সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ১১:৫০ অপরাহ্ন
সংসদ নির্বাচন:
https://www.banglaconverter.org/election

রাজনীতিতে ভিন্নতা, উন্নয়নে একতা: কুড়িগ্রামের সম্ভাবনার গল্প

প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

।। প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন।।

আমাদের বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি দল, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যকার সুদৃঢ় ঐক্য ও সহযোগিতা। দেশের কল্যাণমূলক কাজে গঠনমূলক সমালোচনা, পারস্পরিক পরামর্শ এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করাই টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জেলা কুড়িগ্রাম দেশের তথা বিশ্বের জন্য একটি অনন্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

পৃথিবীর অনেক কালজয়ী আবিষ্কার, বৈপ্লবিক মতাদর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অনেক অখ্যাত বা প্রান্তিক জনপদ থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কুড়িগ্রামের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ সময় সংসদীয় নির্বাচনে এখানকার মানুষ তৎকালীন সরকারের বিপরীত ধারার রাজনৈতিক দলকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে অন্যান্য জেলার তুলনায় কুড়িগ্রামে কাঙ্ক্ষিত সরকারি উন্নয়ন প্রতিফলিত হয়নি। যেটুকু সময় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ছিল তাঁরাও দলীয় কোন্দলের কারণে জেলার উন্নয়নে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারেন নি। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ কোনো ভেদাভেদ না রেখে এক ছাতার নিচে সমবেত হবে। জেলার প্রকৃত সমস্যা ও উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলো দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে চিহ্নিত করবে। লক্ষ্য পূরণে কোন পক্ষ বা দল কী ভূমিকা পালন করবে, তা সুনির্দিষ্ট করে একযোগে কাজ করে যাবে।

আমরা যদি কুড়িগ্রামে এই ‘ঐক্যমত্যের রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে কুড়িগ্রাম আর পিছিয়ে পড়া জনপদ থাকবে না। এটি কেবল একটি জেলার উন্নয়ন নয়, বরং দেশ-বিদেশে একটি স্মরণীয় ও অনুকরণীয় গণতান্ত্রিক উন্নয়ন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এ বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য নিচে কিছু একাডেমিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।

সিনারজিস্টিক ইফেক্টের সূত্র হলো ১+১=৩। অনেকে মনে করতে পারে যোগফলটি হয়তোবা ভুল। না, মোটেই নয় এটাই সিনারজিস্টিকি ইফেক্ট যেখানে দুই বা ততোধিক উপাদান বা শক্তি একত্রে কাজ করে এমন একটি ফলাফল তৈরি করে, যা তাদের পৃথক পৃথক ফলাফলের সমষ্টির চেয়েও বেশি শক্তিশালী। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরছি। যক্ষা রোগের চিকিৎসায় যদি শুধুমাত্র আইসোনিয়াজিড ব্যবহার করা হয় তাহলে যক্ষার ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে না। কিন্ত যদি আইসোনিয়াজিড + রিফাম্পিসিন এই দুটি ওষুধ একত্রে প্রয়োগ করলে এরা ব্যাকটেরিয়ার পৃথক পৃথক বিপাকীয় পথে বাধা দেয়, যা এককভাবে ব্যবহারের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং কার্যকরভাবে জীবাণু ধ্বংস করে। আমাদের দুই হাতের শক্তি দিয়েই বিষয়টি আরো সহজভাবে বোঝা যায়। মানুষের দুই হাতে সমান সংখ্যক এবং একই ধরণের আঙুল রয়েছে। কোনো জিনিস এক হাত দিয়ে ধরার চেয়ে দুই হাত দিয়ে ধরলে যেমন শক্ত হয়, তেমনি সেটি ফসকে যাওয়ার ভয়ও থাকে না। দুই হাতের সম্মিলিত শক্তি একক হাতের চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর।সিনারজিস্টিক ইফেক্ট আরো সহজভাবে তুলে ধরার জন্য ‘‘অন্ধ ও পঙ্গুর কাহিনী’ নামে একটি গল্পের কাহিনী তুলে ধরছি। একটি বনে দুজন লোক বাস করত। একজনের ছিল প্রচণ্ড বুদ্ধি কিন্তু তার পা না থাকায় সে চলতে পারত না। অন্যজনের ছিল বিশাল দৈহিক শক্তি কিন্তু সে ছিল অন্ধ ফলে সে পথ দেখতে পেত না। আলাদাভাবে তারা দুজনেই ছিল অসহায়। একদিন বনে আগুন লাগল। বনের পশু-পাখিরা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করে। বনে অন্ধ এবং পঙ্গু লোক দু’জনও আটকা পড়েছিলেন। অন্ধ লোকটি শক্তিশালী থাকায় দ্রুত দৌড়াতে পারতেন, কিন্তু চোখের দৃষ্টি না থাকায় আগুনের লেলিহান শিখা এড়িয়ে কোন দিকে পালাবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। পঙ্গু লোকটি আগুনের ভয়াবহতা ও বের হওয়ার পথ সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু হাঁটার ক্ষমতা না থাকায় একা পালানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। মৃত্যু আসন্ন দেখে পঙ্গু লোকটি অন্ধ লোকটির কাছে একটি প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “আমি তোমাকে পথ দেখাতে পারি কিন্তু চলতে পারি না, আর তুমি চলতে পারো কিন্তু পথ দেখতে পাও না। চলো আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। তুমি আমাকে তোমার কাঁধে নাও; আমি তোমার চোখ হবো আর তুমি আমার পা হবে। তখন অন্ধ লোকটি পঙ্গু লোকটিকে নিজের কাঁধে তুলে নিল। পঙ্গু লোকটি পথ দেখাতে লাগল আর অন্ধ লোকটি সেই পথে হাঁটতে লাগল। তারা কেবল নিজেদের জীবনই বাঁচাল না, বরং সমন্বিত শক্তির মাধ্যমে গ্রামের মূল্যবান সম্পদগুলোও রক্ষা করল। এটিই হতে পারে কুড়িগ্রামের সেই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতিচ্ছবি যেখানে চারজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনৈতিক জোন, কুড়িগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ইকোনোমিক জোন, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু নিয়ে সংসদে দাড়িয়ে কথা বলবে আর সরকারি দলের নেতারা তাঁদের দলীয় মন্ত্রীদের দপ্তরে ঘুরে ঘুর এ কাজগুলো করার জন্য সহযোগিতা প্রদান করবে এবং তাঁদের দলীয় ফোরামেও জেলার সমস্যা গুলো তুলে সমাধানের দাবি জানাবে তখনই উন্নয়ন সম্ভব।

