কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের শীতার্ত মানুষের পাশে জেলা চর উন্নয়ন কমিটি—চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনে মানবিক আহ্বান
আতাউর রহমান বিপ্লব, কুড়িগ্রাম:
কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা আর চারদিকে নদীবেষ্টিত নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জীবন যেন প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। শহরের তুলনায় বহুগুণ বেশি কষ্টে দিন কাটাচ্ছে নদীঘেরা এসব এলাকার মানুষ। সীমিত আয়ের কারণে অনেকের পক্ষেই শীত নিবারণের ন্যূনতম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। ঠিক এমন মানবিক সংকটের সময়ে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটি।
শুক্রবার(১৬জানুয়ারী) দুপুরে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন চিলমারী ইউনিয়নের কড়াই বরিশাল চরে প্রায় দুই শতাধিক অসহায়, দুস্থ ও শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। জেলা চর উন্নয়ন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচি শুধু শীত নিবারণের সহায়তা নয়, বরং চরবাসীর প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ফজলুল হক, উলিপুর উপজেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম, চিলমারী উপজেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাচ্চু, সাংবাদিক ফয়সাল হক রকি, এস এম রাফিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
কম্বল পেয়ে অনেক চরবাসীর চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, নদীঘেরা চরে শীতের তীব্রতা শহরের তুলনায় অনেক বেশি অনুভূত হয়। কাজের সুযোগ সীমিত, আয় কম—ফলে শীতবস্ত্র কেনা অনেক পরিবারের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে একটি কম্বলও যেন তাদের জন্য বড় আশ্রয়।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,“চরের মানুষ বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। শীত, বন্যা কিংবা খাদ্যসংকট—সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে চরাঞ্চলের মানুষ। আজ আমরা কম্বল দিচ্ছি, কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।”
তিনি আরও বলেন,“যেভাবে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, ঠিক সেভাবেই দেশের চরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে একটি চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা প্রয়োজন। এটি কেবল একটি দাবি নয়, এটি মানবিক অধিকার।”
চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার নদীতীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের প্রায় দুই কোটি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন সময়ের দাবি।
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির নেতারা বলেন, চরাঞ্চলের সমস্যাগুলো সাধারণ উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা ও জীবনযাত্রার ভিন্নতার কারণে চরবাসীর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন। আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমেই এসব সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব।
মানবিক এই উদ্যোগ শুধু শীতার্তদের গায়ে কম্বল জড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চরবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কষ্ট ও ন্যায্য দাবিগুলো নতুন করে জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরেছে। জেলা চর উন্নয়ন কমিটির এই কার্যক্রম চরাঞ্চলের মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে এবং চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের মানবিক দাবি আরও জোরালো করে তুলেছে।









Chief Editor-Dipali Rani Roy