মন্ত্রী বনাম এমপি: উন্নয়ন অগ্রযাত্রার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন মূলত সুশাসন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই। তবে আধুনিক বিশ্বে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষই উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। উন্নয়নের এই দীর্ঘ তালিকায় ‘সুশাসন’কে সর্বদাই অগ্রগণ্য মনে করা হয়, যার সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দূরদর্শী ভূমিকার ওপর।
মূল আলোচনায় যাবার আগে প্রথমেই বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্রতম জেলা কোনটি তা নিয়ে একটু আলোক পাত করা প্রয়োজন।পরবর্তীতে মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাবে। বাংলাদেশের কোন জেলা সবচেয়ে বেশি দরিদ্র তা নিয়েও ভুল ধারণা রয়েছে। আলোচ্য বিষয়টি পরিস্কার ভাবে তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশের কোন জেলা সবচেয়ে বেশি দরিদ্র তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সর্বশেষ দারিদ্র্য মানচিত্র (জানুয়ারি ২০২৫) অনুযায়ী মাদারীপুর দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা। এ জেলার দারিদ্রের হার ৫৪.৪% । বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্রের হার ২২.৪% (২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী)। বিবিএসের তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ এবং অতি দরিদ্রের হার ৫৩.২ শতাংশ। বিভিন্ন পত্রিকা,পরিসংখ্যানবিদ, এনজিও এবং ক্ষেত্র বিশেষে সরকারিভাবেও বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্রতম জেলা হলো মাদারীপুর। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে দেখা যায় কুড়িগ্রাম জেলার দারিদ্রের হার ৭০.৮ শতাংশ যা মাদারীপুরের দারিদ্রের হারের চেয়েও অনেক বেশি। তাহলে মাদারীপুর কিভাবে দেশের দরিদ্রতম জেলা হলো ? এভাবে তথ্য পরিবেশন করা হলে প্রকৃত পরিসংখ্যান ও সঠিক তথ্য নিয়ে মানুষের মাঝে নানাবিধ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। যে জেলাটি একেবারেই সবদিক দিয়ে দরিদ্র তাকে নিয়ে ভাববার আর কোন অবকাশ কারও থাকবে না। এভাবেই দেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামের খরা,বন্যা ,নদীভাঙ্গন সহ সকল প্রকৃত সমস্যা থেকে যাবে অগোচরে , অবহেলায় আর অনাদরে।
মাদারীপুরকে দরিদ্রতম জেলা বলার পক্ষে একধরণের যুক্তিতে বলা হচ্ছে ২০১৬ সালের জরিপে মাদারীপুরের দারিদ্র্য হার ছিল মাত্র ৩.৩%। কিন্তু ২০২২ সালের জরিপে তা লাফিয়ে ৫৪.০৮% হয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক বছরে মাদারীপুরে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুরই সবচেয়ে বেশি দরিদ্রতম জেলা । কিন্তু প্রকৃত ঘটনা সেটি নয় । মাদারিপুরে খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষের হাতে জেলার বেশি সম্পদ রয়েছে অর্থাৎ সাধারণ মধ্যবিক্তরা আরো গরীব হয়েছে। বিষয়টি পরিস্কারভাবে তুলে ধরার জন্য ধনী দরিদ্রের বা আয় বৈষম্য নির্ধারণের সূত্র পালমা রেশিওর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে। চিলির অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল পালমার নামানুসারে এই সূচকের নামকরণ করা হয়েছে, যা ধনী ও দরিদ্রের আয়ের ব্যবধান স্পষ্ট করে। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০% মানুষের আয়ের অংশকে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০% মানুষের আয়ের অংশ দিয়ে ভাগ করে বের করা হয় । এই অনুপাত যত বেশি হবে, আয়ের বৈষম্য তত বেশি বলে ধরে নেওয়া হয়। মাদারীপুরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। বিষয়টি পরিস্কারভাবে বর্ণনার জন্য একটি উদাহরণ তলে ধরছি। ধরা যাক কোন জেলার ধনী ১০% লোকের আয় ৫০০ টাকা এবং দরিদ্র ৪০% লোকের আয় ৬০০ টাকা তাহলে পালমা রেশিও হবে ০.৮৩ । এক্ষেত্রে আয়বৈষম্য খুব একটিা বেশি নয় এবং এটি সন্তোষ জনক। আবার যদি এমন হয় জেলার ধনী ১০% লোকের আয় ৬০০০ টাকা এবং দরিদ্র ৪০% লোকের আয় মাত্র ১০০০ টাকা সেক্ষেত্রে পালমা রেশিও হবে ৬ যা তীব্র আয় বৈষম্য নির্দেশ করে। মাদারীপুর জেলার ক্ষেত্রে এরুপ হতে পারে। আমাদের জাতীয় পালমা রেশিও হলো ২.৫ এর কাছাকাছি। এক্ষেত্রে কুড়িগ্রামের মান ১.৪, গাইবান্ধা ১.৭, দিনাজপুর ১.২ এবং ঠাকুরগাঁও ১.১। উক্ত রেশিওই বলে দিচ্ছে যেহেতু কুড়িগ্রামের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি মানুষ দরিদ্র আর শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ কিছুটা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তাই এখানে ধনী দরিদ্রের আয় বৈষম্য খুব একটা বেশি নয়। (বিজনেস স্টান্ডার্ড )। বিশ্বের প্রায় সব প্রধান সূচক (যেমন: গিনি কো-অফিসিয়েন্ট এবং পালমা রেশিও) অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যমূলক দেশ। দেশটিতে মোট আয়ের প্রায় ৬৬% যায় শীর্ষ ১০% ধনীর পকেটে, যেখানে নিচের দিকের ৫০% মানুষ পায় মাত্র ৬%। এর মূল কারণ ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা বর্ণবৈষম্য এবং শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্যতা।
আমার আজকের আলোচনার মূল বিষয় হলো কুড়িগ্রাম জেলার স্থায়ী সমস্যা গুলো আলোকপাত করে দূর্বল দিকগুলো তুলে ধরা। জেলার স্থায়ী সমস্যা গুলোর মধ্যে একটি হলো তিনটি আন্তর্জাতিক নদী সহ মোট ১৬টি নদী এবং ৪২০ টিরও অধিক চর জেলার মানুষকে উন্নয়নে সর্বদা পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।কুড়িগ্রামে অসংখ্য নদী থাকায় এবং নদী কেন্দ্রীক চ্যালেজ্ঞগুলো (খরা,বন্যা ,নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি) মোকাবেলা করার সক্ষমতা না থাকায় বা সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ না নেওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি কুড়িগ্রাম জেলা তার কপালে অঙ্কিত দারিদ্রের তিলক দুর করতে পারে নি। নদী শাসনসহ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হলেও নদীগুলো হতো আশীর্বাদ ।
কোন দেশ বা অঞ্চলে যদি পাহাড়, পর্বত বা নদী থাকে তাহলে সেদেশের জন্য এগুলো একইসাথে আশীর্বাদ এবং প্রতিবন্ধকতা —উভয়ই হতে পারে। যেমন- সুইজারল্যান্ডে আল্পস পর্বতমালা থাকায় দেশটি ঐতিহাসিকভাবে সুরক্ষিত এবং অপরাজেয় থেকেছে। আফগানিস্তানে দূর্গম পাহাড়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীয় শাসন বজায় রাখা কঠিন, কিন্তু বিদেশি শক্তির জন্য দেশটি দখল করাও প্রায় অসম্ভব। আমেরিকার অবস্থাও তাই দুটি মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন থাকায় অদ্যাবধি তাকে কউ আক্রমণ করতে পারেনি।
