রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
রাজারহাটে তরুণের অভিযান গ্রন্থাগারের উদ্যোগে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত উলিপুরে জাতীয় পার্টির ৫ নেতাকে অব‌্যাহ‌তি কুড়িগ্রাম জেলা জাকের পার্টির সাধারণ সম্পাদক হোসেন আলীর ইন্তেকাল ভারত সীমান্তের ৬২ কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে ফেনসিডিলের বিকল্প ৪ নেশার সিরাপ ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে কুড়িগ্রামে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকযোগে সংগীতানুষ্ঠান সীমান্তে গুলিবিদ্ধ শেষ অবধি শিশু আফনান মারা গেল প্রেমের সপ্তাহ শুরু, জেনে নেয়া যাক কোন দিন কী দিবস? জেলের ঘানি টানতে পারলো না ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক এমপি রমেশ চন্দ্র সেন হিন্দুদের নিরাপত্তা কোনো দল নয়, রাষ্ট্র দেবে: ড. আতিক মুজাহিদ সরকারের বিবৃতিতে যমুনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো গুলি ছোড়েনি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন:
[caption id="attachment_23460" align="alignnone" width="2560"] Print[/caption]

অর্থাভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে পারছে না কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের মেধাবী ছাত্র

প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৫

নাজমুল হোসেন, ক্রাইম রিপোর্টার:

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার খবর শুনে পরপারে চলে গেছে বাবা। এর পর অর্থাভাবে রোজা রেখে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পেয়েও আর্থিক সংকটের জন্য ভেস্তে যাওয়ার শংকা এক মেধাবী শিক্ষার্থীর।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন দেশের বৃহত্তম সাবেক ছিটমহলের শিক্ষার্থী ময়নুল হক। তবে তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক চরম আর্থিক সংকট।ছেলের ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় খুশির পরিবর্তে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে সদ্য স্বামী হারা গৃহিণী মায়া বেগম।

ময়নুল হকের বাড়ী কুড়িগ্রামের সীমান্ত ঘেঁষা ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিলুপ্ত হওয়া দেশের বৃহৎ ছিটমহলের দাসিয়ারছড়ার দোলাটারী গ্রামে। ময়নুল হক ২০২২ সালে গংগারহাট এমএএস উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ এবং ২০২৪ সালে ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়,মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নুল হকের বাড়ীতে গিয়ে দেখা গেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও সদ্য বাবাকে হারিয়ে ভর্তি ও পড়াশুনা কিভাবে চালিয়ে যাবে এই দুচিন্তায় দিন পার করছে মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নুল হক ও তার মা মায়া বেগম। মাত্র তিন শতক জমিতে জরাজীর্ণ টিনসেড ঘর। সেই ঘরে এক পাশে থাকেন মা মায়া বেগম ও ছোট বোন লুৎফা খাতুন এবং এক পাশে থাকে ময়নুল হক ও তার ছোট ভাই মেরাজ। ময়নুল হকের বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন ইটভাটার শ্রমিক। ইটভাটায় কাজ কাম করে স্ত্রী দুই ছেলে ও এক মেয়ের ভরন পোষণ চালিয়েছেন। শত কষ্টের মাঝেও তিন সন্তানের পড়াশোনার কোন যেন ক্রুটি না হয় সে ব্যাপারে ছিলেন খুবই সজাগ। অভাব আছে কিন্তু ছেলে-মেয়েদের কখনও বুঝতে দেননি তিনি। বড় ছেলে ময়নুল হক এসএসসি ও এইচএসসি পড়াশুনা অবস্থায় প্রাইভেট পড়াতেন। অনেক সময় নিজের পড়াশুনার খরচ ও পোশাক পরিচ্ছদ নেয়ার পাশাপাশি বাবার সংসারে কিছুটা সহযোগিতা করতে প্রায় সময় দিন মজুরীর কাজও করতেন মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নুল হক। দারিদ্র্য পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি লুৎফর রহমান মারা যাওয়ার পর অন্ধকার নেমে এসেছে পুরো পরিবারের মাঝে। বিশেষ করে সদ্য স্বামী হারা মা মায়া বেগম বড় ছেলে ময়নুল হকের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ, পরবর্তীতে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া এবং এরপর ছোট ছেলে মেরাজ ৭ম শ্রেণী এবং ছোট মেয়ে লুৎফা খাতুনের পড়াশুনাসহ ভরন পোষণ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন।

