বন্ধ বাংলাদেশের ৩২ বিদ্যুৎকেন্দ্র, চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াবে
জ্বালানি সংকটের পর এবার বাংলাদেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যে, বর্তমানে দেশের ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বন্ধ আছে ৩২ কেন্দ্রের উৎপাদন। সরকারের পক্ষ থেকে এই গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। গরম যত বাড়ছে চাহিদা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, গরমের মাঝামাঝি এবার বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত চলে যেতে পারে বলে পিডিবির দায়িত্বশীলরা মনে করছেন।-খবর তোলপাড়।
অথচ বর্তমানে গড়ে ১২ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে বিদ্যুৎ বিভাগ। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ঘাটতিতে গত দুই দিন ধরে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার শহর ও গ্রামে লোডশেডিংয়ের সমন্বয় করতে এবার ঢাকাতেও লোডশেডিং দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। পিডিবি সূত্র বলছে, একদিকে ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অন্যদিকে দেশের বেশ কয়েকটি পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতাও কমে আসায় এসব কেন্দ্রে উৎপাদন কম হচ্ছে। পিডিবি সূত্রে জানা যায়, কিছু কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়ার পথে আছে। কিছু কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ। আবার দীর্ঘদিন উৎপাদনে কিছু পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কমে গেছে। এগুলো নির্মাণের সময় যে ক্ষমতায় স্থাপন করা হয়েছিল তার থেকে এখন ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। যেমন ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও দিতে পারছে না। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ ২৫ থেকে ৩০ বছর ফুরিয়ে গেছে। যুদ্ধের জন্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আমদানীকৃত তেলে প্রভাব পড়েছে।
ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবং জাহাজ না আসার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সময়মতো তেল পাচ্ছে না। এ কারণেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কম। পিডিবির নিজস্ব উৎপাদন এবং বাইরের উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ মিলেও এবার গরমে বিদ্যুতের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে তা সরকার পূরণ করতে পারছে না। পিডিবির পরিচালক জনসংযোগ মো. শামীম হাসান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এবার গরমে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট ধরা হয়েছে। দেশের গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা থেকে শুরু করে শহরের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার ধরে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা ২৩ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াট হওয়া উচিত। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও গরমে এখন ১৬ হাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন করাও কষ্টের।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্যে, গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত মোট ২৪০১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়। এ সময় সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩১৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা-১ অধিশাখার যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে আমরা এই দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছি। গত বছরের তুলনায় এ বছরের বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি। এখন শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে গরমও বেড়েছে। গ্রাহকরা সব সময় এসি ব্যবহার করছেন। বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার সঙ্গে জ্বালানিসংকট অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। কয়লাভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ভারতেন আদানির একটি এবং বাশখালীর এস এস পাওয়ারের একটি ইউনিটের সরবরাহ বন্ধ। এখানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি।
এ ছাড়া জ্বালানি সংকটের জন্য আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ আছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এর উৎপাদন শুরুর কথা। আদানির ইউনিটটি ২৬ এপ্রিল ঠিক হবে। আর ২৮ তারিখের মধ্যে এস এস পাওয়ার ঠিক হবে। সব মিলে ১৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে তখন দিতে পারব। এতে ভোগান্তি কিছু কমবে।
উম্মে রেহানা বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য গত ৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ সচিব একটি বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও সংঞ্চালনের সঙ্গে জড়িত প্রধানদের সব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। এতে দেখা যায়, গরমে এ ধরনের সংকট প্রতিবার তৈরি হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এবার সংকট কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধে এলএনজি আমদানি করা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগ স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে আমাদের দিচ্ছে। এতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। মোট বিদ্যুতের ৪৩ শতাংশ (১২০৫৪ মেগাওয়াট) প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদন করা হয়।
শুধু গ্যাসের মাধ্যমে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন। ১২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস হলেও সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সামাল দেওয়া যেত কিন্তু এখন সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ এমএমসিএফডি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। গ্যাস দিয়ে এখন অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। ফার্নেস তেল ব্যয়বহুল বলে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এখন সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। বৈঠকে দেশের ৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পূর্ণ উৎপাদন করতে বলা হয়েছে। বৈঠকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয়, বিভাগভিত্তিক, কেন্দ্রীয় লোড ম্যানেজমেন্ট এবং কেপিআই লোড ম্যানেজমেন্ট কমিটি তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাম ও শহরে লোডশেডিং সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঘাটতি পূরণে গ্যাস ঠিকভাবে দেওয়ার জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। আমরা ঢাকায় লোডশেডিং দিচ্ছি না। ঢাকা ও অন্য জেলায় লোডশেডিং সমন্বয় করা বিষয়ে ঊর্ধ্বতনরা সিদ্ধান্ত নেবেন। এ বিষয়ে শিগগিরই আমরা ভালো খবর দিতে পারব। সেচকাজের জন্য রাত ১২টার পর এখন বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ : দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ পাওয়ার প্ল্যান্টের চালু থাকা সবশেষ ১ নম্বর ইউনিটটি বুধবার মধ্যরাতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে তিনটি ইউনিট রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর আগেই দুটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, বুধবার মধ্যরাতে প্ল্যান্টের ১২৫ মেগাওয়াটের ১ নম্বর ইউনিটটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ইউনিটটি সচল করতে কাজ চলছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে।









Chief Editor-Dipali Rani Roy