গুরুদেবের খোলা চিঠি
শ্রী দেবেশ চন্দ্র (সান্যাল) গোস্বামী
ওঁ শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
॥ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পরমেশ^র ভগবান শ্রী কৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণী। বেদ অর্থ জ্ঞান। বেদ নিত্য শাশ^ত
ও অপৌরুষেয় (বৃহদারন্যক উপনিষদ ৪/৫/১১)। সকল বেদ ভগবান এর নিশ^াস থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
বেদের সার সংক্ষেপ বা নির্যাসকে বলা হয় উপ-নিষদ। গীতোপনিষদ নামে খ্যাত শ্রী মদ্ভগবদ্গীতা
সমস্ত উপনিষদের সার এবং মহামতি শ্রী কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস রচিত মহাকাব্য। মহাভারতের ভীস্ম
পর্বের ২৫ থেকে ৪২ নম্বর অধ্যায়ের ১৮টি অধ্যায় হল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বা গীতোপনিষদ। স্বয়ং পরমেশ^র
ভগবান শ্রী কৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত অমৃতময় বাণী হ’ল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা।
আমরা জানি দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ক্ষেত্রে গীতা-জ্ঞান প্রদান করেছেন।
অর্জুন শ্রী গীতা শুনেছিলেন। সঞ্জয়ের মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্রও শ্রী গীতা শুনেছিলেন!
ভগবানের মুখে শ্রী গীতা শুনে পরবর্তীতে অর্জুন সফল কাম হয়েছিলেন্, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছিলেন।
তা’হলে, এক যাত্রায় এমন পৃথক ফল হয়েছিল কেন?
কারন, শ্রী গীতা শুনে অর্জুন তাঁর চেতনার উত্তরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। তাই তিনি অন্তিমে সফল
হয়েছিলেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র শ্রী গীতা শুনেও নিজেকে সন্তান প্রেমের মোহ থেকে মুক্ত করতে পারেননি।
আসক্তি দূর করে তাঁর বোধের কোন পরিবর্তন করতে পারেননি। কেননা তাঁর মধ্যে সংশয় থেকে
উত্তরণের সাধনা ছিল না। তাই তিনি যেমন অন্ধকারে ছিলেন, তেমনই রয়ে গেলেন।
আমাদেরও একই সমস্যা! আমরাও অনেকে গীতাপাঠ করি কিন্তু অর্জুনের মত গীতার আলোয় নিজেকে
আলোকিত করতে পারি না। নিজেদের অবস্থার কোনরকম উত্তরণ ঘটাতে পারি না। ধৃতরাষ্ট্রের মতই
আসক্তির বন্ধনে আটকে থাকি। শ্রী মদ্ভগবদ্গীতার সার শিক্ষা হলো- (১) স্ব-ধর্মে বিশ^াস (২) ভক্তি ও
(৩) ভগবান-এ সম্পূর্ণ শরণাগত হয়ে নির্ভর করা।
শ্রী মদ্ভগবদগীতার- মমার্থ বুঝতে হলে আমাদেরও অনাসক্ত হৃদয় নিয়ে গীতার চরণে আশ্রয় নিতে হবে।
গীতার অমূল্য বানীগুলোকে যথার্থভাবে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের চৈতন্যবোধকে জাগ্রত করে তুলতে
হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে গীতা এমনি এক বাস্তবধর্মী শাস্ত্র, সৃষ্টির কল্যান কামনাই যার উদ্দেশ্য।
তাই আমরা যদি কল্যাণ চাই, কর্তব্য -অকর্তব্য নির্ধারণ করে কর্ম করতে চাই তা’হলে আমাদের গীতার
মত দিব্য ধর্ম শাস্ত্রের শরণাপন্ন হতে হবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্জুনকেও এই
কথাটিই বলেছিলেন। তিনি অর্জুনের মনের সকল সংশয় দূর করতে নিশ্চয়তা প্রদান করে বলেছিলেন-
তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ।
জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহার্হসি
(গীতা-১৬/২৪)।
শ্রী ভগবান বললেন- কর্তব্য- অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ, তাই তুমি শাস্ত্রোক্ত ব্যবস্থা জানিয়া
যথাধিকার কর্ম করিতে প্রবৃত্ত হও”। এখনকার ব্যস্ত জীবনে নির্বিঘেœ শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করার মত সময়ের