বেলজিয়ামকে একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো যা ফ্রান্স এবং জার্মান সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী অবস্থানে ছিল। তবে বিংশ শতাব্দীর বড় দুটি বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি কর্তৃক ফ্রান্স আক্রমণের সময় বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হয় এবং দেশটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯১৪ সালের ৪ আগস্ট জার্মানি ফ্রান্সকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে (শ্লিফেন প্ল্যান অনুযায়ী) বেলজিয়ামের ভেতর দিয়ে কুচকাওয়াজ করার দাবি জানায়। বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় আলবার্ট এতে অস্বীকৃতি জানালে জার্মানি বেলজিয়াম আক্রমণ করে। জার্মান সেনাবাহিনী বেলজিয়ামের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালায়, যাতে ৯০০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় যা ইতিহাসে ‘রেপ অফ বেলজিয়াম’ নামে পরিচিত।
কুড়িগ্রাম জেলার সহজ সরল মানুষগুলোর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সাথে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মানুষের কিছুটা হলেও মিল আছে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ১৯৯২ সাল থেকে টানা ৩৪ বছর ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থীকে এবং টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ১৯৮০ সাল থেকে টানা ৪৬ বছর রিপাবলিকান প্রার্থীকে জনসাধারণ ভোট দিয়ে বিজয়ী করে আসছে। এদেরকে বলা হয় ফিক্সড ভোটার । নির্বাচন কালীন সময়ে এদেরকে নিয়ে প্রার্থীরা তেমন একটা চিন্তিত থাকেন না, তাদের পিছনে প্রার্থীরা সেভাবে জামাই আদরও করেন না। সেদেশের ভাষায় এ ধরণের ভোটারকে ধরা হয় ‘’ টেকেন ফর গ্রান্টেড’’ বা নিশ্চিত মনে করে অবহেলায় এড়িয়ে যাওয়া। অপর পক্ষে যারা কোন নির্দিষ্ট দলের বা অঞ্চলের কিংবা মতাদর্শের প্রতি অনুগত নন প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় বা নিজের মতামতের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন তাদেরকে বলা হয় সুইং ভোটার বা মুকুটহীন রাজা। সুইং ভোটারদের প্রতি প্রার্থীদের অধিক মনোযোগ থাকে এবং নির্বাচনী ব্যয়ের সিংহভাগই তাদের পিছনে ব্যয় করে।টিভি বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে জনসভা-সবকিছুই তাদের মন জয় করার জন্য করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার তৈরীর সময় সুইং ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দকে মাথায় রাখে।তারা অনেকটা ডিসাইডার বা সিদ্ধান্তকারী হিসেবে মর্যাদা পান।
কুড়িগ্রাম তথা এ অঞ্চলের মানুষ নির্বাচন এলে আঞ্চলিকতা বা সরল জাত প্রকৃতিগত স্বভাবের কারণে আমেরিকার ফিক্সড ভোটারদের মতো বনে যান। তাই নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটাররা সুয়িং ভোটাদের মতো খাতির বা যত্ন পান না। বিষয়টি পরিস্কার ভাবে বোঝার জন্য একটি বাস্তব ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরছি। বছর তিনেক আগে আমরা কলেজ থেকে তিন পার্বত্য জেলায় শিক্ষা সফরে গিয়ে ছিলাম । কিন্তু সাজেক পৌছার পর দেখা গেল আমাদের গ্রামীন সীম কাজ করছে না। কারণ পার্বত্য এলাকায় সে সময় শুধুমাত্র রবি সিমে যোগাযোগ করা যায়। ফলে পুরো টিমের তিন দিন মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। মোবাইলের সিম ও টাওয়ারে ভিন্নতা থাকলে যেমন নেটওয়ার্ক থাকে না অতীতের নির্বাচনগুলোতে আমাদের অবস্থাও তাই হয়েছে।
অতীতে জাতীয় প্রেক্ষাপটে যাঁরা নির্বাচিত হবার কথা তাঁদেরকে আমরা নির্বাচিত করতে পারি নি। এমনও জনপ্রতিনিধিকে আমরা প্রেরণ করেছি যাঁরা শুদ্ধবাংলায়ও কথা বলতে পারতেন না। পরিস্থিতি আর সুযোগ তাদের ভাগ্যকে প্রসন্ন করে বঞ্চিত করেছে এখানকার সাধারণ মানুষকে। অতীতে যদিও দু’একজন মন্ত্রী ছিলেন তাদের জনবিচ্ছিন্নতা এবং ব্যক্তিগত দোষ ত্রুটি ও দূরদৃষ্টির অভাবে জেলার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখেন নি। নির্বাচিত জন প্রতিনিধি শুধুমাত্র তাদের পক্ষীয় ভোটারদেরকে কাছে টেনেছেন। আবার অনেকেই জন প্রতিনিধিকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করে এড়িয়ে চলেছেন ফলে সম্পর্কহীনতাই উন্নয়নের বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যগণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন, বিরোধী দল বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে সেই ধারা বজায় রাখা প্রায়শই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ অঞ্চল থেকে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত। কাজেই আশা করা যায় জেলার উন্নয়নে তাঁরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখবে। জন প্রতিনিধির কর্তব্য হলো মানুষের সেবা করা, তাদের রাজনৈতিক পছন্দের কারণে বৈষম্য করা নয়। প্রকৃত উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরে নয়, বরং মানুষের ঐক্য ও সঠিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে।
বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র ও বিরোধীদল রয়েছে যুক্তরাজ্যে কিন্তু তাঁদের সকল অর্জন একদিনে হয় নি। লেখার পরিধি বড় হচ্ছে তারপরও কিছু ঘটনা তুলে না ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ব্রিটিশ গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে শুধু সরকারের সমালোচক নয়, বরং “অপেক্ষাভিমুখী সরকার” হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাজ্যে বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে বিরোধী দল থেকে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ থাকেন। সরকারের একজন অর্থমন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলের একজন ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ থাকেন, যার কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টারি রাজনীতির একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর প্রথা হলো স্পিকারকে টেনে হেঁচড়ে চেয়ারে বসানো। এটি বর্তমানে যখনই হাউজ অফ কমন্সে নতুন কোনো স্পিকার নির্বাচিত হন, তখন তাঁকে দুজন সংসদ সদস্য মিলে জোর করে ধরে স্পিকারের চেয়ারে নিয়ে যান। স্পিকার তখন এমন ভান করেন যেন তিনি সেখানে যেতে একদমই অনিচ্ছুক! এর পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। রাজা কোন সিদ্ধান্ত দিলে পার্লামেন্ট সেটিকে পাস করলে কিংবা না করলে স্পিকারকে সেই সিদ্ধান্ত রাজাকে জানাতে হতো। কোন সময় রাজার সিদ্ধান্ত পাস না হলে সেই সময় অনেক রাজা মেজাজ হারিয়ে স্পিকারের মাথা কেটে ফেলতেন বা তাকে বন্দী করতেন। ১৩৯৪ থেকে ১৫৩৫ সালের মধ্যে অন্তত সাতজন স্পিকার এভাবে প্রাণ হারান। রাজা বা রানীর সাথে পার্লামেন্টের ঐতিহাসিকভাবে যে দ্বন্দ্ব ছিল, তার প্রতীক হিসেবে আজও একটি রীতি পালন করা হয়। যখন রাজা পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে আসেন তখন একজন সংসদ সদস্যকে রাজপ্রাসাদে ‘জিম্মি’ হিসেবে আটক রাখা হয়। রাজা বা রানীকে পার্লামেন্টে কেউ যদি কোন প্রকার ক্ষতি করেন বা আক্রমণ করেন তাহলে রাজপ্রাসাদে রাখা ওই সংসদ সদস্যকেও পাল্টা শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।অবশ্য বর্তমানে এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা এবং ওই সংসদ সদস্য সেখানে গিয়ে রাজকীয় চা-নাস্তা খেয়ে সময় কাটান!
মন্ত্রী বনাম এমপি: উন্নয়ন অগ্রযাত্রার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ শিরোনামে মূল বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। কোন এলকায় মন্ত্রী থাকলে যেভাবে উন্নয়ন হয় সাধারণ এমপি দিয়ে সেভাবে উন্নয়ন সম্ভব হয় না। একজন মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা এবং একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের (‘মন্ত্রী বিহীন এলাকা’ ) এলাকার মধ্যে উন্নয়নের পার্থক্য থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সকল এলাকার সমান উন্নয়ন হওয়ার কথা, বাস্তবে কিছু কাঠামোগত ও রাজনৈতিক কারণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একজন মন্ত্রী বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। কিন্ত এমপিরা সাধারণভাবে যা হয় তেমন বরাদ্দ পান।মন্ত্রীরা তাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রকল্পগুলো নিজস্ব এলাকায় বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, যোগাযোগ মন্ত্রী হলে তার এলাকায় বড় বড় ব্রিজ বা হাইওয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।সাধারণ বরাদ্দের বাইরেও অনেক সময় মন্ত্রীদের হাতে বিশেষ ‘থোক বরাদ্দ’ থাকে, যা তারা দ্রুত উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করতে পারেন।একজন মন্ত্রীর সরাসরি তদারকির কারণে তার এলাকার কোনো প্রকল্পের ফাইল সচিবালয়ে খুব একটা আটকে থাকে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মন্ত্রীদের এলাকার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হয়।: অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন কাজও (যেমন: বিদ্যুৎ, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য) একজন মন্ত্রী তার পদের প্রভাবে নিজের এলাকায় দ্রুত নিয়ে আসতে পারেন।নতুন সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EPZ) স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের এলাকা প্রায়ই অগ্রাধিকার পায়। মন্ত্রীর প্রভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও অনেক সময় সেই এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহিত হন, কারণ সেখানে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সুবিধা দ্রুত পাওয়া যায়।সাধারণ এমপিদের উন্নয়নের জন্য অনেকটা বাজেটের সাধারণ হিস্যার ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের অনেক সময় ফাইলের পেছনে দীর্ঘ সময় দৌড়ঝাঁপ করতে হয়।কোনো বড় প্রকল্প পেতে হলে তাদের মন্ত্রিপরিষদের বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা ও লবিং করতে হয়, যা সবসময় সফল হয় না।
মোঘল সম্রাট আকবরের সামনে আনার কলি যেমন সাহস করে বলেছিলেন পর্দা নেহি যব কোয়ি খুদাছে, বান্দা ছে পর্দা কারনা কিয়া অর্থাৎ সৃষ্টি কর্তা আর সৃষ্টির মাঝে কোন বাঁধা বা পর্দা নেই, তাহলে বাদশা আর জনগণের মাঝে এ ভয়ের বাঁধা বা দেয়াল থাকবে কেন? একই ভাবে কুড়িগ্রামের উন্নয়নে এ জেলার জনগণ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারের মাঝে প্রয়োজন নিবিড় সম্পর্ক ও বন্ধন। আমাদের সম্পর্ক আর উন্নয়নের মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা, অস্পষ্টতা বা কোন বিশেষ ট্যাগ তৈরী হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কুড়িগ্রামের নদী শাসন, অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা, সোনারহাট স্থল বন্দর দিয়ে ইমিগ্রেশন চালুর কাজ শীর্ঘ্রই শুরুর আশা কুড়িগ্রামবাসীর। একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এখানকার মানুষের প্রাণের দাবি।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বা দূরবর্তীতা এমনিতেই কোন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের আস্থায় দূর্বলতা সৃষ্টি করে। প্রান্তিক জেলার মানুষের জন্য প্রশাসনিক অনাদর উন্নয়নের পাইপ লাইনে ক্ষত তৈরী করে আর সেই ত্রুটি দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করা না হলে একটি জনগোষ্ঠী উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । একটি জনগোষ্ঠীর বা এলাকার উন্নয়নে কি প্রয়োজন তা হবে সেই এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ ও জনগণের বাস্তব চাহিদা ও প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে, উন্নয়ন হবে বটম আপ এপ্রোচ এর ভিত্তিতে। তবেই কুড়িগ্রামের মতো পিছিয়ে পড়া জেলার উন্নয়ন সম্ভব। জাতিসংঘের এসডিজি ঘোষিত মানবিক দর্শন হলো ’লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড ’ অর্থাৎ কাউকেই পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক বা সামাজিক যে কোনো অগ্রগতিতে যদি কোন অংশ পিছিয়ে থাকে তাহলে সেই অগ্রগতি টেকসই হয় না।
লেখক: সদ্য বিদায়ী অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।









Chief Editor-Dipali Rani Roy