ইরানে নিহত-আহতদের স্মরণে বিনামূল্যে ৪ শতাধিক মানুষকে ইফতার বিতরণ
হুমায়ুন কবির সূর্য:
দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে প্রতি শুক্রবার গরীব, অসহায়, ভবঘুরে ও প্রতিবন্ধী মানুষকে বিনামূল্যে পেটপুরে খাবার খাওয়ান কুড়িগ্রামের পাগলা হোটেলের মালিক রনজু মিয়া। এবার তিনি ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশীসহ আহত-নিহত ইরানিদের স্মরণে মাফিরাত কামনায় বিনামূল্যে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছেন। এতে দিনব্যাপী প্রায় ৪ শতাধিক হতদরিদ্র মানুষ ফ্রিতে খাবার পেয়ে খুশি।
জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দিগল হাইল্যা মৌজার প্রত্যন্ত গাজিপুর বাজারে অবস্থিত রনজু মিয়ার পাগলার হোটেল। ছোট্ট পান ও চায়ের দোকান দিয়েই চলছে তাদের সংসার। এলাকায় উপকারি মানুষ হিসেবে পরিচিত রনজু মিয়ার নেশাই হলো ভবঘুরে, প্রতিবন্ধী ও ছিন্নমুল মানুষকে খুঁজে খুঁজে এনে বিনামূল্যে পেটভরে খাওয়ানো এবং দূরের মানুষ হলে তাদেরকে যাতায়াতের টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়া। এতেই তার আনন্দ। ইরানে বাংলাদেশীসহ নিরিহ ইরানিরা মারা যাচ্ছে, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় রনজু মিয়া গরুর মাংস, মুরগীর মাংস ও মসুরের ডাল দিয়ে বিরিয়ানি এবং ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি, বুন্দিয়া দিয়ে ইফতারির আয়োজন করেছেন। সকাল ১১টা থেকে রান্নার আয়োজন করা হয়। দুপুর থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসতে থাকে ছিন্নমুল মানুষ। এর আগে আশে পাশে মাইকিং করায় আজ লোকজনের চাপ বেশি। তারপরও ৪ শতাধিক মানুষের খাবার তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও আরো দুই শতাধিক মানুষের খাবার রেডি আছে। ফলে কেউই খালি হাতে ফিরে যাবেন না। এ ব্যাপারে খুবই আন্তরিক রনজু মিয়া।
রনজু মিয়া জানান, দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে পাগলার হোটেলে প্রতি শুক্রবার বিনামূল্যে প্রতিবন্ধী, ভবঘুরে ও ছিন্নমুল মানুষকে পেটভরে খাওয়াচ্ছি আমি। এরআগে ঢাকায় একটি হোটেলে কাজ করতাম সেখানে মালিককে দেখেছি রাস্তার অসহায় মানুষকে হোটেলে ডেকে এনে খাওয়াতে। সেখান থেকে আগ্রহ বোধ করি। পরে ভাবলাম আমার এলাকার মানুষের জন্যও এমন কাজ করতে পারি আমি। সেই ইচ্ছা থেকে শুরু করেছি। প্রথম প্রথম ৩ থেকে ৪জনকে ডেকে এনে খাওয়াতাম। এরপর হোটেলে বিক্রিবাট্টা বেড়ে গেল। লাভ হতে থাকল। তখন সপ্তাহে ৬দিন বিক্রি করে যে অর্থ পাই সেখান থেকে কিছু অর্থ জমা করে প্রতি শুক্রবারে ফ্রিতে অসহায় মানুষকে পেটভরে খাওয়ানো শুরু করি। এতে তারা যে তৃপ্তি ভরে খান এটাই আমার আনন্দ।
রনজু মিয়া আরও জানান, ইরানে মুসলমানদের নিহত হওয়ার খবরে আমি খুবই ব্যাথিত হয়। মনে মনে ভাবছিলাম তাদের জন্য কিছু করা যায় কিনা। এসময় আমার কাছে তেমন একটা টাকা ছিল না। পরে আমার ঘরের মধ্যে বাঁশের কোটরে টাকা জমা করেছিলাম। কাল সেই বাঁশের কোটর কেটে প্রায় ১৪ হাজার টাকা পাই। সেই টাকা দিয়েই দোয়া মাহফিল ও ইফতারের আয়োজন করেছি। যাতে মানুষ তৃপ্তি ভরে খেয়ে ইরানি মুসলমানদের জন্য দোয়া করে। গরীব মানুষের দোয়ায় যাতে মুসলমানরা জয়লাভ করতে পারে।
ইফতার খেতে আসা বিভিন্ন এলাকার ছিন্নমুল মানুষ জানান, রনজু মিয়ার মনটা অনেক বড়। সে আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। কারো বাড়ি দূরে হলে তাকে যাতায়াতের টাকাও দেয়। এছাড়াও সে অনেককে বিনামূল্যে ঔষধ ও কাপড় কিনে দেয়া। আমরা তার এখানে পেটপুরে খেতে পারি।
গাজীপুর বাজারের বাসিন্দা কাইয়ুম মিয়া জানান, রনজু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজের সামর্থ অনুয়ায়ী অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে খাবার তুলে দিচ্ছেন। দেশ-বিদেশের দানশীল ব্যক্তিরা তার কাজে এগিয়ে আসলে রনজু মিয়া আরো অধিক হতদরিদ্রদেরকে খাওয়াতে পারবে।
রনজু মিয়ার স্ত্রী আছিয়া বেগম জানান, আমি প্রথম প্রথম তার এই কাজটাকে পাগলামো মনে করতাম। কিন্তু যখন অসহায় গরীব মানুষগুলো আমার স্বামীর হাত থেকে খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে হাসিমুখে আমাদের দিকে তাকাত তখন খুব ভাল লাগতো। যারা এই ধরণের কাজে সহযোগিতা করেন তাদের কাছে অনুরোধ রাখছি আপনারা একটু এগিয়ে আসলে আমরা আরো হতদরিদ্র, ছিন্নমুল, ভবঘুরে ও প্রতিবন্ধী মানুষদের খুশি মনে পেট ভরে খাওয়াতে পারতাম। যোগাযোগ: ০১৭৪৫১৯৭০৪৬ (রনজু মিয়া)।









Chief Editor-Dipali Rani Roy