যখন ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ বিরোধ ভুলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা বা সিনার্জি তৈরি করে, তখন অর্জিত ফলাফল একক প্রচেষ্টার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হয়।

নীচের উদাহরণগুলোর মাধ্যমে তা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে :

দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রেনবো নেশন’: আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর দেওয়া এই ধারণাটি নেলসন ম্যান্ডেলা জাতীয় ঐক্যের মূলে স্থাপন করেন। বর্ণবাদ শেষে প্রতিশোধের বদলে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে গঠিত ‘ ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গৃহযুদ্ধ রুখে দেয় এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে।

ভিয়েতনামের ‘দোই মোই’: আশির দশকের চরম সংকটে রাজনৈতিক নেতৃত্ব মতভেদ ভুলে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ‘দোই মোই’ গ্রহণ করে। এই ঐক্যের ফলে দারিদ্র্যের হার ৭০% থেকে ৫%-এর নিচে নেমে আসে এবং ভিয়েতনাম বড় রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS): শীতল যুদ্ধের শত্রুতা ভুলে আমেরিকা ও রাশিয়ার সাথে ১৫টি দেশ একজোট হয়। আমেরিকার প্রযুক্তি, রাশিয়ার রকেট ইঞ্জিন এবং কানাডার রোবোটিক দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে মহাকাশের স্থায়ী বসতি, যা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা শেষে জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলো বিবাদ ভুলে সাধারণ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আজ তারা একই মুদ্রা ও নীতিতে চলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ড বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে কাজ করার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। দেশটির সরকার (ফেডারেল কাউন্সিল) সাত সদস্যের একটি সম্মিলিত সংস্থা, যেখানে প্রধান ৪-৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা থাকেন । ফলে সেখানে প্রচলিত অর্থে কোনো ‘বিরোধী দল’ থাকে না; বড় সব দল মিলেই দেশ চালায় এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয় । তারা বিরোধী দলকে রাষ্ট্রীয় শত্রু মনে না করে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখে।

একটি জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেবল সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না; বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ সেখানে কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি। উদাহরণস্বরূপ, পাবনার স্কয়ার গ্রুপ, বগুড়ার টিএমএসএস ও নর্দান কনজ্যুমার, কুষ্টিয়ার বিআরবি ক্যাবলস এবং চট্টগ্রামের আবুল খায়ের ও এস আলম গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী নিজ নিজ অঞ্চলের চিত্র বদলে দিয়েছে। একইভাবে গাজীপুরের ওয়ালটন বা নারায়ণগঞ্জের সিটি ও মেঘনা গ্রুপ জাতীয় অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়েও জেমকন বা কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের মতো প্রতিষ্ঠান দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কুড়িগ্রাম জেলায় ‘সান পানি’ ব্যতীত এমন কোনো বড় বেসরকারি শিল্প উদ্যোগ আজ অবধি গড়ে ওঠেনি। এমনকি ‘কুড়িগ্রাম ইকো পার্ক’-এর মতো একটি সম্ভাবনাময় বিনোদন কেন্দ্রও মাত্র দুই কিলোমিটার সংযোগ সড়কের অভাবে মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে, যা নিয়ে জাতীয় গণমাধ্যমেও তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তিতে কুড়িগ্রাম এখন শিল্পায়নের এক নতুন দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

ভুটানের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করে এখানে ওষুধ, সিরামিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বিকাশের বিশাল সুযোগ রয়েছে। সোনাহাট স্থলবন্দর ও চিলমারী নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে শক্তিশালী লজিস্টিকস ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা। এছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য সম্পদ এবং চরের নান্দনিক সৌন্দর্যকে ঘিরে পর্যটন খাত এই জনপদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সদিচ্ছা। দল-মত নির্বিশেষে সরকারি ও বিরোধী দল, সাধারণ মানুষ এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে উন্নয়নের প্রশ্নে একটি ‘ঐক্যের বন্ধন’ তৈরি হওয়া জরুরি, যা কুড়িগ্রামকে সারা দেশের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখক: অধ্যক্ষ (পি.আর.এল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর