সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কুড়িগ্রামে ল্যাম্পপোস্টের খুঁটি বসাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ২ জনের মৃত্যু স্বর্গের ভেতরে নরকের যন্ত্রণা ভিজিএফ বিতরণে অনিয়ম হলে ছাড় দেবো না: ব্যারিস্টার সালেহী এমপি অনির্দিষ্টকালের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ৪ রুটে বিমানের ফ্লাইট স্থগিত তেলের প্রধান ডিপোগুলোতে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ রাজারহাটে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের শ্রমিক সমাবেশ ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত রাজারহাটে তিস্তা ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মানহীন ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল রাজারহাটে জ্বালানি সংকট, ভোগান্তিতে কৃষক-যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষ ১৮ মার্চ একদিন সরকারি ছুটি, প্রজ্ঞাপন জারি ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সালসহ ২ জন ভারতে গ্রেপ্তার
সংসদ নির্বাচন:
https://www.banglaconverter.org/election

স্বর্গের ভেতরে নরকের যন্ত্রণা

প্রকাশের সময়: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।

দেশের নদী বেষ্টিত জনপদগুলোতে প্রমত্তা নদীর করাল গ্রাসে প্রতিবছর বিলীন হচ্ছে হাজারো মানুষের শেষ সম্বল। যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু রক্ষা করাই এক দুঃসাধ্য সংগ্রাম। সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দূর্বল, স্বাস্থ্য সেবা খুবই অপ্রতুল আর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভঙ্গুর, দু:সাধ্য এবং সবসময় প্রতিকুল। ভাঙনকবলিত এই চরাঞ্চল কিংবা প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার আলো আজও ম্লান; জরাজীর্ণ পাঠশালা আর অভাবের তাড়নায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাই সেখানে বেশি। শিক্ষার সুযোগ না থাকায় বাল্য বিবাহ স্বাভাবিক ঘটনা আর বাল্য বিবাহের কারণে কিশোরী মায়ের সংখ্যা এবং মাতৃমৃত্যুর হারও সর্বাধিক ।

অসুস্থ শরীর নিয়ে মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত বা বালি পথ পাড়ি দিয়ে কোনো মুর্মূষু রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর স্থলভাগও অন্যান্য বিভাগ বা জেলা কিংবা অঞ্চলের চেয়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পিছিয়ে যাচ্ছে। যে অঞ্চলগুলো আগে থেকেই উন্নত সেগুলোর এবং যে অঞ্চলগুলোর স্থানীয় নেতৃত্বের সাথে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্পর্ক ও যোগাযোগ নিবিড় তারাই উন্নয়ন কর্মকান্ডে বেশি উপকৃত হচ্ছে। একই ট্রেনের বিভিন্ন কমপার্টমেন্ট যেমন এসি/নন-এসি এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত অঞ্চলভেদে নাগরিকদের সমাজ ব্যবস্থার মানও সেভাবেই সাজানো। ’অশিক্ষিত’ ছায়া ছবির সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার কণ্ঠে জনপ্রিয় একটি দ্বৈত গান যেমন-“তুমি…তুমি বড় ভাগ্যবতী…আছে আমার ঘরে আঁধার, জ্বলে তোমার ঘরে বাতি’’। দু:খী প্রান্তিক মানুষগুলোর বঞ্চনার হাহাকার করুন চিত্র এভাবেই সাজানো। অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তীক জেলার উন্নয়ন বঞ্চিত এ মানুষগুলোর দু:খ কষ্টের জীবন কাহিনী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় না কিংবা উল্টোভাবে তুলে ধরা হয়। ফলে আমাদের অবস্থা দাড়ায় একটি জনপ্রিয় বাস্তব গানের সেই কলির মতো- “ভবে জনম দুঃখী কপাল পোড়া গুরু আমি একজনা, আমার দুঃখে দুঃখে জনম গেল, দুঃখ বিনে সুখ হলোনা , গুরু উপায় বলো না, জনম দুখী কপাল পোড়া গুরু আমি একজনা”। বিষয়টি স্পষ্টীকরণের জন্য কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরছি।

(১) পটেমিক ভিলেজ:
১৭৮৭ সালে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেট যখন নববিজিত ক্রিমিয়া অঞ্চল পরিদর্শনে যান, তখন তাঁর মন্ত্রী এবং প্রাক্তন প্রেমিক গ্রিগরি পটেমকিন এক অভাবনীয় জালিয়াতির আশ্রয় নেন। যুদ্ধের কারণে ক্রিমিয়া অঞ্চলটি তখন ছিল বিধ্বস্ত এবং সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু পটেমকিন চেয়েছিলেন সম্রাজ্ঞীকে দেখাতে যে তাঁর শাসনে নতুন এই রাজ্যটি সমৃদ্ধিতে ভরে গেছে।সম্রাজ্ঞী যখন দানিউব নদী দিয়ে যাচ্ছিলেন, পটেমকিন নদীর তীরে দূর থেকে দেখার জন্য কাঠের নকল ঘরবাড়ির সম্মুখভাগ তৈরি করিয়েছিলেন। দূর থেকে দেখে মনে হতো সেখানে সুন্দর গ্রাম ও জনপদ রয়েছে। এমনকি সম্রাজ্ঞীর চোখে ধুলো দিতে সাধারণ মানুষকে ভালো পোশাক পরিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে দূর থেকে তাদের হাসিখুশি ও সুখে আছে বলে মনে হয়।সম্রাজ্ঞী চলে যাওয়ার পর সেই কাঠের স্থাপনাগুলো তড়িঘড়ি করে খুলে ফেলা হতো এবং পরের গন্তব্যে নিয়ে আবার বসানো হতো। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কোনো দূর্গত এলাকা পরিদর্শনে এলেও তাঁদেরকে শুধুমাত্র যেখানে তাদের যানবাহন যেতে পারবে সে পর্যন্তই তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারাও দূর্গম এলাকা যেতে চান না। এভাবেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের বাস্তব অবস্থা থেকে যায় অন্ধকারে।

‘(২) বস্তিমুক্ত’ ব্রাজিল (২০১৪ বিশ্বকাপ)
২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিল সরকার রিও ডি জেনিরোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের মূল কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তার পাশে বিশাল স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল তুলে দিয়েছিল। সরকার বলেছিল এটি “শব্দ দূষণ” কমানোর জন্য।আসলে সেই কাঁচের দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে বিদেশি পর্যটকরা রাস্তার পাশের বিশাল বস্তি এলাকা দেখতে না পায়। পর্যটকদের কাছে ব্রাজিলের দারিদ্র্য লুকিয়ে শুধুমাত্র জৌলুসপূর্ণ চিত্র তুলে ধরাই ছিল এর উদ্দেশ্য। অনেক সময় শাসকরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বা প্রজাদের বিদ্রোহ দমাতে কৃত্রিম এক “স্বর্গরাজ্য” সাজিয়ে রাখেন। অলিম্পিক বা কোনো আন্তর্জাতিক ইভেন্টের আগে শাসকরা শহরের দরিদ্র বস্তি এলাকাগুলো বড় দেয়াল বা বিলবোর্ড দিয়ে ঢেকে দেন, যাতে বিদেশি প্রতিনিধি বা উচ্চপদস্থ মেহমানরা দারিদ্র্য দেখতে না পান। এটিও এক ধরনের “সব ঠিক আছে” প্রমাণের চেষ্টা।

(৩) এডমন্ড বার্কের বর্ণনায় ভারতের ‘অন্ধকূপ’ চিত্র
ব্রিটিশ আমলে ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে যখন বিচার চলছিল, তখন বিখ্যাত দার্শনিক এডমন্ড বার্ক একটি ভয়াবহ তথ্য সামনে আনেন। হেস্টিংস ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বাংলার মানুষ ব্রিটিশ শাসনে খুব সুখে আছে। রানী যাতে দরিদ্র শ্রমিকদের কঙ্কালসার চেহারা বা শহরের নোংরা পরিবেশ না দেখেন, সেজন্য রাস্তার দুই ধারে নতুন গাছ লাগানো হতো এবং সাদা রং করা হতো। রানী ভিক্টোরিয়া তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে তাঁর প্রজারা কত সুখী এবং দেশ কত পরিষ্কার! অথচ তাঁর কয়েক গজ দূরেই মানুষ তখন কলেরায় মারা যাচ্ছিল এবং মানবেতর জীবন যাপন করছিল।

(৪)উত্তর কোরিয়ার কিজং-দং:
দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়া একটি অত্যন্ত সুন্দর ও আধুনিক গ্রাম তৈরি করে রেখেছে। সেখানে বিশাল ভবন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দেখা যায়। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গ্রামটিতে আসলে কেউ বাস করে না। এটি তৈরি করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে দেখানোর জন্য যে তাদের দেশের মানুষ কতটা সুখে শান্তিতে বাস করছে।

(৫) নীল দর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে জেলা জরিমানা:
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় ব্রিটিশ নীলকররা অত্যন্ত চড়া দামে নীল বিক্রির লোভে কৃষকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত। অগ্রিম টাকা (দাদন) দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করা, ধান বা অন্য ফসলের বদলে নীল চাষে বাধ্য করা, রাজি না হলে মারধর, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং স্ত্রী-সন্তানদের অপহরণের মতো ভয়াবহ অত্যাচার করা হতো । এর প্রতিবাদে ১৮৫৯-৬০ সালে বিখ্যাত নীল বিদ্রোহ শুরু হয়, যা’নীলদর্পণ’ নাটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । এই ঘটনায় ধর্মযাজক রেভারেন্ড জেমস লং খুবই মর্মাহত হন। তিনি প্রকৃত ঘটনা ব্রিটিশদের জানাতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে নাটকটিকে ‘”দ্য ইন্ডেগো প্লান্টিং মিরর”নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তার উদ্দেশ্য হলো ব্রিটিশদেরকে প্রকৃত ঘটনা জানানো। তিনি প্রায় ৫০০ কপি ছাপিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন যাতে নীলকরদের অত্যাচার বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। নীল কররা ক্ষিপ্ত হয়ে জেমসের নামে মিথ্যা মানহানি মামলা করে । আদালতের রায়ে জেমসের এক মাস জেল ও একহাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কালী প্রসন্ন সিংহ নামে এক বাঙ্গালী মানবিক দানবীর জরিমানার টাকা দিয়ে দেন।

রেভারেঞ্জ জেমস লঙ বিশ্বাস করতেন, নীলকরদের এই অমানবিক আচরণ খ্রিস্টধর্মের আদর্শের পরিপন্থী। তিনি চেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ মানুষ জানুক যে, খ্রিষ্টধর্মের দোহাই দিয়ে বা ব্রিটিশ পরিচয়ে নীলকররা ভারতে আসলে কী ধরনের ‘অধর্ম’ করছে। তিনি নাটকটি পাঠানোর মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, নীলকরদের এই অত্যাচার যদি বন্ধ না হয়, তবে ভারতে বড় ধরনের বিদ্রোহের সৃষ্টি হতে পারে। এটি মূলত নীল কমিশন গঠনে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছিল। জেমসের ঘটনায় দায়ী বিচারকের নিন্দা করা হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে জেমসের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়। এরকম অনেক ঘটনা শাসকেদের অগোচরেই থেকে যায় ফলে প্রজাদের দু:খের করুন কাহিনী অজানাই থেকে যায়। এ জন্য সাধারণ নাগরিকের কর্তব্য হলো তাদের প্রকৃত কোন সমস্যা বা উন্নয়ন প্রয়োজন হলে কোন মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারকে জানানো । আর যদি সেটি না করে ঘরে বসে বলা হয় যা কিছু হবে তা সরকারের দায়িত্ব তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান হবে না। ফলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আরো পিছিয়ে যাবে , বাড়বে জন দূর্ভোগ। এজন্য সরকার ও জনগণের মাঝে প্রয়োজন মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি সংযোগ।
এ ধরণের যোগাযোগে কয়েকটি অনুন্নত এলাকার জনগণ ও সরকারের মাঝে স্থায়ী উন্নয়নের স্বচ্ছ সেতু বন্ধন তৈরী হয়েছে যা আমাদের সকলের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণযোগ্য।

১. পি. সাইনাথ এবং ‘এভরিবডি লাভস এ গুড ড্রট’ :
পি. সাইনাথের বিখ্যাত বই ‘এভরিবডি লাভস এ গুড ড্রট’ ভারতের গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং সরকারি ব্যবস্থার অসারতা নিয়ে লেখা একটি অনবদ্য দলিল। বইটির মূল প্রতিপাদ্য হলো—ভারতবর্ষে দারিদ্র্য বিমোচন বা ত্রাণ কার্যক্রম অনেক সময় একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে যে বিশাল অঙ্কের সরকারি অনুদান বা বিদেশি সাহায্য আসে, তার বড় একটি অংশ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের পকেটে চলে যায়। প্রচন্ড খরায় গরীব মানুষ মারা গেলেও একটি গোষ্ঠীর লাভ হয় এজন্য তারা সবাই খরার মতো একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগকে দারুন ভালোবাসে।সাইনাথ দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় গ্রামোন্নয়নের পরিকল্পনাগুলো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা বাস্তবসম্মত নয়। যেখানে গরুর গাড়ি প্রয়োজন, সেখানে দেওয়া হয় ট্রাক্টর ।যে এলাকায় পানির অভাব, সেখানে পানিগ্রাসী ফসলের চাষকে উৎসাহিত করা হয়। লেখক ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো যেমন: ওড়িশার কালাহান্ডি বা বিহারের আদিবাসী অঞ্চল ঘুরে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতার কয়েক দশক পরেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক অধিকার থেকে মানুষ কতটা বঞ্চিত। বইটিতে সংবাদপত্রের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মূলধারার মিডিয়া যখন গ্ল্যামার, রাজনীতি বা ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত, তখন গ্রামীণ ভারতের হাহাকার বা কৃষকের আত্মহত্যা তাদের পাতায় জায়গা পায় না। সাইনাথ একে ‘স্ট্রাকচারাল ইনইকুয়ালিটি’ বা কাঠামোগত বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি যখন লিখলেন কীভাবে সামান্য কিছু খাবারের জন্য মানুষ তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দিচ্ছে, তখন সেই লেখাগুলো কেবল ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলে ঝড় তোলে।এই লেখার প্রজেক্টটি পরবর্তীতে ”এভরিবডি লাভস এ গুড ড্রট’ ‘ নামক একটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। ফলে সরকার বাধ্য হয় কালাহাণ্ডির জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করতে। রাস্তাঘাট, রেশন ব্যবস্থা এবং কৃষি সেচ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়। আজ কালাহাণ্ডি আগের মতো সেই ‘অভিশপ্ত’ জনপদ নেই; সেখানে কৃষিতে অনেক উন্নতি হয়েছে।

২. রাচেল কারসন এবং ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’:
একটি বই কীভাবে একটি দেশের পরিবেশ ও গ্রামীণ জনপদকে বাঁচিয়ে দিতে পারে, তার সেরা উদাহরণ হলো এটি। ১৯৬২ সালে রাচেল কারসন তার বইয়ে লিখেছিলেন কীভাবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমেরিকার গ্রামাঞ্চলের পাখি এবং প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই একটি বইয়ের প্রভাবে মার্কিন সরকার ডিডিটি নামক মারাত্মক কীটনাশক নিষিদ্ধ করে এবং পরিবেশ রক্ষা আইন তৈরি করে। এর ফলে বহু কৃষিপ্রধান এলাকার মাটি ও পানি দূষণমুক্ত হয় এবং প্রাণবৈচিত্র্য ফিরে আসে।

৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের কারণে অনেক দুর্গম চরাঞ্চল বা হাওর এলাকায় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। ঘুর্নিঝর উপদ্রুত এলাকা বা চরাঞ্চল নিয়ে যখন বিভিন্ন ফিচার বা গল্প পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কিংবা ইত্যাদি’র মতো জন প্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে দেখানো হয়েছে, তখন দাতা সংস্থা এবং সরকার সেখানে সোলার প্যানেল, শিক্ষা ও স্যানিটেশন নিয়ে কাজ শুরু করেছে।সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে অনেক দুর্গম গ্রামের সমস্যা নিয়ে ব্লগ বা ভিডিও পোস্ট হওয়ার পর প্রশাসন দ্রুত রাস্তা করে দেওয়া বা ব্রিজ নির্মাণের ব্যবস্থা নিয়েছে—এমন অসংখ্য নজির আমাদের সামনে আছে।

