্রতিশ্রুতিতে শালীনতা থাকা উচিত। বাস্তবের চেয়ে বেশি বলা, অসম্ভবকে সম্ভব দেখানো, অতি-আত্মবিশ্বাসী ভাষায় বক্তব্য দেওয়া।এসবই শুধু মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে। একজন নেতা যদি জনগণের পাশে সত্যিই থাকতে চান, তবে তাকে বলতেই হবে এমন কথা যা তিনি করতে পারবেন। কারণ জনগণ এখন কিছু শুনতে চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় দেখতে। বলার পর কতটুকু বাস্তবায়ন করা হলো।
ভোটারদেরও একটি বিরাট দায়িত্ব আছে। একটি দেশের রাজনীতি যেমন নেতাদের দ্বারা গঠিত হয়, ঠিক তেমনি ভোটারদের বিবেচনা, বিচক্ষণতা ও দায়িত্ববোধও সেই রাজনীতির মান নির্ধারণ করে। যদি ভোটাররা তাদের স্বল্পমেয়াদি লাভ, ক্ষুদ্র সম্পর্ক, বা আবেগকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি বানান, তাহলে রাজনীতির মানও সেই অনুযায়ী নেমে যাবে। কিন্তু যদি তারা যুক্তি, বাস্তবতা, এবং নীতিগত প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন। তাহলে অচিরেই ভালো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
গণতন্ত্রের আসল শক্তি নেতা নয়, জনগণ। নেতা নির্বাচিত হন, দায়িত্ব পান, সম্মান পান। সবটাই মানুষের ভোটের মাধ্যমে। তাই জনগণ যদি নিজের শক্তি চিনতে পারে, তবে নেতারা কখনোই অতিরঞ্জন বা প্রতারণার মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারবেন না। তখন তারা বাধ্য হবেন দায়িত্বশীল হতে, সত্য কথা বলতে, এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে। যেদিন জনগণ বুঝবে “নেতা আমার কর্মচারী, আমি তার মালিক” সেদিনই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যাবে।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রযুক্তি সবখানেই অগ্রগতির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও পুরনো কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। নির্বাচনের আগে হঠাৎ সক্রিয় হওয়া, প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া, মানুষকে দেখানোচালের রাজনীতি। এসব বদলাতে হলে নেতা ও ভোটার উভয়কেই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে।
যে দিন জনগণ সচেতন হবে, যে দিন ভোটের মূল্য বুঝবে, যে দিন প্রতিশ্রুতির সামনে প্রশ্ন রাখবে সেদিন আর কেউ ফাঁকা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। রাজনীতি তখন সততার ওপর দাঁড়াবে, দায়িত্ববোধে পরিচালিত হবে, মানুষের কল্যাণ হবে কেন্দ্রে। আর যারা কেবল মৌসুমি রাজনীতি করে, যারা শুধু নির্বাচনের কয়েক মাস আগে মানুষের পাশের মানুষ হয়ে ওঠে তাদের জায়গা সংকুচিত হতে বাধ্য।
অবশেষে বলা যায়, রাজনীতির এই পরিবর্তন সম্ভব একটাই উপায়ে “জনগণ যদি সতর্ক থাকে”। নেতারা যতই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ান, জনগণ যদি তা বিচার করতে শেখে, তবে ভণ্ডামির রাজনীতি টিকবে না। প্রতিশ্রুতি থাকবে, কিন্তু থাকবে সততা। বক্তব্য থাকবে, কিন্তু থাকবে দায়িত্ববোধ। রাজনীতি তখন আর ক্ষণস্থায়ী আবেগের খেলা হবে না, হবে মানুষের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনার স্থায়ী শক্তি।
লেখক: শিশির আসাদ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক









Chief Editor-Dipali Rani Roy