কুড়িগ্রাম জেলার অধিবাসী হিসেবে হজ নিয়ে কিছু অভিজ্ঞতা
।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন ।।
পবিত্র হজ মুসলিম জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। পবিত্র হজ নিয়ে এ লেখায় যে অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং কাউকে কোনভাবে ছোট করার জন্য লেখার উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কুড়িগ্রামের মতো প্রান্তিক কোন জেলার হাজীগণ যাতে ভবিষ্যতে কোন অসুবিধায় না পড়েন সে বিষয়ে সজাগ করা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০২৬ সালে পবিত্র হজ পালনের জন্য যাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁদেরকে প্রাথমিকভাবে ২৭ শে জুলাই/২০২৫ থেকে ১২ অক্টোবর/২০২৫ এর মধ্যে নিবন্ধন কাজ শেষ করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে ইসলামী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্তাবধানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে হজে যাওয়া যায়। মহান আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমতে ২০২৫ সালে আমি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পবিত্র হজ পালন করেছি। সেক্ষেত্রে কুড়িগ্রাম জেলার অধিবাসী হিসেবে কিছু অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করছি। আমার অভিজ্ঞতা সকল বেসরকারি এজেন্সীর ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য নাও হতে পারে।কিছু ভালো এজেন্সিও অবশ্যই আছে। তবে সেটি হয় তোবা ভাগ্যের ব্যাপার। বেসরকারিভাবে যাঁরা কুড়িগ্রামের মতো প্রান্তিক জেলা থেকে যায় তাঁরা সাধারণত: মূল এজেন্সির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে না। আমার কাছে যেটি মনে হয়েছে এখানে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা কালেকটর/আদায়কারী হিসেবে কাজ করেন। হজ এজেন্সীর লোকজন স্থানীয় কিছু পরিচিত বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের সহায়তায় সুন্দর সুন্দর কথা বলে মানুষকে আকৃষ্ট করেন। আবার টাকার হারও বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। দর কষাকষি বা কৌশলে যিনি যত পারদর্শী তাঁর পক্ষে তত কম রেটে হজে যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অনুভব করি আমি পবিত্র কাজে যাচ্ছি সেখানে টাকা কমই বা দিব কেন অথবা একই সুযোগ সুবিধায় অন্য জনের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ঠকবই বা কেন? পবিত্র কাজে শুরুতেই এ ধরণের ঠগা বা জেতার একটি মানসিক দ্বন্দে পড়াটা বিব্রতকর। আবার তাঁরা বলে মক্কায় কাবা শরীফের কাছাকাছি থাকলে জনপ্রতি বেশি টাকা দিতে হবে। বেশি টাকা দেয়ার পরেও দেখা গেছে সবারই একই দূরত্ব আর একই ব্যবস্থা। এজেন্সির লোকজন যাবার আগে সুন্দরভাবে ওরিয়েন্টেশনে বুঝিয়ে দেয় কোনো ভাবেই আপনার মোয়াল্লেম বা গাইডের সাথে খারাপ আচরণ করবেন না। তাহলে আপনার হজ হবে না। এ ধরণের কাজ যাঁরা হজে যায় কখনই তাঁরা ভাবতে পারেন না। কিন্তু পরে বোঝা যায় কেন তাঁরা এরকম কথা বলেছে।
নির্দিষ্ট দিনে ঢাকার আশকোনার হাজী ক্যাম্পে পৌছার পর বোঝা যায় কুড়িগ্রামের হাজীগণ বগুড়া বা পাবনার কোনো সাব-এজেন্সীর অধীনে এবং তাঁদের মূল এজেন্সীর অফিস বা প্রধান দপ্তর ঢাকায়। কিন্তু অন্য জেলার হাজীদের সাথে কথা বললে দেখা যায় তাঁদের নিজ জেলার লোকই এজেন্সীর মালিক। সেক্ষেত্রে তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা এজেন্সির পরিচিত লোককে বলার সুযোগ পায়। কুড়িগ্রামের মতো প্রান্তিক জেলা থেকে যারা এসেছেন তাঁদের এরকম সুবিধা নেই। বিমান বন্দরে যাবার বাসে ওঠার পর দেখা যায় কুড়িগ্রাম থেকে যাঁরা হাজীদের ঢাকা নিয়ে এসেছে তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাথে যাচ্ছে না। কারণ তাদের দায়িত্ব এখানেই শেষ। কুড়িগ্রাম জেলার জন্য যাঁকে গাইড হিসেবে মনোনীত করে দেয়া হয়েছে তাঁর কোন অভিজ্ঞতাই নেই। মক্কা বা মদীনায় পৌছার পর দেখা গেল যে ধরণের বাসার কথা বলেছে সেরকম নয় এবং মোটামুটি বেশ দুরে। কাউকে বলারও তেমন কিছুই নেই কারণ আপনি যাকে টাকা দিয়েছেন তিনি মূল এজেন্ট নন এবং তিনি সাথেও নেই। সরকারি ভাবে যাঁরা গেছেন তাঁদের বাসা নিকটেই এবং বাংলাদেশস্থ হাসপাতালের একেবারেই কাছে। আবার মক্কা থেকে মদিনায় গেলে ফিরে আসলে ঐ বাসা আর নির্ধারিত থাকে না। অনেক দূরের বাসায় রাখে যাকে ফেতরা বাসা বলা হয়।
সৌদী সরকারের নিয়ম অনুসারে রাস্তায় চলাফেরা কিংবা কাবা শরীফে প্রবেশের ক্ষেত্রে গলায় অবশ্যই নুসক কার্ড (সৌদি সরকারের অনুমতি কার্ড) ঝুলাতে হয়। এই নুসক কার্ড প্রাপ্তিতেও এজেন্টদের অবহেলার কারণে অনেক সময় দেরি হয়। আমি নিজেই ১০ দিন পর নুসক কার্ড পেয়েছি। অথচ যাঁরা সরকারিভাবে গেছেন তাঁরা সৌদি আরবে পৌছা মাত্রই এই কার্ডটি পেয়েছেন। কারণ এই কার্ডটির সাথে বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে।
কোরবানির টাকা নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়। তবে কোরবানীর নির্দেশনা সঠিকভাবে পালন করতে গেলে নির্ধারিত টাকা সৌদি সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা প্রদানই উত্তম। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে টাকা জমা প্রদানের ক্ষেত্রে নিজেকেই সজাগ থেকে টাকা ব্যাংকে জমা প্রদান করতে হয়। অন্য কোনোভাবে কারো হাতে টাকা তুলে দিলে সেক্ষেত্রে নিজে না দেখা পর্যন্ত কোরবানি হয়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না। নিজ উদ্যোগে যাঁরা নির্ধারিত ব্যাংকে টাকা প্রদান করেন কিংবা সরকারি ব্যবস্থায় যাঁরা টাকা জমা প্রদান করেন তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার মেসেজ পেয়ে থাকেন। ফলে কোরবানি সম্পন্ন হর্ওয়া নিয়ে কোনো সংশয় থাকে না।
সকল বেসরকারি এজেন্সির সেবার মান যে খারাপ এমনটি নয়।তবে বেশিরভাগ এজেন্সীর সেবাদান হজ ব্যবস্থাপনার মানদন্ডে সঠিক নয় বলে অধিকাংশ হাজী সাহেবগণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাঁরা হজে গেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মনে হয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উল্লেখিত সমস্যাগুলো নেই। এখানে টাকার পরিমাণের ক্ষেত্রে একই প্যাকেজে কোনরুপ ভিন্নতা নেই। কোনো কারণে খরচ কম হলে সরকারিভাবে আবার টাকা ফেরৎ প্রদান করারও নজির আছে। বাসা নির্ধারিত, নুসক কার্ড প্রাপ্তিতে বিলম্ব বা সমস্যা নেই। কোরবানী নিয়ে কোন প্রকার জটিলতা নেই। বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে ভ্রমণ কিংবা হজের নিয়ম প্রতিপালনে ধর্ম মন্ত্রণালয় নির্ধারিত কর্মকর্তা/কর্মচারীগণের সর্বাত্নক সহযোগিতা পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আমাদের মতো জেলার হাজীদের প্রতি পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়। পাকিস্তান ছাড়া আমি প্রায় বৃষ্টি দেশের হাজীদের সাথে কথা বলেছি তাঁরা সরাসরি সে দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে আসেন এবং তাঁদের সেবার মানো আমাদের সরকারি হজ ব্যবস্থাপনার মতই। আমার অভিজ্ঞতার সাথে সবার মিল নাও থাকতে পারে, তবে আশা করি আমাদের হাজীদের সেবার মান আরো উন্নত হবে এবং সবাই যেন সুন্দরভাবে পবিত্র হজ পালন করতে পারেন -এটাই প্রার্থনা।
লেখক: প্রফেসর মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিন, অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।









Chief Editor-Dipali Rani Roy