৪. সাহিত্যের কাল্পনিক প্রভাবে বাস্তব উন্নয়ন:
কখনো কখনো কোনো কাল্পনিক গল্পও মানুষের মনে উন্নয়নের নেশা জাগিয়ে তোলে। যেমন: পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটিতে মানিক বন্ধোপাধ্যায় জেলেদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল যে, পরবর্তীতে মৎস্যজীবীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে এটি প্রভাব ফেলেছিল। কলমের এক একটি আঁচড় যখন জনমানুষের মনে দাগ কাটে, তখন সরকার বা প্রশাসন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। এভাবেই লেখালেখি একটি অবহেলিত জনপদকে উন্নয়নের মূলধারায় ফিরিয়ে আনে।বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ নিবন্ধিত জেলে রয়েছে।মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মোট ৬,২০,১৪০ জন জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।সাগরে মাছ ধরার ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় ৩,১১,০৬২টি জেলে পরিবারকে মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলে প্রতি মোট ৮৬ কেজি করে চাল (দুই কিস্তিতে) বরাদ্দ করা হয়।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার ডাফলোর ‘পুওর ইকোনমিক্স’ (Poor Economics) বইটিতে একটি গবেষণামূলক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। ভারতের রাজস্থানের একটি গ্রামে সরকার বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি পালন করলেও মায়েরা শিশুদের টিকা দিতে আসছিল না। সবার ধারণা জনগণ স্বাস্থ্য সচেতন নয়।কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, একদিন টিকা নিতে আসা মানে ওই মায়ের একদিনের মজুরি নষ্ট হওয়া। একদিন কাজ করতে না পারলে তাদেরকে উপাস থাকতে হবে। সবার আগে মানুষের প্রয়োজন জীবন বাঁচাতে খাদ্য যোগাড় করা। সরকার বাস্তব অবস্থা বুঝে যখন টিকা দেওয়ার বিনিময়ে এক কেজি করে ডাল দেওয়া শুরু করল, তখন লাইনে মানুষের ভিড় জমে গেল। অর্থাৎ গরীব মানুষের সমস্যা কেবল ‘অশিক্ষা’ নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামই মূল ও প্রধান সমস্যা। কুড়িগ্রাম তথা রংপুর বিভাগের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন কর্ম সংস্থান তথা খাবার ব্যবস্থা করা। তারপর সকল উন্নয়ন কর্মাকান্ডে সম্পৃক্ত করা।সরকার ও জনগণের মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা পর্দার দেয়াল কাম্য নয়। জনগণের দাবি সরাসরি সরকারের নিকেট পৌছে দেয়া এবং সরকারের কোন নির্দেশনা থাকলে তা জনগণ শতভাগ মেনে চললে এলাকার উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি সম্ভব। দরিদ্ররা অলস বা অশিক্ষিত নয়, বরং তারা সীমিত সম্পদের মধ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, কিন্তু তথ্যের অভাব বা সুযোগের অভাবে সঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারে না। দ্য ম্যান হু মুভড দ্যা মাউনটেইন নামক সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটি গল্পে বলা হয়েছে ভারতের বিহারের গয়া জেলায় দশরত নামক এক ব্যক্তির অসূস্থ স্ত্রীকে পাহাড়ের কারণে ৭০ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে হাসপাতালে নিয়ে আসতে রোগী মারা যায়। পরে দশরত একাই একটি ছেনি আর হাতুড়ি দিয়ে ২২ বছর ধরে পাহাড় কেটে হাসপাতালে যাওয়ার ৩৬০ ফুট লম্বা সোজা রাস্তা তৈরি করেন। এ ধরণের ঘটনা আমাদের শেখায় যে, যেখানে সরকারি উদ্যোগ থাকেনা বা ব্যর্থ হয়, সেখানে একজন সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অসাধ্য সাধন করতে পারে।
লেখক: প্রাক্তন অধ্যক্ষ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর