পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপির কোন্দল, জামায়াতের উত্থান হবে ত্রিমুখী লড়াই
সংবাদদাতা, পঞ্চগড়:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠেছে পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) আসনের রাজনৈতিক উত্তাপ। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা এবং বিকল্প শক্তিগুলোর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে এখানে ত্রিমুখী নির্বাচনী লড়াইয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ আসনে বিএনপির আলোচিত ও বিতর্কিত প্রার্থী হিসেবে সামনে আছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এবং কেন্দ্রীয় কমিটির পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন আজাদ। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় থাকলেও তার বিরুদ্ধে দলীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের পুনর্বাসনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়াত এমপি মোজাহার হোসেনের অনুসারীসহ দলের একটি বড় অংশ আজাদের বিরোধিতায় মুখর।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি মাসুদ রানা রিয়াজ প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে তার ওপর সাকোয়া বাজারে হামলা হয়। এতে আজাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। ঢাকায় এ ঘটনায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। বর্তমানে রিয়াজ চিকিৎসাধীন।
বিএনপির আরেক আলোচিত নেতা রহিমুল ইসলাম বুলবুল, যিনি বহিষ্কৃত উপজেলা আহ্বায়ক ও দুইবারের ইউপি চেয়ারম্যান, তিনি আজাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। গুঞ্জন আছে, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন, যা আজাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে শৃঙ্খলাবদ্ধ সাংগঠনিক তৎপরতা ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। বোদা উপজেলায় সফিউল্লাহ সফির নেতৃত্বে নিয়মিত ওয়ার্ডসভা এবং জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখায় তারা নীরবে মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি হচ্ছে।
একইসঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে জাগপার ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানের নাম। সাবেক বর্ষীয়ান রাজনীতিক শফিউল আলম প্রধানের কন্যা হিসেবে তিনি এলাকার একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবারের প্রতিনিধি। তার প্রার্থিতা ভোটে চমক আনতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মুকুল বকশী। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেশি। প্রয়াত এমপি মোজাহারের পরিবারের একটি অংশও তাকে সমর্থন করছে। তিনি এখনো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে পারে কৌশলগত দিক।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনও এ আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি, তবে শেষ মুহূর্তে চমক দেখানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিগত বছরগুলোতে পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নির্বাচিত যারা-
পঞ্চগড়-২ আসন থেকে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে মোজাহার হোসেন সর্বোচ্চ ৪২,৩৩৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মোজাহার হোসেন ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যথাক্রমে ৪৮,৫৩৪ ও ৮৩,৬৫৩টি ভোট পেয়ে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০০৮ সালে এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল ইসলাম সুজন ১৪২,৪৮৮ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর পঞ্চগড়-১ আসনের মতো এ আসনটিও আওয়ামী লীগ আর হাতছাড়া করেনি। ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও নূরুল ইসলাম সুজন এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পঞ্চগড়-২ আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪১। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৭১০, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৪ হাজার ২২৮ এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ছিলেন তিনজন। তবে হালনাগাদ তালিকায় মৃত ভোটার বাদ দেওয়ার পর এ আসনে ভোটার বেড়েছে ১৩ হাজার ২৬৭। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার এক লাখের বেশি। তরুণ ভোটার ২৫ থেকে ৩০ হাজারের মতো।
সব মিলিয়ে পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি, বিকল্প প্রার্থীদের অবস্থান এবং ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত ভোটব্যাংক—সব মিলিয়ে একটি জটিল নির্বাচনী সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই আসনে কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে পরবর্তী কয়েকদিনের কৌশল ও মাঠের বাস্তবতা।









Chief Editor-Dipali Rani Roy