ভোটের মাঠ মাতিয়েও শেষ রক্ষা হলো না যাদের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে ভূমিধস জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। একই সঙ্গে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ আরও কয়েকটি দলও আসন পেয়েছে। তবে বিজয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আলোচিত ও প্রভাবশালী একাধিক প্রার্থীর পরাজয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।-খবর তোলপাড়।
পরাজিতদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, খুলনা নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী, এনসিপির সারজিস আলম, বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুম, জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আজাদ, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং সাবেক ফুটবলার আমিনুল হকের নামও রয়েছে এই তালিকায়।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার পরাজিত হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগারের কাছে। পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট, আর মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট। ব্যবধান ২ হাজার ৬০৮। পোস্টাল কেন্দ্রসহ এ আসনে মোট কেন্দ্র ছিল ১৫১টি।
উল্লেখ্য, পরওয়ার ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ছিলেন। খুলনা-৫ আসনে লক্ষাধিক হিন্দু ভোটার রয়েছে। নির্বাচনে তাদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। হিন্দু ভোট এবং আওয়ামী লীগের ভোটের স্থানান্তরই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি ছিল ঢাকা-৮। ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর সেখানে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বিএনপির মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পোস্টাল ভোটসহ তিনি পেয়েছেন ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট। মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট। ব্যবধান দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৩৯ ভোটে।
ঢাকা-১৬ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আব্দুল বাতেনের কাছে পরাজিত হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের সাবেক ফুটবলার আমিনুল হক। ১৩৭টি কেন্দ্রের ফল অনুযায়ী মো. আব্দুল বাতেন পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮২৩ ভোট, আর আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৪ হাজার ২০৭ ভোট।
ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে ২ হাজার ৩২০ ভোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মামুনুল হককে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। তিনি পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭ ভোট, মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৭ ভোট। এ আসনে অংশ নেওয়া অন্য সাত প্রার্থী সম্মিলিতভাবে পেয়েছেন ৩ হাজার ৮১৩ ভোট।
বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। বরিশাল-৫ আসনে তিনি বিএনপি প্রার্থী ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ারের কাছে ৩৭ হাজার ৯০৩ ভোটে পরাজিত হন। ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট, আর মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট। বরিশাল-৬ আসনে তিনি প্রত্যাশার তুলনায় কম ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। সেখানে তার প্রাপ্ত ভোট ২৮ হাজার ৮২৩।
পঞ্চগড়-১ (তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর ও অটোয়ারী) আসনে বিএনপি প্রার্থী নওশাদ জমিরের কাছে পরাজিত হয়েছেন ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সারজিস আলম। তিনি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক। বেসরকারি ফল অনুযায়ী নওশাদ জমির পেয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ ভোট এবং সারজিস আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ ভোট। ব্যবধান ৮ হাজার ৩০৪।
খুলনা-১ আসনে দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন কৃষ্ণ নন্দী। ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সাবেক সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে দলীয় প্রার্থী করায় জামায়াতে ইসলামী দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বিএনপি প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান। ওই আসনে বিএনপির আমির এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট, কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ব্যবধান ৫১ হাজার ৬।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আজাদ পরাজিত হয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের কাছে। ১২৪ কেন্দ্রের ফলাফলে আলমগীর পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট, আর হামিদুর রহমান আজাদ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট। ব্যবধান ৩৫ হাজার ৬২৮।
২০০৮ সালে খুলনার ছয় আসনের মধ্যে একমাত্র বিএনপি প্রার্থী হিসেবে খুলনা-২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এবার খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে তিনি ৫ হাজার ৫৯২ ভোটে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের কাছে। নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭ ভোট এবং শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭৮৯ ভোট।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে যুক্ত হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এভিডেন্স-বেইজড হেলথ কেয়ার বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ডা. তাসনিম জারা। শুরুতে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্বাচন করেন। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রশিদ এবং এনসিপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া।
বেসরকারি ফলাফলে ঢাকা-৯ আসনে বিজয়ী হয়েছেন হাবিবুর রশিদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে একদিকে যেমন বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত মিলেছে, অন্যদিকে বহু আলোচিত প্রার্থীর পরাজয় দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।









Chief Editor-Dipali Rani Roy