অভাবে পূর্ণাঙ্গ বিধি অনুসারে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। যেমন আমি যে দিন সময় করে
উঠতে না পারি সে দিন বিধি অনুসারে আচমনাদি করে ৩টি শ্লোক অর্থসহ, ১৮ গুহ্যনাম, মাহাত্ম্য ও
প্রনাম মন্ত্র পাঠ করে থাকি। শ্লোক ৩টি হলো-১. শ্রী মদ্ভগবদগীতা প্রথম অধ্যায়, অর্জুনবিষাদ-যোগ-
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ, ধর্মক্ষেত্রে কুরু ক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ। মামকা: পান্ডবা শ্চৈব কিম কুর্বত সঞ্জয় (১.১)।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়, পুণ্যভূমি কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধাভিলাষী আমার এবং পান্ডুর পুত্রগণ সমবেতা হইয়া
কি করিল? শ্রী ভগবান উবাচ-সর্ব ধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহংত্বাং সর্বপাপেভ্যো
মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ (১৮.৬৬)। অর্থ: শ্রী ভগবান বলিলেন- সকল ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া তুমি একমাত্র
আমারই শরণ লও। আমি তোমাকে সকল পাপ হইতে মুক্ত করিব, শোক করিও না। সঞ্জয় উবাচ-যত্র
যোগেশ^রঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ। তএ শ্রী র্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতি র্মতি র্মম।।(১৮.৭৮)। যে পক্ষে
দিব্য শক্তি শালী যোগেশ^রঃ কৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ, সেখানেই, বিজয়, ঐশ^র্য ও অখন্ডিত ন্যায়-
নীতি আছে, ইহাই আমার মত। তদুপরি এই জৌলুসপূর্ণ বিশে^ বিষয়ভোগের হাতছানি উপেক্ষা করে
চলতে পারাটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তা’ সত্ত্বেও এইসব বাঁধা ডিঙ্গিয়েই আমাদের গীতার মত ধর্মগ্রন্থের
শরণ নিতে হবে। গীতাসমুদ্রের পবিত্র সলিলে স্নান সেরে নির্ম্মল হয়ে উঠতে হবে। জীবনে কতবার গীতা
পড়েছি সেই কথাটিকে বড় না ভেবে বরং সঠিকভাবে গীতা পাঠের মাধ্যমে নিজেদের আরো পরিশুদ্ধ
করে তোলার চেষ্টা করে যেতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গীতা আমাদের মনের বিকারগুলোকে অতিμম করে যোগে যুক্ত হতে
শেখায়। আর যোগে স্থিত হতে পারলে তখন জ্ঞান-অসি দিয়ে মনের অজ্ঞানপ্রসূত সংশয় দূর করা যায়।
কেননা গীতাপাঠের মাধ্যমে দিব্য জ্ঞান উপলদ্ধ করে এক আনন্দময় জীবন রচনা করা যায়। আর
শ্রীভগবান তো অর্জুনকে উপলক্ষ করে আমাদের ডেকে চলেছেনই প্রতিনিয়ত। তিনি অর্জুনকেও আহ্বান
জানিয়েছিলেন। এই বলে-
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত॥
(গীতা- ৪/৪২)
অর্থাৎ- অতএব, হে ভারত(অর্জুন)! তুমি যোগে স্থিত হও, তোমার হৃদয়ে যে অজ্ঞানপ্রসূত সংশয়ের
উদয় হয়েছে, তা জ্ঞানরূপ খড়গের দ্বারা ছিন্ন কর, ওঠো।
তাই আসুন, আমরা যথার্থভাবে গীতাপাঠের মাধ্যমে আমাদের বোধের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে চেতনার
উত্তরণ ঘটানোর চেষ্টা করি। লোকদেখানো ধর্ম পালনে আটকে না থেকে, সত্যিকারের ধার্মিক হয়ে
উঠি। আর অজ্ঞানে আবদ্ধ আন্তরাত্মাটিকে মোহমুক্ত করে জীবন্মুক্তির পথে অগ্রসর হই। পরমেশ^র
ভগবান শ্রী কৃষ্ণের অমিয় বাণী- …মামেকং শরণং ব্রজ” নির্দেশ টি জীবনে প্রতিষ্ঠা করে চলি। সত্যেন
লভ্যো হ্যেষা আত্মা সম্যগ্জ্ঞানেন-মুন্ডকোপন্নিষদ (৩/৯/৫)। আত্মাকে পেতে হবে সত্য আর সম্যক
জ্ঞান দিয়ে’।
লেখক: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার রতন কান্দি গ্রাম এবং শ্রী শ্রী
গীতা সংঘ বাংলাদেশ এর আজীবন সদস্য।









Chief Editor-Dipali Rani Roy