মায়া বেগম জানান, কি বলবো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি বাহে ! ইতোদিন আমার স্বামী সীমিত আয় হলেও আমার দুই ছেলে এক মেয়ের ভরন পোষণ ও পড়াশোনার খরচ চালিছেন। বড় ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আমার স্বামীর ব্রেইন টিউমার রোগে আক্রান্ত হয়। আমার স্বামীর মাত্র তিন শতক জমিতে বাড়ি চালা। কোন প্রকার আবাদি জমি ছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। তারপরও অনেক কষ্টে দুটি গরু, আদা বিঘা জমি বন্দক নেওয়া ছিল। স্বামীর চিকিৎসার জন্য সেই দুটি গরু বিক্রি ও বন্ধকী জমির টাকা ফেরত নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছে। তারপরেও টাকার অভাবে স্বামীর ভালো চিকিৎসা করাতে না পাড়ায় স্বামীকে বাঁচতে পারিনি। ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিহাস। যেদিন বড় ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির রেজাল্ট আসে, সেইদিন বড় ছেলে ঢাকায় থেকে তার অসুস্থ বাবাকে ফোন করে বলেন বাবা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। তখন তার বাবা ছেলের খুশীর খবরটা শুনে তাকে অনেক দোয়া করেন। তুই অনেক বড় মানুষ হও বাবা। এভাবে বলে আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আমার স্বামী। ছেলেও তার বাবাকে বলে বাবা কোন চিন্তা করো না বাবা তুমি সুস্থ হবে। কিন্তু ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিনিতি ছেলের রেজাল্টের রাতেই আমার স্বামী এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। এখন কি করবো জানি না? গরীব ঘরে জন্ম নেয়া ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য খুই বড় গর্বের। কিন্তু ছেলের স্বপ্ন পূরণে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও পড়াশোনার বিপুল খরচ মেটানো এখন আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলের কাছে শুনলাম ৫ মে ভর্তির শেষ তারিখ। ঘরে একটি কানা-কড়িও নেই। তিনি তার মেধাবী ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য সরকারসহ বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন।

মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নুল হক বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। বাবা অনেক কষ্ট করে ইটভাঙায় শ্রমিকের কাজ করে আমার পড়াশুনার খরচ চালিয়েছেন। আমিও বাবার সংসারে সহযোগিতা ও পড়াশোনার পাশাপাশি কখনও প্রাইভেট ও মানুষের জমিতে দিন মজুরীর কাজও করেছি। হঠাৎ এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছোট সংসারে যা কিছু ছিল সবই বাবার চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে। বাবা-মার অনুরোধে অসুস্থ বাবাকে বাড়িতে রেখে মানুষের কাছে ধার-দেনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় যাই। ঢাকায় যে ম্যাচে ছিলাম সেখানে এক বেলা খেয়ে টানা এক মাস অভাবের কারণে রোজা করেছি। এক মাস পর ম্যাচে থাকা ভাইয়েরা জানতে চায়-আমি কেন রোজা রাখছি। তখন আমি বলেছি ম্যাচে তিন বেলা খাওয়ার টাকা নেই। তাই রোজা করছি ভাই।তুমিতো দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন তারা বলে এখন আর রোজা রাখার দরকার নেই। তোমার খাওয়া খরচ আমরায় চালাবো। তখন ভাইদের কথায় আর রোজা রাখা হয়নি। তারাই আমার খাওয়ার খরচ দিয়েছি। সেখানে থেকেই আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দেই। যেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির রেজাল্ট হয়, সেইদিন বাবা-মাকে ফোনে জানাই। বাবা-মাসহ বাড়ির সবাইকে বলি আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫৮ তম হয়েছে। ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।বাবা মাসহ পরিবারের সবাই খুশি হয়েছেন। তবে কথা বলার সময় বাবা অনেক কেঁদেছেন এবং আমাকে দোয়াও করেছেন। কি নিমর্ম পরিহাস সেইদিন রাত ৪ টায় বাবার মৃত্যুর খবর পাই। এক দিকে বাবাকে হারালাম অন্য দিকে অর্থের অভাবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবো কি অনেক দুচিন্তায় পড়েছি। এই মুহূর্তে আমার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির খরচ জোগানো সম্ভব না। ভর্তির সর্বশেষ তারিখ আগামী ৫ মে। ভর্তিসহ পড়াশোনার খরচ বহন করার জন্য সরকারসহ বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নুল হক। মহান আল্লাহ অশেষ কৃপায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছি। আমি ভবিষ্যতে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে চাই।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেহেনুমা তারান্নুম জানান, ওই মেধাবী শিক্ষার্থীর ঠিকানা জানা নেই। তারপরও খোঁজ খবর নিচ্ছি এবং ওই শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বাস দেন ইউএনও।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর