সঠিক মাত্রায় লবণ গ্রহণ : সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি
।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।
লবণ মানব দেহে প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ সরবরাহ করে। লবণের সাধারণ নাম খাবার লবণ বা টেবিল সল্ট এবং রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড।লবণের উপাদান সোডিয়াম যা মানবদেহে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং স্নায়ু ও পেশি ঠিক রাখতে সাহায্য করে।এছাড়াও আয়োডিনযুক্ত লবণ গ্রহণ থাইরয়েড গ্রন্থির সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। পৃথিবীজুড়ে লবণের প্রায় ১৪ হাজারেরও বেশি ব্যবহার রয়েছে। খাবারের স্বাদ বাড়ানো থেকে শুরু করে বরফের গলনাঙ্ক বাড়ানো,চাষাবাদ,নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পানি বিশুদ্ধ বা প্রক্রিয়াকরণ, রসায়নের বিভিন্ন গবেষণা এবং তেল ও গ্যাস শিল্পে লবণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে লবণ যেমন উপকারী,তেমনি মাত্রাতিরিক্ত লবণ মানুষ ও অন্যান্য জীবের জন্য ক্ষতিকর। স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের দেহে প্রায় ৪০ চা-চামচ লবণ থাকে। পুরো দেহের প্রায় ০.৪ শতাংশ জুড়ে লবণ। তবে কাঁদলে, ঘামলে বা মূত্র ত্যাগ করলে এর পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায়। সেটা আবার খাবারের মাধ্যমে পূরণ হয়ে যায়।
লবণ ছাড়া জীবন অচল তা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট ম্যাক্যানস একটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তিনি এ পরীক্ষার জন্য ৪ জন স্বেচ্ছাসেবককে বেছে নেন। তাঁদের টানা ১০ দিন যে কোন প্রকার বা উপায়ে লবণ খাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।ঘামের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীদের শরীর থেকে সব লবণ বের করে নেওয়া হয়। তারপর তাদেরকে সম্পূর্ণ লবণহীন খাবার দেওয়া হয়।অল্প সময়ের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবীরা বুঝতে পারেন খাবারে তাঁরা আর কোনো স্বাদ পাচ্ছেন না। তাঁদের দেহে ধীরে ধীরে ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এমনকি খাবার গ্রহণও তাঁদের জন্য কঠিন পরিশ্রমের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
পরীক্ষা শেষে স্বেচ্ছাসেবকদের লবণাক্ত খাবার খেতে দেওয়া হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁদের জিভে আবারও স্বাদ ফিরে আসে এবং তারা আগের মতো শরীরে শক্তি ফিরে পায়।মাত্র ১০দিন লবণ ছাড়া মানুষের শারীরিক অবস্থা যদি এমন হয়,তাহলে লবণ না থাকলে আমাদের কী অবস্থা হতো। আক্ষরিক অর্থেই লবণ ছাড়া বেশিদিন বেঁচে থাঁকা সম্ভব নয়।
সোডিয়ামের অভাব এবং শ্রবণের ওপর প্রভাব:
খাবার লবণের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সোডিয়াম। সোডিয়াম শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য, স্নায়ু সিগন্যাল এবং অন্তঃকর্ণের (এন্ডোলিফ নামক তরল পদার্থ)তরল চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সোডিয়াম কমে গেলে এই তরলের ইলেক্ট্রিকাল ব্যালান্স নষ্ট হয়।ককলিয়ার কোষগুলো সঠিকভাবে শব্দকে প্রক্রিয়া করতে পারে না। ভেস্টিবুলার সিস্টেম কাজ করতে পারে না অর্থাৎ দেহের ভারসাম্য,মাথার অবস্থান এবং গতি পরিবর্তন অনুভব করতে পারে না।সোডিয়ামের সাধারণ মাত্রা হলো ১৩৫-১৪০ মোল/লি.। উক্ত মাত্রার কম বা বেশি হলে তা ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।অতিরিক্ত পানি পান করলে কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে। কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং ব্যথানাশক ওষুধ সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দেহকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে সঠিক মাত্রায় খাবার লবণ তথা সোডিয়াম গ্রহণ করতে হবে।
আয়োডিনের অভাব বুদ্ধিমত্তা হ্রাস করে:
আয়োডিনের অভাবে মানুষের বুদ্ধি কমে যেতে পারে—এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি সত্য। Bleichrodt & Born(1994) এর The Damaging Effects of Iodine Deficiency শিরোনামে ৩৭ টি গবেষণা পত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে আয়োডিনের ঘাটতিতে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ গড়ে ১৩.৫ পয়েন্ট কমে যায়। Asia Pacific Journal of Nutrition গবেষণায়ও অনুরুপ ফলাফল পাওয়া যায়। Assessment of Iodine Deficiency Disorders and Monitoring Their Elimination শিরোনামে প্রাপ্ত গবেষণায়ও একই ফল পাওয়া গেছে। আয়োডিন থেকে উৎপাদিত T3 ও T4 হরমোন মস্তিস্কের বিকাশের ইজ্ঞিন হিসেবে কাজ করে। মানুষের মেধা নির্ভর করে নিউরনের সংখ্যা এবং স্নায়ু কোষের সংযোগের ওপর। স্মৃতি তৈরি হয় নিউরনের মধ্যে সংযোগ (synapse) বৃদ্ধি ও শক্তিশালী হওয়ার মাধ্যমে। আয়োডিনের ঘাটতিতে থাইরয়েড হরমোন কমে যায়।ফলে নিউরন কম তৈরী হয়, মস্তিস্ক আকারে ছোট হয় এবং স্নায়ু কোষের সংযোগ দূর্বল হয়ে যায়। ফলে সার্বিকভাবে একজন মানুষের সরাসরি চিন্তাশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আয়োডিনের ঘাটতিতে সেরিব্রাল কর্টেক্স এর গঠন উন্নত হয় না ফলে ভাষা, স্মৃতি ও শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হয়। শরীরে আয়োডিনের অভাব হলে থাইরয়েড হরমোন তৈরী বাধাগ্রস্থ হয় ফলে মানুষের বুদ্ধি কমে যায়।
মাইলিনেশন হলো স্নায়ুতন্ত্রের মাইলিন আবরণ গঠন ও বিকাশের প্রক্রিয়া। এই আবরণটি স্নায়ু কোষের অ্যাক্সন বা দীর্ঘ অংশকে ঘিরে রাখে এবং স্নায়ু সংকেত দ্রুত পরিবহনে সাহায্য করে। এটি স্নায়ু কোষের মাধ্যমে সংকেত আদান-প্রদানকে অনেক দ্রুততর করে, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং পেশি নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য। আয়োডিনের অভাবে স্নায়ুতন্ত্রের মাইলিনেশন ঘটে ফলে মস্তিষ্কে বার্তা আসা–যাওয়ার গতি ধীর হয়, মনোযোগ কমে যায় এবং স্মরণ শক্তি কমে আসে। মস্তিস্কের হিপোক্যাম্পাস হলো স্মৃতি ও শেখার কেন্দ্র। আয়োডিনের ঘাটতিতে এর আকার ছোট হয়,নতুন স্মৃতি গঠনে সমস্যা হয়। ফলে বুদ্ধিমত্তা, শেখার দক্ষতা, মনোযোগ কমে আসে।আয়োডিনের অভাবে স্মৃতিশক্তি ফিরতে বা উন্নত হতে দেরি হয়, কারণ আয়োডিন সরাসরি থাইরয়েড হরমোন তৈরির সাথে যুক্ত, আর থাইরয়েড হরমোনই মস্তিষ্কের বৃদ্ধি, নিউরন তৈরি, স্নায়ু-সংযোগ এবং শেখার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
কি পরিমাণ লবণ আমাদের জন্য নিরাপদ:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ৫ গ্রাম বা ১ চা চামচ লবণ গ্রহণ করা উচিৎ। এর অতিরিক্ত লবণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর।বেশি লবণ গ্রহণে প্রসাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যায় এবং হাড় ক্ষয় হয়।অতিরিক্ত লবণ গ্রহণে Helicobacter pylori ব্যাকটিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং পেটের আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। ফলে গ্যাস্ট্রিক ও ক্যান্সারের ঝুকি বাড়ে। মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণে ধমনী শক্ত হয়ে যায় ফলে হৃদপিন্ডকে বেশি কাজ করতে হয় এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুকি বাড়ে।উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিস্কে রক্ত প্রবাহে সমস্যা দেখা দেয়। এতে স্মৃতি শক্তি,মনোযোগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আয়োডিন যুক্ত লবণের নিশ্চয়তা কতটুকু:
দেশে বছরে প্রায় ৬০ মেট্রিক টন আয়োডিনের প্রয়োজন। এক হাজার কেজি লবণে ৭০ গ্রাম আয়োডিন মেশানো হয়।১৫ টন লবণে ১ কে.জি আয়োডিন যুক্ত লবণ মেশানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশে তিন ধরণের ২৫০টি লবণ ফ্যাক্টরি রয়েছে -ভ্যাকুয়াম,মেকানিক্যাল ও সনাতন।তন্মধ্যে ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরি সংখ্যা মাত্র ০৭ টি। ভ্যাকুয়াম ফ্যাক্টরিগুলো উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন এবং তাদের উৎপাদিত লবণে আয়োডিনের উপস্থিতি নিয়ে কোন প্রকার সন্দেহ নাই।
সনাতন ও মেকানিক্যাল পদ্ধতির কারখানা গুলোর উৎপাদিত লবণে আয়োডিনের উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা হলেও সন্দেহ রয়েছে। কোনো দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করলে সে দেশ আন্তর্জাতিকভাবে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে এ হার ৭৬ শতাংশ। আরও ১৪ শতাংশ মানুষকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের আওতায় আনতে পারলেই আমরা এ স্বীকৃতি অর্জন করবে।বিশ্বের প্রায় ১২৪ টি দেশে আইনগত বা বাধ্যতামূলকভাবে লবণে আয়োডিন মেশানোর কার্যক্রম চালু আছে। স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদেরকেও আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে অধিক মনোযোগী হতে হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।









Chief Editor-Dipali Rani Roy